যে পাঁচটি কারণে এবারে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ছিল একেবারে অন্যরকম

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- পড়ার সময়: ৮ মিনিট
টানা দেড় মাস ধরে ম্যারাথন ভোটপর্ব শেষে গোটা পশ্চিমবঙ্গ এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে চৌঠা মে-র দিকে।
সে দিনই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে তৃণমূল কংগ্রেস টানা চতুর্থবারের মতো রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারছে, না কি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি।
ভারতে কোনো নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া আর ভোটগণনা শুরুর মধ্যে যে ব্যবধানটা থাকে, সেই সময়ে যথারীতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আর চর্চা থাকে 'এক্সিট পোল' বা বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এবারে যে কয়েকটি এক্সিট পোলের ফল সামনে এসেছে, তার প্রায় সবগুলোতেই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান খুব কম থাকবে বলে পূর্বাভাস করা হয়েছে। এবং গরিষ্ঠতা পেলেও কোনো দলই খুব বিরাট ব্যবধানে জিতবে না বলেও এক্সিট পোলগুলো থেকে ইঙ্গিত মিলছে।
এর ফলে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে জল্পনা যথারীতি আরও বেড়েছে এবং অনেকেই ধারণা করছেন, পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটে প্রধান প্রতিপক্ষ দুই দলের মধ্যে খুব 'হাড্ডাহাড্ডি' একটা লড়াই হবে।
গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু বরাবর প্রায় 'একপেশে' নির্বাচন দেখে এসেছে। মানে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট বা তৃণমূল কংগ্রেস – যখন যারাই জিতেছে তারাই বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ফলে এক্সিট পোলের ইঙ্গিত অনুযায়ী সত্যিই শেষ পর্যন্ত জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে সেটা হবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য অতি বিরল একটা ঘটনা।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকছেই। কারণ এক্সিট পোলের ফল কখানোই পুরোটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, এমনটা হতেই পারে যে কোনো একটি দল দুশো বা তারও বেশি সংখ্যক আসন পেয়ে অনায়াসে সরকার গড়ে ফেলল।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন আরও এমন কয়েকটি কারণে একেবারে আলাদা ছিল, যা নিয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
প্রধান দুটো দলের সর্বোচ্চ নেতা-নেত্রী, তাদের প্রার্থী ও রাজনীতিবিদরা, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবারের ভোটে এমন অনেক করেছেন বা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা এই ভোটকে একেবারেই অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে।
কিন্তু কী সেই জিনিসগুলো, যা পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটকে একেবারে অন্যরকম করে তুলেছে- এই প্রতিবেদন উত্তর খুঁজেছে সেই প্রশ্নেরই।

ছবির উৎস, Getty Images
মোটের ওপর সহিংসতা-মুক্ত নির্বাচন
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে নির্বাচনী সহিংসতা ওই রাজ্যের এমন একটি বাস্তবতা, যা সব দলের শাসনামলেই কমবেশি বজায় থেকেছে।
ভোটের সময় বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, রাজনৈতিক খুনখারাপি, ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে যেতে বাধা দেওয়া, যেখানে যে দলের প্রভাব বেশি সেখানে অন্য দলের পোলিং এজেন্টকে বসতে না দেওয়া – এগুলো কার্যত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছিল।
সেই জায়গায় রাজ্যে এবারের ভোট হয়েছে একেবারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে – দুই দফার ভোটগ্রহণে গোটা রাজ্যে একটিও সহিংসতাজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘাত ছাড়া খুব বড় কোনো গন্ডগোলেরও খবর নেই।
এমন কী, প্রথম দফার ভোটগ্রহণের পর ১৫২টি আসনের একটি বুথেও পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ জারি করতে হয়নি নির্বাচন কমিশনকে।
দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনের ক্ষেত্রে সামান্য কয়েকটি বুথে অভিযোগ ওঠার পর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দুটি বিধানসভা আসনের ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেছেন নির্বাচন কমিশন। ওই জেলারই ফলতা আসন নিয়েও বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে। সেখানে পুনর্নির্বাচন হবে কি না, তা এখনো জানানো হয় নি।
এর পেছনে অবশ্যই একটা বড় কারণ ভোটের সময় বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি। রাজ্যে এবার মোট ২ লক্ষ ৪০ হাজার আধাসামরিক বাহিনী সদস্য নির্বাচনী সুরক্ষায় মোতায়েন ছিলেন – যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বুধবার (২৯ এপ্রিল) জানিয়েছেন, এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বা ৭০ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তা বাহিনী সদস্য ভোট মিটে যাওয়ার দু'মাস পরে পর্যন্তও রাজ্যে অবস্থান করবেন।
পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু 'পোস্ট-পোল' বা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতারও বহু পুরনো নজির আছে, বিগত নির্বাচনগুলোর পর পরাজিত দলের কর্মী-সমর্থকদের দলে দলে গ্রামছাড়া হওয়ার বহু ঘটনা আছে, দাবি করা হচ্ছে সেটা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা কতটা ঠেকানো যাবে তা অবশ্য বোঝা যাবে আরো কয়েকটা দিন পরেই, কিন্তু ২০২৬র বিধানসভা নির্বাচন যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে একটি নতুন নজির গড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ছবির উৎস, Getty Images
সব রেকর্ড ভাঙল ভোটদানের হার
পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ – দেশের স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে কোনোদিন কোনো নির্বাচনে এত বেশি হারে ভোট পড়েনি।
পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য বরাবরই অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশি ভোট পড়ে, কিন্তু শহর-গ্রামাঞ্চল নির্বিশেষে ৯০ শতাংশর কাছাকাছি বা তার বেশি ভোট পড়া ওই রাজ্যের জন্যও একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
জাতীয় নির্বাচন কমিশন তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এর আগে (শতাংশের হিসেবে) সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, আর তা ছিল ৮৪.৭২ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে চুরমার।
অনেকেই অবশ্য এত বেশি ভোটদানের হারের সঙ্গে ভোটার তালিকার 'নিবিড় সংশোধন' বা এসআইআরের সম্পর্ক টানছেন।
বহু পর্যবেক্ষকই বলছেন, এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়ায় তালিকা আগের তুলনায় অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়েছে – কাজেই এখন ভোটদানের শতকরা হার বাড়াতে পাটিগণিতের হিসেবেই অস্বাভাবিক কিছু নেই।
তবে দ্বিতীয় আর একটা যুক্তি হল, এসআইআরে 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি'র কারণে যেহেতু লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারেরও নাম বাদ পড়েছে – তাই তালিকায় নাম থাকা অনেকের মনেও এই ভয়টা ঢুকে গিয়েছিল যে 'এবারের ভোট দিতেই হবে, নইলে সামনে আমাদেরও নাম বাদ পড়তে পারে'! অর্থাৎ আগামী দিনে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার আতঙ্কেও ভুগেছেন বহু মানুষ।
সম্ভবত এটাও একটা বড় কারণ যে বহু মানুষ এবারের ভোটটা দিতে নিজের কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন, ভিনারাজ্য থেকে দলে দলে গাঁয়ে ফিরেছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা।
আসল কারণটা যাই হোক, ভোটদানের শতকরা হিসেবে ২০২৬-র নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি রেকর্ড গড়েছে যা ভাঙা হয়তো বেশ কঠিন হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
মাটি কামড়ে মোদী-শাহ, কলকাতায় রাত্রিযাপন
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন দেশের কোনো প্রান্তে নির্বাচনী প্রচারণায় যান, রাতে রাজধানী দিল্লিতে ফিরে আসাটাই তার রেওয়াজ।
সুদূরতম তামিলনাডুই হোক অরুণাচল প্রদেশ, দিনে তিন-চারটে জনসভা করেও তিনি দিল্লিতে ফিরে এসেছেন, এমন বহু নজির আছে।
