অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, পশ্চিমবঙ্গে 'দুর্বল অর্ণবের' প্রভাব চলবে কতদিন?

ছবির উৎস, ANI
বুধবার ২৯শে অক্টোবর সারা দিন ধরে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করেছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। শক্তি ক্ষয় করে এই ঘূর্ণিঝড় এখন পরিণত হয়েছে গভীর নিম্নচাপে, যার অভিমুখ উত্তর-পশ্চিম দিকে।
অন্ধ্রপ্রদেশে পাঁচ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু।
এছাড়াও অন্ধ্রপ্রদেশে পরিকাঠামো ও কৃষিজনিত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে, যদিও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে এখনো হিসাব চলছে বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার।
সাইক্লোন অর্ণবের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও তেলেঙ্গানার বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে।
তবে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অন্ধ্র ও ওড়িশা উপকূলে আবহাওয়ার উন্নতিও চোখে পড়েছে। কয়েকটি অঞ্চল থেকে মেঘ সরে রোদের দেখা মিলেছে।
ভারতের আবহাওয়া দফতর (আইএমডি) জানিয়েছে, সাইক্লোন অর্ণব এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত ছয় ঘণ্টায় এটি ঘণ্টায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার বেগে উত্তর দিকে এগিয়েছে এবং একটি 'নিম্নচাপে' পরিণত হয়েছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ২৮শে অক্টোবর রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ এর কেন্দ্র ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের কাছে, দক্ষিণ ওড়িশা, দক্ষিণ ছত্তিশগড় এবং উত্তর-পূর্ব তেলেঙ্গানা সংলগ্ন এলাকায়।
প্রবল বৃষ্টির কারণে অন্ধ্র প্রদেশের বেশ কয়েকটি জেলার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। মূলত রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলির পাশাপাশি কাকিনাড়া, কোনাসীমা এবং পূর্ব গোদাবরী জেলায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে।
আগামী কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গেও একাধিক অঞ্চলে হলুদ সতর্কতা রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাত-সহ ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Noah SEELAM / AFP via Getty Images
অন্ধ্রপ্রদেশে ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের কারণে অন্ধ্রপ্রদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কেন্দ্রীয় দল পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে ১৪টি জেলায় ১৬টি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং ১১টি রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর দল মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ১৮০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২২০টিরও বেশি গাছ সড়কের ওপর ভেঙে পড়েছে। উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে।
কোনাসীমা, কাকিনাড়া, পূর্ব ও পশ্চিম গোদাবরী, অনাকাপল্লে এবং কৃষ্ণা জেলায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব গুরুতর বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাবের পর কেন্দ্রের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। ত্রাণকাজে এনডিআরএফ ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় দল পাঠানোর অনুরোধ করেছেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, ANI
কেমন থাকবে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া?
পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া পূর্বাভাসে মৌসম ভবন থেকে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়েছে, গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আজ ২৯শে অক্টোবর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের উপকূল ও সংলগ্ন এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুক্রবার ৩০শে অক্টোবর পর্যন্ত মধ্যে রাজ্যের কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসও দিয়েছে ভারতের আবহাওয়া দফতর।
দক্ষিণবঙ্গে ২৯শে অক্টোবর সকাল পর্যন্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামের দু-এক জায়গায় সাত থেকে ১১ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া দফতর। সঙ্গে ছিল ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া।
শুক্রবার ৩০শে অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম বর্ধমানের দু-এক জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর পর থেকে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে।

ছবির উৎস, ANI
খোলা জায়গায় বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে ২৯শে অক্টোবর পর্যন্ত। নিচু এলাকা ও আন্ডারপাসে সাময়িক জল জমতে পারে। মাঠে থাকা ফসল ও বাগিচা ফসলেরও কিছু ক্ষতি হতে পারে।
জল জমা মোকাবিলায় কলকাতা পৌরসংস্থা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। শহরে যে সব অঞ্চলে জল জমা একটি সমস্যা, সেই সব অঞ্চলে ভারী পাম্প ও পোর্টেবল পাম্প মজুত রেখেছে কলকাতা পৌরসংস্থা।
বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সময় নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়া, গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং জলাশয় থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপকূলবর্তী মানুষদের ২৯শে অক্টোবর পর্যন্ত সমুদ্রসৈকতে যাতায়াত ও বিনোদনমূলক কার্যকলাপ পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার ২৯শে অক্টোবর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা উপকূল এবং পশ্চিম-মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গে ২৯শে থেকে ৩১শে অক্টোবর বৃষ্টির দাপট বাড়তে পারে। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ৩০শে অক্টোবর থেকে সেই তালিকায় কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারও রয়েছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের পাহাড়ি এলাকায় ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।

