মমতার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো সাবেক বাম সংসদ সদস্য, কে এই ঋতব্রত ব্যানার্জী?

ছবির উৎস, Ritabrata Banerjee
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই একজনের নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে- তিনি হলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী। তৃণমূল কংগ্রেসের যে বিধায়ক দলটির সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে 'বিদ্রোহের' নেতৃত্ব দিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন ।
মমতা ব্যানার্জী যে সিপিআইএমের বিরুদ্ধে কয়েক দশক লড়াই করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তার দল ভাঙার কাজটিও করলেন কিন্তু সেই সিপিআইএমেরই এক সাবেক নেতা -ঋতব্রত ব্যানার্জী।
তিনি সিপিআইএম দলের সংসদ সদস্য ছিলেন, আর তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল বাম ছাত্র রাজনীতি দিয়ে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এই নেতা এক সময়ে ছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের 'ব্লু-আইড বয়'।
খুব দ্রুতই তিনি সিপিআইএমের ছাত্র এবং যুব সংগঠনের সর্বভারতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন, তবে তাকে এক পর্যায়ে বহিষ্কার করে সিপিআইএম।
তখন তিনি রাজ্যসভার এমপি। দলহীন এমপি অবস্থাতেই কয়েক বছর কাটানোর পরে তিনি যোগ দেন একসময়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেসে।
সেই দলও তাকে রাজ্যসভায় এমপি করে পাঠিয়েছিল। একই সঙ্গে তাকে তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনের প্রধানও করেছিলেন মমতা ব্যানার্জী।
কিন্তু শেষমেশ সেই দলের ভাঙনের কাজটাও সম্পন্ন করলেন তিনিই।
দেখে নেওয়া যাক ঋতব্রত ব্যানার্জীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটা।

ছবির উৎস, Mint via Getty Images
বামেদের 'তরুণ তুর্কি'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ছাত্র হিসাবে মেধাবী ঋতব্রত ব্যানার্জী কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলের পড়ুয়া ছিলেন। পরে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং পরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি কলকাতার যে আশুতোষ কলেজে পড়েছেন, ঘটনাচক্রে তার সর্বশেষ দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জীও ওই একই কলেজের প্রভাতী নারী বিভাগ - যোগমায়া দেবী কলেজে পড়েছেন এবং তারও উত্থান ওই কলেজে ছাত্র রাজনীতি থেকেই।
তবে 'ব্যানার্জী' পদবিধারী দুই রাজনীতিবিদের কলেজে পড়ার সময়ে প্রায় দুই দশকের ফারাক আছে।
জুনিয়ার ব্যানার্জী, অর্থাৎ ঋতব্রত ব্যানার্জী কলেজের সময় থেকেই সিপিআইএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের একজন সুবক্তা এবং সক্রিয় কর্মী হিসাবে নজর কাড়েন।
পরে এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পান।
তাকে দলের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ তুর্কি বলে মনে করা হতো। তখন থেকেই বাম রাজনীতিতে তার উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্নেহভাজন ছিলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী।
২০১৪ সালে সিপিআইএম তাকে সংসদ সদস্য করে রাজ্যসভায় পাঠায়। রাজ্যের একাধিক শীর্ষনেতৃত্ব অবশ্য এর পক্ষে ছিলেন না।
সংসদে তার বক্তব্যের কারণে জাতীয় স্তরেও দ্রুত পরিচিতি পান তিনি।
তবে ২০১৩ সালে দিল্লিতে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল এসএফআই-এর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে, যার মধ্যে নাম ছিল ঋতব্রত ব্যানার্জীরও।
অমিত মিত্র তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে প্ল্যানিং কমিশনের এক বৈঠকে যাচ্ছিলেন। মিজ ব্যানার্জীও ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ তোলেন। মি. মিত্রকে হেনস্থা ও ধাক্কাধাক্কির অভিযোগে যাদের গ্রেফতার করা হয় তাদের মধ্যে ছিলেন ঋতব্রত ব্যানার্জীও।