কিন্তু সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনের সময় তিনি কলকাতার রাজ্যপাল নিবাসে একাধিকবার রাত্রিযাপন করেছেন।
শুধু তাই নয়, ভোরবেলায় উঠেই তিনি ছুটে গেছেন কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন, গঙ্গাবক্ষে ক্যামেরা হাতে নৌবিহারও বাদ দেননি।
উত্তর কলকাতার রাজপথে বা কলকাতা-সংলগ্ন হাওড়ার সরু রাস্তাতেও একের পর এক রোড শো করেছেন, আমজনতার হাতের নাগালে এসে ধরা দিয়েছেন। এমন কী, বিজেপি জিতলে শপথ গ্রহণে নিজে আসবেন বলেও ঘোষণা করে গেছেন।
মোদীর ক্যাবিনেটে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অমিত শাহ-ও দিনের পর দিন পশ্চিমবঙ্গে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন। রাজ্য জুড়ে একটার পর একটা সভায় ভাষণ দিয়েছেন।
বিরোধীরা যখন অভিযোগ করেছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব কাজ ফেলে কেন ভোটের প্রচারে কলকাতায়, অমিত শাহ তাতে আমলই দেননি।
নরেন্দ্র মোদীর বর্তমান মেয়াদেই বিজেপি যে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলে কতটা মরিয়া, তা বোধহয় এই ছবিগুলো থেকেই স্পষ্ট।
বিজেপির পূর্বসূরী জনসঙ্ঘর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, সেখানে শাসকের ভূমিকায় আসাটা বিজেপির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
এবারের নির্বাচনকে বিজেপি সেই স্বপ্নপূরণেরই সেরা সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং যে কারণে নরেন্দ্র মোদী পর্যন্ত রাজ্যের সবগুলো আসনে 'আমিই প্রার্থী' বলে ঘোষণা করেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
মমতা ব্যানার্জী কি একটু বিচলিত?
নরেন্দ্র মোদী যে কথাটা এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে প্রথমবার বলেছেন, রাজ্যের গত পনেরো বছরের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সেই কথাটা প্রায় নিয়ম করে প্রতিটা নির্বাচনেই বলে থাকেন।
তিনি ভোটারদের উদ্দেশে প্রায়শই বলেন, "আপনাকে দেখতে হবে না আপনার কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী কে! মনে করবেন ২৯৪টি আসনে আমিই প্রার্থী, আমার কথা ভেবেই ভোট দেবেন!"
যে কারণে বিরোধীরা অনেক সময় রসিকতা করে বলে থাকেন, তৃণমূল কংগ্রেসে আসলে একটাই পদ বা 'পোস্ট', আর সেটা শুধু মমতা ব্যানার্জীর – বাকি সবই নাকি 'ল্যাম্পপোস্ট'!
তবে মমতা ব্যানার্জী যে নিজের খাসতালুকে নিজের রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী, এটা সম্ভবত তারও পরিচায়ক।
বস্তুত কলকাতার দক্ষিণে যাদবপুর বা দক্ষিণ কলকাতার মতো আসনে তিনি গত বিয়াল্লিশ বছর ধরে একটানা জিতে আসছেন, এখন তিনি যে ভবানীপুর আসনের প্রার্থী সেটাও এই এলাকার ভেতরেই পড়ে।
২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যখন গোটা রাজ্যে মাত্র একটি আসনে জিতেছিল, তখনও এই ভবানীপুর-সহ দক্ষিণ কলকাতার এমপি ছিলেন তিনি।
চিরকাল এখানে তিনি অনায়াসে জিতে এসেছেন, নিজেকে খুব একটা প্রচারেও নামতে হয়নি। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রীটে যেখানে তার আদি বাসভবন, সেটাও এই কেন্দ্রের ভেতরেই।
অথচ এবারে সেই ভবানীপুরে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তাকে যেভাবে পুরো কেন্দ্র জুড়ে ছুটোছুটি করতে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় তিনি মেজাজ পর্যন্ত হারিয়েছেন, সেটা অনেককেই অবাক করেছে।
২৯শে এপ্রিল যারা ভবানীপুর কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের দিন মমতা ব্যানার্জীকে দেখেছেন, তারাও অনেকেই আমাকে বলেছেন সে দিন তার শরীরের ভাষাতেও সেই আত্মবিশ্বাস ছিল অনুপস্থিত।
পনেরো বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার পর এক ধরনের 'অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি'র মোকাবিলা তাকে করতে হচ্ছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এর মাঝে তার সরকারের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসকে যে বেশ রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে গোটা নির্বাচনটা লড়তে হয়েছে, সেটাও এবারের ভোটে একটি ভিন্নতর মাত্রা।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty
'বাঙালি অস্মিতা' নিয়ে বাড়াবাড়ি?
