হামের টিকা আগে নেওয়া থাকলেও কি শিশুকে আবার দিতে হবে?

ঢাকার মিরপুরে টিকা কার্যক্রমের ব্যানার টানাতে দেখা যাচ্ছে একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে
ছবির ক্যাপশান, ঢাকার মিরপুরে টিকা কার্যক্রমের ব্যানার টানাতে দেখা যাচ্ছে একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে
    • Author, মুকিমুল আহসান
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঢাকার রামপুরা এলাকার ফারজানা আক্তারের দুটি সন্তানের মধ্যে বড় ছেলের বয়স সাত বছর, আর ছোট মেয়ের বয়স চার বছর। জন্মের পর তিনি দুটি শিশুকেই নিয়মিত সবগুলো টিকা দিয়েছেন, যার মানে হলো তারা দুই ডোজ হামের টিকাও পেয়েছে।

গত মার্চ মাস থেকে সারাদেশে হামের প্রকোপ বেড়ে গেছে। প্রতিদিন হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

এরকম পরিস্থিতিতে গত পাঁচই এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে, রামপুরার ফারজানা আক্তার বুঝতে পারছেন না আসলে তার দুই বাচ্চাকে আবারো টিকা দেবেন কি - দেবেন না।

মিজ. আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "চার বছর মেয়েকে হামের দুইটি ডোজ সময়মতো দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আবার টিকা দিলে যদি জ্বর আসে, সেই চিন্তা থেকে আরেক ডোজ টিকা দেবো কি না সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করছে"।

সরকারের পক্ষ থেকে যে টিকা কর্মসূচি শুরু হয়েছে, সেখানে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছর পর্যন্ত। এ অবস্থায় হামের টিকা নিয়ে অভিভাবকদের নানা জিজ্ঞাসাও রয়েছে।

এই প্রশ্নে চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে হাম যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সে কারণে আগে দুটি ডোজ দেওয়া থাকলেও নতুন করে আরেকটি ডোজ টিকা দেওয়া উচিত।

ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট সুব্রত রায় বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আগে দুই ডোজ টিকা দেওয়া থাকলেও হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণে অনেকে ঝুঁকির মধ্যে থেকে যায় যদি তাদের অ্যান্টিবডি সেভাবে গড়ে না ওঠে। সে কারণে বুস্টার ডোজে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে"।

যে কারণে আগে দুই ডোজ টিকা দেওয়া থাকলেও তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ টিকা দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

তবে, ক্ষেত্র বিশেষে কোনো কোনো শিশুকে এখনই যাতে হামের বুস্টার ডোজ না দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড
ছবির ক্যাপশান, ঢাকা শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড

কোন শিশুদের টিকা দেওয়া জরুরি?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগগুলোর একটি হলো হাম। চিকিৎসকদের মতে, একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে।

গত মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বাড়তে থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ই মার্চ থেকে দোসরা মে পর্যন্ত হাম ও সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ হাজার ৯১১ জন। আর হাম ও সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ২৩৫ জনের।

সারাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণে যে টিকাদান কর্মসূচি চলছে তাতে শিশুদের টিকা দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

তবে চিকিৎসকরা বলছেন, আগে দুই ডোজ টিকা দেওয়া থাকলে তৃতীয় ডোজ টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সাধারণত ১৫ বছরের নিচে যে কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হতে পারে। যে কারণে ১৫ বছর বয়সের নিচে সবারই উচিত অতিরিক্ত আরেকটি ডোজ টিকা নেওয়া। এর মূল্য উদ্দেশ্য হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলা"।

এক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সবাই এই অতিরিক্ত ডোজ টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসক সুব্রত রায় বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রথমত যাদের বয়স ১৫ বছরের নিচে, কিন্তু বড় ধরনের কোনো অসুস্থতা নেই তারা এই টিকা নিতে পারবে"।

বিভিন্ন ধরনের টিকা দেওয়ার পর কোনো কোনো শিশু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকে। সে কারণে আতঙ্ক থেকে অনেক অভিভাবকই বাধ্য না হলে টিকা দিতে খুব একটা আগ্রহ দেখান না। সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে অভিভাবকদের।

এই বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ মি. রায় বিবিসি বাংলাকে বলেন, "টিকা দেওয়ার সময় বাচ্চার সিরিঞ্জের একটা খোঁচা খায়, সে কারণে কোনো কোনো শিশুর জ্বর হতে পারে। তবে হামের টিকায় জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ খুবই কম। আর জ্বর হলে শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করলেই চলবে"।

আর যে সব শিশু এর আগে এক ডোজ টিকা দিয়েছে, পরে আর দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়নি বা টিকা কেন্দ্রে গিয়ে টিকা না পেয়ে চলে এসেছে, তাদের সবাইকেই এই টিকা দেওয়া জরুরি", বলছিলেন মি. রায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দ্রুত জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা এবং পূর্বের টিকাদানের ঘাটতি পূরণ করা।

যে কারণে চিকিৎসকরা দেশ থেকে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সব শিশুকেই অতিরিক্ত এক ডোজ টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

একজনের হাতে কোভিড ভ্যাকসিনের একটি বোতল, পাশে আরো তিনটি বোতল ও একটি প্যাকেট

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রেও হাম বেড়েছে; বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোভিড মহামারির সময়ে বিশ্বব্যাপী শিশুদের টিকাদান ঠিক মতো হয়নি বলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে

কাদের এখনই টিকা দেওয়া উচিত না?

বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালের দিকে হামের একক টিকা দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সাল থেকে হাম-রুবেলা (এমআর) নামে টিকা শিশুদের দেওয়া হচ্ছে।

এবার হামের প্রাদুর্ভাব বেশ ছড়িয়ে পড়ায় হামের দুই ডোজের বাইরে বাড়তি একটি ডোজ দেওয়ার ওপর জোড় দিচ্ছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ।

চিকিৎসকরা বলছেন, বিষয়টি এমন না যে এবারই প্রথম বুস্টার ডোজ দেওয়া হচ্ছে। এর আগে ২০২০ সালেও একইভাবে প্রায় তিন কোটি শিশুকে হামের বাড়তি টিকা দেওয়া হয়েছিল।

আগের দুই ডোজ দেওয়ার পর যাদের বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছিল তাদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে বলেও মনে করছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকদের মতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চাদের এখনই টিকা দেওয়া যাবে না।

চিকিৎসক মি. রায় বলছিলেন, "প্রথমত যাদের বয়স ছয় মাসের নিচে তারা হামের টিকা নেবে না। দ্বিতীয়ত, যারা এই টিকা নিয়েছে, কিন্তু এখনো এক মাস পূর্ণ হয়নি তারাও এই টিকা নেবে না"।

এর বাইরে এরই মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রেও এখনই হামের টিকা না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

মি. রায় বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এমন অনেক বাচ্চা আছে যাদের হাম হয়ে গেছে, কিন্তু কোনো কারণে তা শনাক্ত করতে পারেনি। কিন্তু পরে ধারণা করছে সে হামে আক্রান্ত হয়েছিল। তাদের ক্ষেত্রেও এক মাসের মধ্যে এই টিকা নেওয়া উচিত হবে না"।

এর বাইরে ছয় মাস বয়স থেকে ১৫ বছরের নিচে সকল শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

যদিও এখন পর্যন্ত পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের অতিরিক্ত বা বুস্টার ডোজ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআইয়ের সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখন পর্যন্ত পাঁচ বছরের নিচে যে শিশুরা রয়েছে তাদেরকেই টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এর ওপরে যাদের বয়স তাদের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নি"।

তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন হাসপাতাল বা টিকা কেন্দ্রে নিজ খরচে এসব টিকা নেওয়া যায়।

হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন তাদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই বাংলাদেশে
ছবির ক্যাপশান, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন তাদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই বাংলাদেশে

যে কারণে টিকায় গুরুত্ব চিকিৎসকদের

চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পর গত এপ্রিল মাস থেকে সারাদেশে নতুন করে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার।

প্রথম দফায় গত পাঁচই এপ্রিল দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় ১২ই এপ্রিল থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে শুরু হয় টিকাদান কার্যক্রম।

সর্বশেষ তৃতীয় দফায় গত ২০শে এপ্রিল থেকে সারাদেশে একযোগে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, আগে টিকা নেওয়া শিশুদের আরো অতিরিক্ত একডোজ টিকা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো 'হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলা যাতে দেশের মধ্যে হাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম বলছিলেন, "একটা কমিউনিটিতে সবাইকে যদি ভ্যাক্সিনেটেড করা যায় তাহলে সেই এ ধরনের সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব সহজেই। যে কারণেই অতিরিক্ত একটা ডোজের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে"।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত মাসে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৬১ শতাংশ শিশু হাম-রুবেলার টিকা নিয়েছে।

কত পরিমাণ শিশুকে টিকার আওতায় আনলে হামের প্রাদুর্ভাব সহজভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব সেটির একটা ধারণা দেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট সুব্রত রায়।

মি. রায় বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "কোনো এলাকার যদি ৯৭ শতাংশ শিশুর হামের টিকা নেওয়া থাকে তাহলে সেখানকার বাকি তিন শতাংশের যদি টিকা নাও নেয় তাহলে ওই তিন শতাংশও আক্রান্ত হবে না। সেই এলাকার শিশুদের মাঝে এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা গড়ে ওঠার কারণেই এটি হয়"।

"আর এর বিপরীতে যদি এলাকার শিশুদের মধ্যে হামের টিকা নেওয়ার সংখ্যা যদি ৯৫ শতাংশের নিচে হয়, তাহলে সেখানে সব শিশুদের মধ্যে হামের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়তে পারে", বলছিলেন মি. রায়।