কলকাতায় এক বাম ছাত্র নেতা সুদীপ্ত গুপ্তের মৃত্যুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন তারা।
অমিত মিত্রকে দিল্লিতে হেনস্থার পরেই পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইএমের কয়েকশো অফিস ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয় তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা।
পরে অবশ্য অমিত মিত্রের ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছিলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
সিপিআইএম থেকে বহিষ্কৃত
বাম রাজনীতিতে ঋতব্রত ব্যানার্জীর উত্থান যেমন হয়েছিল উল্কার গতিতে, তেমনই তার রাজনৈতিক সফরকালে বিতর্কও সঙ্গী হয়েছে।
২০১৭ এক নারীর দায়ের করা অভিযোগকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়।
ঋতব্রত ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে এক নারী বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস এবং যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই অভিযোগ অস্বীকার করে সে সময়ে ঋতব্রত ব্যানার্জী পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন।
তিনি ব্ল্যাকমেল করে অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছিলেন ওই নারীর বিরুদ্ধে।
মামলাটির তদন্ত করছিল রাজ্য সিআইডি। তাকে বেশ কয়েকবার এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে তিনি আগাম জামিনের জন্য আবেদন জানান, যা মঞ্জুর হয়।
এই ঘটনার সামনে আসার পরেই দল তাকে বহিষ্কার করে। ওই অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করে এসেছেন তিনি। দলের তরফে বহিষ্কারের পর সে বিষয়ে উষ্মাও প্রকাশ করেছেন।
বহিষ্কারের পরে ২০২০ সাল পর্যন্ত দলহীন অবস্থাতেই রাজ্যসভায় সংসদ সদস্য হিসাবে ছিলেন তিনি। তারপরে তৃণমূলে যোগ দেন।
সেই সময় তার এই শিবির পরিবর্তন নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি।
আবার তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ধরানোর মূল কারিগর হয়ে ওঠার পরে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারাই সেই ঘটনা সামনে তুলে আনছেন।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
তৃণমূলে নতুন ইনিংস
তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর তার রাজনৈতিক সফরের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
এই শিবিরেও তার উত্থান উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে দলের শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দ্রুত দলের অন্দরে গুরুত্ব পেতে শুরু করেন তিনি।
২০২৪ সালে তৃণমূলের তরফে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হন তিনি।
সুবক্তা এবং সক্রিয় নেতা হিসাবে তৃণমূলের অন্দরে প্রশংসিত হয়েছেন ঋতব্রত ব্যানার্জী।
সেই সময় দলের তরফে দিল্লিতে একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তাকে দেখাও গিয়েছিল।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
'বিদ্রোহী' ভূমিকা
চলতি বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাকে প্রার্থী হিসাবে ভোট যুদ্ধে সামিল করার সিদ্ধান্ত নেয় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
উলুবেড়িয়া পূর্ব আসনে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে তার নাম ঘোষণা করা হয়। ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবি হলেও দলের টিকিটে জেতা ৮০জন বিধায়কের মধ্যে তিনিও একজন।
তারপরই অঙ্ক একটু একটু করে বদলাতে থাকে। তৃণমূলের অন্দরেও যেমন সমীকরণে বদল হয়, তেমনই বদল আসে ঋতব্রত ব্যানার্জীর রাজনৈতিক সফরেও।
ভোটে ভরাডুবির পর অভিষেক ব্যানার্জী ও তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের বিরুদ্ধে যারা সরব হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ঋতব্রত ব্যানার্জী।
