পশ্চিমবঙ্গের 'বাঙালি জাতীয়তাবাদী' নেতা গর্গ চ্যাটার্জীর গ্রেফতার নিয়ে যে বিতর্ক চলছে

গর্গ চ্যাটার্জী

ছবির উৎস, Bangla Pokkho/Instagram

ছবির ক্যাপশান, গর্গ চ্যাটার্জী
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

'বাঙালি জাতীয়তাবাদী' সংগঠন 'বাংলা পক্ষ'র প্রধান গর্গ চ্যাটার্জীকে মঙ্গলবার গ্রেফতার করার পরে তার পক্ষে, বিপক্ষে নানা মত উঠে আসছে, সামাজিক মাধ্যমে বেঁধেছে বিতর্ক। নির্বাচনের ভোটযন্ত্র বা ইভিএম নিয়ে তার একটি পোস্টের কারণে নির্বাচন কমিশন তার বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছিল।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া মিটতেই একের পর এক গ্রেফতারের খবর জানা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। সাবেক দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুর পরে এ বার গ্রেফতার হলেন 'বাঙালি জাতীয়তাবাদী' সংগঠন 'বাংলা পক্ষ' এর নেতা গর্গ চ্যাটার্জী।

জানা গিয়েছে, নির্বাচনের আগে উস্কানিমূলক মন্তব্য ও ইভিএম বা ভোটগ্রহণ যন্ত্র নিয়ে 'গুজব' ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে গর্গ চ্যাটার্জীকে। ১২ই মে মঙ্গলবার তাকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের সাইবার সেল।

একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলা পক্ষ ও গর্গ চ্যাটার্জীর হ্যান্ডেলগুলিও। আজ তাকে কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হয়েছে।

'বাংলা পক্ষ' সংগঠনের সুত্রে এও জানা গিয়েছে যে ওই সংগঠনের ব্যাংক স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে তদন্তকারীদের তরফে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ সম্পূর্ণ হওয়ার পরে গর্গ চ্যাটার্জী মন্তব্য করেছিলেন, "আগের রাতে ইভিএমগুলি সব দিক দেখে শুনে সিল করে রাখার পরেও ভোট গণনার দিন কেন ইভিএমগুলোয় ত্রুটি দেখা দিচ্ছে?"

এ ছাড়াও অন্য রাজ্যের যেসব বাসিন্দারা পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেন এবং ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

২০১৮ সালে বাংলা পক্ষ নামের ওই সংগঠন তৈরি করেন গর্গ চ্যাটার্জী।

'ভারতীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী' বলে নিজেদের দাবি করা এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি ভাষার বিরোধিতা ও বাংলাকে সরকারি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া।

এ ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাতেও বাংলায় পরিষেবা বাধ্যতামূলক করা নিয়ে আওয়াজ তুলেছিল এই সংগঠনটি।

তবে স্বঘোষিতভাবে 'অরাজনৈতিক' এই সংগঠনটির বিরুদ্ধে রাজ্যের পূর্বতন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার একাধিক অভিযোগ করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল ও বর্তমান শাসকদল বিজেপি।

হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে তার অবস্থানকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' বলেও অভিযোগ করেছিলেন বিজেপির একাধিক নেতা ও কর্মীরা। এমনকি তিনি তার এলাকার আসন ভবানীপুরে তিনি যখন ভোট দিতে যান, তাকে ঘিরে স্লোগান তোলার অভিযোগ করেছিলেন গর্গ চ্যাটার্জী।

কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ

কী বলছে কলকাতা পুলিশ?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মঙ্গলবার, ১২ই মে সন্ধ্যায় একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে কলকাতা পুলিশ।

ওই সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, "তিনি একাধিক পোস্ট করে ইভিএম-এ কারচুপির অভিযোগ করেছিলেন। তার এই সব পোস্টের কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।"

এই বিষয়ে জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের করা অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে পুলিশের তরফে।

ওই বৈঠক থেকে পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ জানান, এর আগেও দুবার গর্গ চ্যাটার্জিকে তলব করা হয়েছিল কিন্তু তিনি হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপর স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করে পুলিশ।

অজয় নন্দ আরও জানান, "উনি সোশ্যাল মিডিয়াতে একাধিকবার বিভিন্ন সম্প্রদায়কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন। ওই মন্তব্যগুলিতে বৈষম্যের আঁচ পাওয়া যায়।"

কলকাতার পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, মূলত ইভিএম সংক্রান্ত মন্তব্য করে আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের সঙ্গে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টির প্রচেষ্টার অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে।

কলকাতার ময়দান থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

তবে এই গ্রেফতারির পরে হইচই শুরু হয়েছে। যেখানে এক পক্ষ এই গ্রেফতারকে সমর্থন করেন, অন্যদিকে বহু মানুষ ও সংগঠন এই গ্রেফতারকে অনৈতিক ও বাকস্বাধীনতার বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন।

হাওড়া স্টেশন চত্বরে 'বাংলা পক্ষ'র একটি প্রতিবাদ সভা - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Bangla Pokkho/Instagram

ছবির ক্যাপশান, হাওড়া স্টেশন চত্বরে 'বাংলা পক্ষ'র একটি প্রতিবাদ সভা - ফাইল ছবি

কী প্রতিক্রিয়া 'বাংলা পক্ষ'র?