ছবির উৎস, ANI
ওড়িশার একাধিক অঞ্চল প্লাবিত, বাতিল ট্রেন
গুরুতর ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে বুধবার ওড়িশার বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি হয়েছে। ভুবনেশ্বরের আঞ্চলিক আবহাওয়া কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আজ সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত গজপতি জেলার মহেন্দ্রগড়ে সর্বোচ্চ ২৪৯ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
অতিবৃষ্টির ফলে গজপতি জেলার একাধিক অঞ্চল প্লাবিত হয়ে ব্যাহত হয়েছে জনজীবন। গজপতি জেলার কালেক্টর অক্ষয় সুনীল আগরওয়াল সংবাদসংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন, "ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় বিশেষ করে মোহনা, উদয়গিরি ও রায়গড়া ব্লক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
"অনেক জায়গায় গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দমকল ও ওড়িশা বিপর্যয় মোকাবিলা দল দ্রুত গাছ সরিয়ে রাস্তা খুলে দিয়েছে। তবে ভারী বৃষ্টিতে কিছু নদী ও নালা উপচে পড়ছে। কয়েকটি সেতুর ওপর দিয়ে জল বইতে থাকায় সেখানে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।"

ছবির উৎস, ANI
কালেক্টর জানিয়েছেন যে, জল জমার আশঙ্কা রয়েছে এমন এলাকাগুলো থেকে এখনো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত জেলা থেকে প্রায় ১৭ হাজার মানুষকে সরিয়ে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের খাবার, পানীয় জল ও থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে কালেক্টর অক্ষয় সুনীল আগরওয়াল জানিয়েছেন, "সার্বিকভাবে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বৃষ্টি কিছুটা থেমেছে। তবে আজ রাতের জন্য জেলায় 'রেড ওয়ার্নিং' রয়েছে। সেই কারণে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।"
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ইস্ট কোস্ট রেলওয়ে ২১টি ট্রেন বাতিল করেছে। রায়গড়ায় দু'টি ট্রেনের যাত্রাপথ সংক্ষিপ্ত করা বা সেখান থেকে যাত্রা শুরু করার কথাও জানানো হয়েছে।
২৭শে অক্টোবর থেকে ৫ই নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত বেশ কয়েকটি ট্রেনযাত্রা বাতিলের আওতায় পড়েছে।

ছবির উৎস, ANI
অন্ধ্রপ্রদেশে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কী জানা যাচ্ছে?
অন্ধ্রপ্রদেশের বিদ্যুৎ দফতরের কর্মকর্তারা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এক পর্যালোচনা বৈঠকে জানিয়েছেন, অর্ণবের প্রভাবে কোনাসীমা জেলায় প্রায় ছয় হাজার বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে। কাকিনাড়া এবং উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশের জেলাগুলোতেও কয়েকশো বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে গেছে।
উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর বহু এলাকায় বিদ্যুতের লাইন ও তার সম্পূর্ণ ছিঁড়ে পড়েছে। এর ফলে উপকূলের বহু গ্রাম ও শহরে ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
তেলেঙ্গানার কাছে সহায়তা চেয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ। বিবিসিকে অন্ধ্রপ্রদেশের বিদ্যুৎমন্ত্রী গোত্তিপতি রবিকুমার বলেছেন, অর্ণবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করার কাজ চলছে।
তার দাবি, অতিরিক্ত কর্মী ও সরঞ্জাম পাঠাতে রাজি হয়েছে তেলেঙ্গানা সরকার।
মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কয়েক হাজার বিদ্যুতের খুঁটি পাঠানো হয়েছে। বৃষ্টি থামার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিদ্যুৎ পরিষেবা ফিরিয়ে আনা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

ছবির উৎস, ANI
ঘূর্ণিঝড়ের জেরে উপকূলীয় জেলাগুলোয় ধান, কোনাসীমা জেলায় নারকেল এবং গোদাবরী উপত্যকায় কলা ও জলজ চাষসহ গুরুত্বপূর্ণ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও বন্যায় হাজার হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, এই ঘূর্ণিঝড় রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রকে বড় ধরনের সংকটের মুখে ফেলেছে। কম বৃষ্টির কারণে রাজ্যের কৃষকরা আগে থেকেই সমস্যায় ছিলেন। কৃষকদের দাবি, হাজার হাজার একর জমিতে কাটার জন্য তৈরি ধান নষ্ট হয়ে গেছে।
কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, চলতি খারিফ মৌসুমে রাজ্যে মোট ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার একর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ লাখ একর জমিই ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে পড়েছে।









