ইসলামী ব্যাংকে দুইদিনে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার, পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত - সামনে কী?

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের লোগো
    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

তারল্য সংকট কাটাতে সোমবার দ্বিতীয় দফায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে রোববারও ব্যাংকটিকে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

দুইদিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ঋণ পাওয়ার কথা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন।

এর আগে গত রাতেই প্রায় তিন সপ্তাহের অস্থিরতা ও অচলাবস্থার পর ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এক আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মোহাম্মদ জহির হোসেন আপাতত ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করবেন।

গত প্রায় এক দশক ধরে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে।

সবশেষ চলতি বছর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা শুরু হয়েছিলো।

এরপর চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের একটি অংশ বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কও হয়।

কিন্তু অচলাবস্থার নিরসন হয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ছবির উৎস, Getty Images

এরপর কী?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

একদিকে দৈনিক বিক্ষোভ, আরেকদিকে গ্রাহকদের একটি অংশ ব্যাংক থেকে বড় অংকের অর্থ তুলে নেয়ার ফলে তারল্য সংকটে পড়ে ইসলামী ব্যাংক।

সেই সঙ্গে শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ, নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল।

সবমিলিয়ে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এক রকম অচলাস্থার মধ্যে পড়ে ব্যাংকটি।

সবশেষ রোববার রাতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, 'ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থে' পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।

রোববার ইস্যু করা চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, "ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং 'ব্যাংক-কোম্পানির স্বার্থে, আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে' ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি'র পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।"

ওই একই আইনেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনের নিয়োগের বিষয়টিও জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

চিঠিতে উল্লেখ করা সংক্ষিপ্ত কারণের বাইরে আর কোনো ব্যাখ্যা বা মন্তব্য করতে রাজি হননি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

এখন পরিচালনা পর্ষদ না থাকলে ব্যাংকের কার্যক্রম কীভাবে চলবে, গ্রাহকের দৈনন্দিন লেনদেনে কোনো প্রভাব পড়বে কী না - এমন প্রশ্ন উঠছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিবিসিকে বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ফলে কোনো প্রভাব ইসলামী ব্যাংকে পড়বে না এবং ব্যাংকের যাবতীয় কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই পরিচালিত হবে।

অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন বিবিসিকে বলেছেন, গ্রাহকের টাকা তুলে নেয়ার প্রবণতা কমছে, ফলে ইসলামী ব্যাংক ক্রমে সংকট কাটিয়ে উঠবে।

তিনি জানিয়েছে, পরপর দুইদিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার পেয়েছে তার ব্যাংক।

"তবে, এর মধ্য থেকে আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশ টাকা ব্যবহার করা লাগবে না। গ্রাহকের টাকা তুলে নেয়ার প্রবণতা কমছে, ফলে ওই টাকাটা আমাদের ব্যবহার করতে হবে না," বলেন মি. হুসাইন।

সংকট কাটাতে গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ঋণের আবেদন করে ইসলামী ব্যাংক।

মঙ্গলবারও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা

ছবির উৎস, AMINUL

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবারও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা

তিনি গ্রাহকদের ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মি. খান বলেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মোহাম্মদ জহির হোসেন আপাতত ইসলামী ব্যাংকের যেসব বিষয় বোর্ডের অনুমোদন বা সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, সেগুলো দেখভাল করবেন।

এখন কবে নাগাদ নতুন পর্ষদ গঠন করা হবে, সে নিয়ে কোনো আভাস দেননি তিনি।

এদিকে, সোমবার ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদ জহির হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, "(ইসলামী ব্যাংকে) দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে যাচাই-বাছাই চলছে।"

পর্ষদ ভাঙ্গার আগে যা যা ঘটেছে

সংকটের শুরু হয় ঈদুল আযহার আগে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে।

গত ২৪শে মে ব্যাংকের চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন এবং সেদিন রাতেই ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

উল্লেখ্য, তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান মে মাসে পদত্যাগ করলেও তিনি এপ্রিল থেকে দেড় মাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে ছিলেন।

এদিকে, নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ২৪শে মে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গ্রাহক ও কর্মকর্তা পরিচয়ে অনেককে আন্দোলন করতে দেখা যায় ।

ইসলামী ব্যাংক

ছবির উৎস, Islami Bank Bangladesh PLC

এরপর পহেলা জুন 'ইসলামী ব্যাংকের সচেতন গ্রাহক ফোরাম' এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বড় পরিসরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।

তখন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারগ্যাস এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় কয়েকজন আহত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।

সেসময় বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানকে পদ থেকে সরানো হবে না।

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে এই ধরনের অস্থিরতা যখন চলছে, তখন অভিযোগ ওঠে যে অনেক আমানতকারী ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন।

ব্যাংকটিতে কর্মরত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি বাংলার কাছে গত ১০ই জুন দাবি করেন, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে।

এ ইস্যুতে সংসদেও পালটাপালটি বক্তব্য দিয়েছে সরকার ও বিরোধী দল।

ব্যাংকটির শেয়ার প্রকৃত মালিকর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় 'অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ' বন্ধের দাবি তুলেছিলো সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।

অন্যদিকে, বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকটির অতীত অনিয়ম এবং একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংসদে তুলে ধরা হয়।

একটি ব্যাংকের ভেতরের কার্যক্রমের দৃশ্য

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, একটি ব্যাংকের ভেতরের কার্যক্রমের দৃশ্য

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে কী কী অনিয়ম হয়েছে, সম্প্রতি তার একটি তালিকা সংসদে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, "নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকার এলসির বিপরীতে লোন দেওয়া হয়েছে, পরে এই মালামাল বিক্রি করে ব্যাংকে টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি"।

ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস নামে একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মি. আহমদ।

তিনি দাবী করেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। পাঁচই অগাস্টের পর নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এর মধ্যে ১০ই জুন ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু পর্যবেক্ষক বসানোর পরও আন্দোলন থামেনি।

সবশেষ গত ১৩ই জুন চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়াসহ সাত দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে 'গ্রাহক ফোরাম' এবং এর পরদিন, অর্থাৎ গতকাল তারল্য সংকট কাটাতে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার টাকা বিশেষ ঋণ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর আগে, ইসলামী ব্যাংকের অনেক গ্রাহক দাবি করেন যে তারা টাকা তুলতে পারছেন না।

সবশেষ গতকাল বিকেলে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সাথে বৈঠক করেন।

দীর্ঘ বৈঠকের পর রাত পৌনে ১০টার দিকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন

ছবির উৎস, Getty Images

ইসলামী ব্যাংক দখল-পুনর্দখল

ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন নতুন নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকটিকে ঘিরে।

এক সময় জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের দখলে চলে যায়।

২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের ৮২ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল এবং ব্যাংটির বিরুদ্ধে তখন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ৬৭ জনের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে মামলাও করেছে দুদক।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কয়েক হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় আবারও ব্যাংকটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী সমর্থকরা। সেসময় তারা নিজেদের মতো করে পর্ষদ সাজিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর এবার বিএনপি সরকার নিজের অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে ব্যাংকটিকে নতুন করে সাজাতে চাইছে, এমন অভিযোগ ওঠে।

মূলত, দখল এবং পাল্টা দখলের এ লড়াই থেকেই এখন বেসরকারি খাতের ব্যাংকটিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।