বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থা কি এখনো রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে?

- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার একটি জনসভায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, তার কাছে পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে দুই পক্ষ এক হয়ে গেছে। তার এই বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কেননা, ২০২৪ সালের অগাস্টে পতনের আগে ১৬ বছর যখন আওয়ামী লীগ একটানা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, তখনকার বিরোধী দল বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহারের অভিযোগও ছিল।
তাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আবারো রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থাকে আগের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে কি-না সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।
মঙ্গলবার তারেক রহমানের দেওয়া এই বক্তব্যের পরই এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়াত ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।
জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার তাদের "অপকর্ম ও দুর্নীতি আড়াল করতে" বিরোধীদলের ওপর দায় চাপাচ্ছে।
যদিও বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে জামায়াত ও আওয়ামী লীগের 'যোগসাজশ' নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি খুব সুনির্দিষ্ট এবং তিনি জেনে বুঝেই বলেছেন।
বাংলাদেশের সাবেক কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে- রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সরকারের গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন হয়।
তবে, যখন সরকারপ্রধান নিজে যখন গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে সেই তথ্য প্রকাশ করেন, তখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য কীসের ইঙ্গিত?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মঙ্গলবার রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিকেলে রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠে একটি জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তারেক রহমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, "তারা এক হয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে"।
এই বিষয়ে সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলেও জানান সরকারপ্রধান।
সেখানে তিনি বলেন, "আমাদের কাছে গোয়েন্দাদের খবর আছে। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন দেশের কয়েকটি জায়গায় কয়েকটি কল-কারখানায় কিছু শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে"।
গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, "পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে যে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। অর্থ সরবরাহ করে তারা কাদের সাহায্যে করছে"?।
জামায়াত ও আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করে এই বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, "দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে"।
বিএনপি নেতারা বলছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালালেও এ নিয়ে বিরোধী দল কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সঙ্গে যোগসাজশ যে আছে সেই কথাটা আমরা আগেও বলেছি। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান থেকে নিশ্চয়ই তার কাছে এরকম তথ্য আছে বলেই তিনি এই কথাগুলো বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী তো না জেনে কথা বলবেন না"।
বিএনপির এই নেতার যুক্তি হচ্ছে- এর আগেও ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গে এরশাদ সরকারকে বৈধতা দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালেও একসঙ্গে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।
যে কারণে বিএনপির মধ্যে এই ধারণাও রয়েছে জামায়াত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আবারও এক হতে পারে বিএনপির বিরুদ্ধে।
তবে বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ এটাও বলছেন যে, শুধু বক্তব্য নয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী ওপার থেকে আওয়ামী লীগ টাকা পাঠাচ্ছে, এপারে জামায়াতের কেউ না কেউ সেটি গ্রহণ করছে। এখন গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনা"।

ছবির উৎস, PMO
গোয়েন্দা ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন কেন?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা, কিংরা বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে গোয়েন্দাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন বিভিন্ন সময় ছিল।
সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আসলে কী ধরনের কাজ করে কিংবা তাদের দায়িত্ব কর্তব্যের পরিধি কী সেটি জানতে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম সাবেক কয়েকজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন এমন একজন বিবিসি বাংলাকে জানান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা বা এনএসআই-এরই মূলত রাষ্ট্রের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও খোঁজ খবর রাখার কথা। কিন্তু এই সংস্থাটি সেভাবে শক্তিশালী ছিল না। যে কারণে বিভিন্ন সময়ে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিজিএফআইকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই কর্মকর্তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য সরকার ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু সেটি হতে হবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে।
এই কর্মকর্তার মতোই, একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকও বিষয়টিকে প্রায় একইভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তারা বলছেন, অতীতে যতগুলো সরকার এসেছে সব সরকারই গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ব্যবহার করেছে রাষ্ট্র পরিচালনায়। তবে কখনো কখনো এ নিয়ে বিতর্কও হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কারণে।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সরকার চাইলে তার প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থাকে কিংবা তাদের তথ্য ব্যবহার করতে পারে। প্রশ্নটা হলো গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে কি-না বা করে কি-না। এটা নির্ভর করে সরকারের ওপর"।
"তবে, যখন জনসম্মুখে সরকারপ্রধান কোনো তথ্য দিতে গিয়ে তার সোর্সকে এক্সপোজ করেন (প্রকাশ করে), তখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পরবর্তীতে কাজ করতে গিয়ে একটু বিপর্যয়ে পড়তে হয়," যোগ করেন তিনি।

ছবির উৎস, Screen Grab
কী বলছে বিরোধী দল?
তারেক রহমান এই বক্তব্য দেওয়ার পরই এ দলের কড়া অবস্থানের কথা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
মঙ্গলবারই দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একটি সংবাদ সম্মেলনে এর প্রতিক্রিয়া বলেছেন, বিরোধী দলের আন্দোলন উপেক্ষা করার মধ্যে দিয়ে সরকার ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছে।
রাতেই জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান নিজের ভেরিফাইড ফেসবুকে অভিযোগ করেন, জনদুর্ভোগ নিরসন ও অপকর্ম দমনের পরিবর্তে বিএনপি সরকার বিরোধীদলের চরিত্র হননে ব্যস্ত।
শুধু জামায়াতে ইসলামী না, এনসিপি নেতাদেরও কাউকে কাউকে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরই রাতে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন রাখেন- "একজন প্রধানমন্ত্রী কি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে বিরোধীদলের উপর গোয়েন্দাগিরি করার ঘোষণা প্রকাশ্যে দিতে পারেন"?
জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে এবং এর দায় চাপাচ্ছে বিরোধী দলের ওপর।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা দেখছি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও আওয়ামী লীগ গুলশানের মতো জায়গায় মিছিল করছে, নানা জায়গায় বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে, কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তার কোনো তথ্যই নেই"।
তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী এমন একটি পদে থেকে এই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে তা দেখে আমরা হতাশ হয়েছি। অতীতে আওয়ামী লীগ যেভাবে বিভিন্ন ব্যর্থতার দায় বিরোধীদের ওপর চাপাতো, ঠিক একই কায়দায় বিএনপিও তাদের ব্যর্থতার দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপাচ্ছে"।