এক সময়ে অভিষেক ব্যানার্জীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল হলেও সেই সমীকরণেও ক্রমে বদল এসেছিল।
গত একমাসে একাধিকবার অভিষেক ব্যানার্জী এবং আইপ্যাকের সমালোচনাও করতে দেখা গিয়েছে তাকে। বলতে শোনা গিয়েছে "দলের রাশ কর্পোরেট সংস্থার হাতে" চলে গিয়েছিল। এরই মাঝে বিধানসভায় সই নিয়ে অসংগতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে।
ভোটের ফল প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলনেতা হবেন, তা ঠিক করতে গত ছয়ই মে মমতা ব্যানার্জীর বাড়িতে বিধায়কদের একটা বৈঠক হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভায় এই সংক্রান্ত প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার কথা।
বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর নিয়ম মেনে সই করেন সমস্ত বিধায়কেরা। স্পিকারের তরফে বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূলের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার নাম নিয়ে প্রস্তাবনাপত্র চাওয়া হয়।
এরপর ১৯শে মে আবার কালীঘাটে বৈঠক ডাকেন মমতা ব্যানার্জী। কিন্তু ওই দিন অনেকেই অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ। উপস্থিত সকলের সই নেওয়া হয় দলের তরফে। সমস্যার সূত্রপাত ওই প্রস্তাবনায় যে সমস্ত স্বাক্ষর ছিল তাকে ঘিরেই। বিধায়কদের সইতে অসংগতি আছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। প্রস্তাবনায় অনেকের নাম ইংরেজির ক্যাপিটাল লেটারে আছে বলে অভিযোগ ওঠে।
তৃণমূল দাবি করে ওই অভিযোগ তোলার নেপথ্যে বিজেপির হাত রয়েছে।
সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দেন বিজেপি নয়, তৃণমূলের টিকিটে বিধানসভা ভোটে জিতে আসা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকারের কাছে সই সংক্রান্ত অসংগতির অভিযোগ জানিয়েছিলেন।
এরপর প্রথমে কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের, তারপর সেই মামলার তদন্তভার সিআইডি-র হাতে তুলে দেওয়া, তৃণমূলের তরফে দুই 'বিদ্রোহী' বিধায়ককে বহিষ্কার এবং শেষপর্যন্ত বিধানসভার স্পিকারের সম্মতিক্রমে বিধানসভায় ঋতব্রত ব্যানার্জী বিরোধী দলনেতার মর্যাদা লাভ।
ছবিটা দ্রুত বদলে যেতে থাকে।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
তৃণমূল ভাঙার পিছনে কি বিজেপি?
রাজনীতির ময়দানে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নতুন ইনিংস শুরু করেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হিসাবে।
যদিও মমতা ব্যানার্জী- অভিষেক ব্যানার্জীর দল তাকে বহিষ্কার করেছে, অন্যদিকে তিনি সেই দলেরই প্রতিনিধি বলে দাবি করে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার মর্যাদায় নির্দিষ্ট কক্ষে গিয়ে বসেছেন।
কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনের পিছেন কি বিজেপির হাত আছে? এই প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
যদিও বিজেপির নেতারা মানতে চাইছেন না এটা।
তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ঋতব্রত ব্যানার্জীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দিল্লির বঙ্গবভনে 'হঠাৎ দেখা' হয়ে যাওয়াটা।
তারপর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসে 'বিদ্রোহে' বিজেপি পিছন থেকে মদত দিয়ে আসছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন।
যদিও তৃণমূলের ভাঙনের বিষয়ে বিজেপির সুকান্ত মজুমদার বুধবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "যে দলের কোনো মতাদর্শ নেই, সেই দলের এমনটাই হওয়ার ছিল। একথা আমরা অনেকদিন থেকেই বলে আসছি।"
আবার এটাও ঘটনা যে, তৃণমূল কংগ্রেসের 'বিদ্রোহী'দের অনেকেই জিতে এসেছেন এমন এলাকা থেকে, যেখানে মুসলমান ভোটারদের সংখ্যা অনেক।
তাই নিজেদের নির্বাচনী আসনের ভোটারদের সঙ্গে 'বিশ্বাসঘাতকতা' করে তারা সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেবেন, এমন সম্ভাবনা এখনই নেই বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।