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে সেই রাজ্যের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস বরাবরই একটি আলোচিত নির্বাচনী ইস্যু। এক একটি রাজ্যে এক এক সময় তা নিয়ে বহু বিতর্কও হয়েছে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে 'বাঙালিয়ানা'র সংস্কৃতি যেভাবে ইলেকটোরাল ডিসকোর্সকে প্রভাবিত করে চলেছে, তেমনটা বোধহয় আর কোনো রাজ্যেই কখনো হয়নি।
এর একটা বড় কারণ, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস চিরকাল নিজেদের 'বাঙলা ও বাঙালির দল' হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, দাবি করেছে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তারাই সবচেয়ে উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তি।
বস্তুত ২০২১-র নির্বাচনে তাদের প্রধান স্লোগানই ছিল, "বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়"। এবারের ভোটের আগেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশি সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গবাসীদের হেনস্থার ঘটনাতেও তারা 'বাঙালি বিপন্ন' বলে আওয়াজ তুলেছে।
উল্টোদিকে বিজেপি-কে ওই রাজ্যে লড়তে হচ্ছে এমন একটা ধারণার সঙ্গে, যে তারা আসলে 'হিন্দি হার্টল্যান্ড' বা গোবলয়ের দল – বাঙালিয়ানার সঙ্গে যে দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো মিল নেই।
বিজেপি তথা জনসঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পশ্চিমবঙ্গের ছিলেন, সেই যুক্তি দিয়েও বিজেপিকে রাজ্যে পায়ের তলায় জমি পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় এত গুরুত্ব পাওয়ার কারণেই 'অস্মিতা' শব্দটি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে এখন বহুল ব্যবহৃত, যেটি এক সময় গুজরাটের নিজস্ব গর্ব বা সংস্কৃতিকে বোঝাতে নরেন্দ্র মোদী খুব ব্যবহার করতেন।
এই তথাকথিত 'বাঙালি অস্মিতা' ভোটের ময়দানে এতটা গুরুত্ব পেয়েছে বলেই কলকাতায় একজন বিজেপি প্রার্থীকে মাছ হাতে ঝুলিয়ে প্রচারে বেরোতে হয়েছে কিংবা স্মৃতি ইরানির মতো বিজেপি নেত্রী এসে গর্ব করে বলেছেন, "আমি বাংলার বাগচীবাড়ির মেয়ে, মাছের কাঁটা বেছে খেতে জানি!"
উল্টোদিকে মমতা ব্যানার্জী নিজে তো বটেই, অভিষেক ব্যানার্জী-সহ দলের অন্য নেতানেত্রীরাও একের পর এক সভায় দাবি করেছেন, বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায় এলে বাঙালির পাতে মাছ-মাংস ওঠা বন্ধ হবে, তখন নিরামিষ খেয়েই বাঁচতে হবে।
হিন্দি বলয়ের মতো নামের শেষে 'জী' বলে সম্বোধন করাটা বাঙালির সংস্কৃতি নয়, সেটাও তারা অনেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন।
একটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সেই রাজ্যের সংস্কৃতি-ভাষা-খাদ্যাভ্যাস রক্ষার বিষয়টি এতটা রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে – এরও সম্ভবত সাম্প্রতিক আর কোনো তুলনা নেই!