'বাংলা পক্ষ'র সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক মাইতি বলেন, গর্গ চ্যাটার্জীর ইভিএম নিয়ে বক্তব্যের জন্যই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে এই ধরনের কথা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও এর আগে বলেছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পুলিশ 'বাংলা পক্ষ' সংগঠনের ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলিও পরীক্ষা করে দেখছে বলে অভিযোগ করে কৌশিক মাইতি জানিয়েছেন যে, 'বাংলা পক্ষ' সংগঠনের সমস্ত চাঁদা ও অনুদান ওই সংগঠনটির সদস্য ও সমর্থনকারী মানুষদের থেকেই আসে।

কোনও বৈদেশিক অর্থ 'বাংলা পক্ষে'র অ্যাকাউন্টে ঢোকে না বলে জানিয়েছেন মি. মাইতি।

তবে এই প্রথম বার নয়। এর আগেও একাধিক বিতর্কে জড়িয়েছে 'বাংলা পক্ষ' ও তার প্রতিষ্ঠাতা গর্গ চ্যাটার্জী।

চলচ্চিত্র প্রযোজক রানা সরকারের সঙ্গে কৌশিক মাইতি ও গর্গ চ্যাটার্জী

ছবির উৎস, Bangla Pokkho/Instagram

ছবির ক্যাপশান, চলচ্চিত্র প্রযোজক রানা সরকারের সঙ্গে কৌশিক মাইতি ও গর্গ চ্যাটার্জী

পক্ষে-বিপক্ষে কী যুক্তি ?

সুজিত বসু ও গর্গ চ্যাটার্জীর গ্রেফতার নিয়ে একসঙ্গে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, "আগে যারা বাঘ হয়ে ঘুরে বেড়াত তারা সবাই এখন খাঁচায় ঢুকবে।"

বিজেপি নেতা ও সদ্য নির্বাচিত বিধায়ক সজল ঘোষ অবশ্য দাবি করেছেন গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করার সময়ে তার কাছে ২৪ রাউন্ড গুলি পাওয়া গিয়েছে। অবশ্য এমন কোনও দাবিতে সাংবাদিক বৈঠক থেকে সিলমোহর দেয়নি কলকাতা পুলিশ।

তিনি আরও বলেন, "শিক্ষিত মানুষরা শয়তান হলে সমাজে ভয়ঙ্কর প্রভাব দেখা যায়। গর্গ চ্যাটার্জীর কারণে বহু হিন্দিভাষী মানুষ পশ্চিমবঙ্গে হেনস্থার শিকার হয়েছেন। তার কারণেই পশ্চিমবঙ্গের বাইরে একাধিক জায়গায় বাঙালিরা মার খাচ্ছে।"

তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র একটি এক্স পোস্টে লিখেছেন, "আমি গর্গ চ্যাটার্জীর ভক্ত নই। তবে তাকে গ্রেফতার করা ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। এর থেকে বোঝা যায় যে বিজেপি কতটা বাঙালি-বিরোধী।''

গর্গ চ্যাটার্জীর গ্রেফতারের পরে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সাবেক আমলা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহর সরকারও। তিনি বলেন, "আমি গর্গ চ্যাটার্জীর বিদ্বেষপূর্ণ ও সংকীর্ণ ভাষণগুলির সঙ্গে একমত নই। সরকারের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা উচিৎ।"

এ ছাড়াও তিনি মনে করেন তার সুষ্ঠু বিচারের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা উচিৎ।

গর্গ চ্যাটার্জীর গ্রেফতার নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষও। বিজেপি নেত্রী প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়ালের একটি 'এডিট করা পোস্ট'-এর স্ক্রিনশট পোস্ট করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, "গুজব ছড়ানোর অভিযোগে যদি গর্গ চ্যাটার্জী গ্রেফতার হতে পারেন তাহলে ইনি কেন নন?"

সিপিআই (এমএল) লিবারেশন দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, "গর্গ বাঙালি সত্তা ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার দাবি তোলা একজন সুপরিচিত বক্তা। তার এই গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানানো উচিত।"

দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতে, এই গ্রেফতার "একটি প্রতিহিংসামূলক ও ভীতিপ্রদর্শনমূলক পদক্ষেপ।"

সাধারণ মানুষকে গর্গ চ্যাটার্জীর অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানতে আবেদন করেছেন তিনি।