আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ফেসবুক পেইজ থেকে আসা আয় যাচ্ছে কোথায়?

    • Author, তানহা তাসনিম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

অন্তত ১৯টি সরকারি ফেসবুক পেইজ থেকে আয়ের সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা- এরকম একটি তথ্য সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এর মাধ্যমে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা নিজের নীতিমালা ভাঙছে কি না এবং সামাজিক মাধ্যম থেকে আসা সরকারি বাহিনীর আয়ের কী হচ্ছে।

ভুয়া খবর ও অপতথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের প্রকাশিত এক গবেষণায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ফেসবুক পেইজ 'মনিটাইজেশনের' বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বুধবার এটি প্রকাশিত হয়।

তারা জানায়, এই মনিটাইজেশনের তালিকায় বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ভেরিফাইডসহ আরও ১৩টি জেলা পুলিশের ফেসবুক পেইজ রয়েছে।

এবিষয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করা হলে কেউ কেউ জানিয়েছেন যে তাদের পেইজ মনিটাইজ করা হয়নি। আবার কেউ বলছেন, পেইজ মনিটাইজ হলেও এখন পর্যন্ত সেখান থেকে কোনো অর্থ উত্তোলন করা হয়নি।

এদিকে সেবামূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক মাধ্যম থেকে উপার্জন নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয় বলে মনে করেন অনেকে।

তারা বলছেন, "আর্থিক প্রণোদনা চালুর ফলে জননিরাপত্তা ও গোপনীয়তার চেয়ে অর্থনৈতিক লাভকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে"।

অন্যদিকে মেটার নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে উপার্জন করতে পারবে না। তা সত্ত্বেও, তারা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আয়ের সুযোগ দিচ্ছে বলেও ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে পেইজগুলো আয় করছে

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের কোনো পেইজ মনিটাইজ হলে সেখান থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।

ডিসমিসল্যাবের গবেষণায়, সরকারি ওয়েবসাইটের সঙ্গে যুক্ত এবং .gov.bd দিয়ে শেষ হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেইজগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কোনো পেইজ ভেরিফাইড কি না তা বিবেচিত হয়নি।

১৯টি পেইজের এই তালিকায় রয়েছে- বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশ, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির ফেসবুক, বান্দরবনের পুলিশ সুপারের ফেসবুক পেইজ।

এছাড়াও বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নওগাঁ, শেরপুর, লক্ষ্মীপুর, মাগুরা, নেত্রকোণা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মৌলভীবাজার, কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের পেইজও রয়েছে।

২০২৫ সালের ৩১শে অগাস্ট মেটা নতুন কন্টেন্ট মনিটাইজেশন ব্যবস্থা চালু করে, যেখানে কেবল ভিডিওই না, ছবি এবং লিখিত পোস্ট থেকে আয়ের সুযোগ দেওয়া হয়।

সামাজিক মাধ্যমের মনিটাইজেশন নীতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা হোয়াট টু ফিক্সের এক উপাত্ত-বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে ডিসমিসল্যাব বলে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১২টি পেইজ কন্টেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়।

পরে আরো সাতটি ফেসবুক পেজ সরাসরি মেটার নতুন কন্টেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে।

মনিটাইজ করলেও অর্থ না তোলার দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর

বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশিকায় নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। যার একটি, জনসচেতনতা ও প্রচারণা।

কিন্তু এতে সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে আয়ের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় নাম আসা একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি। তাদের মধ্যে কোনোটি দাবি করেছে যে তাদের ফেসবুক পেইজ মনিটাইজেশন হয়নি, তো কোনোটি থেকে জানানো হয়েছে, পেইজ মনিটাইজ হলেও তোলা হয়নি অর্থ।

বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. বশির আহমেদ জানান, সংস্থাটির পেইজে কিছু অর্থ জমা হবার বিষয়ে তারা জানতে পেরেছেন। তবে "সুনির্দিষ্ট কোনো কোড না পাওয়ার কারণে অর্থ উত্তোলন করা হয়নি এবং তা ওই অবস্থাতেই আছে"।

কিন্তু অর্থ যদি উত্তোলন করা না যায় তাহলে পেইজটি মনিটাইজ করা হয়েছিল কেন? – এই প্রশ্নের জবাবে মি. আহমেদ বলেন, "ওটা করা হয়েছিল যে মনিটাইজ করতে পারলে সেখান থেকে পাওয়া অর্থ আমরা কোনো কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে পারবো। কিন্তু যেহেতু তুলতে পারি নাই, তাই সেটা ওই অবস্থাতেই আছে"।

অন্যদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশের দাবি, তাদের পেইজটি এখন পর্যন্ত মনিটাইজড হয়নি।

"মনিটাইজ করার জন্য স্যাররা চেষ্টা করেছিল। দেখা যাচ্ছে, এক স্যার কাজ শুরু করে চলে যায়, তারপর আর হয় না। এভাবে পেইজটা আর মনিটাইজেশন করা হয়নি", বলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের সংশ্লিষ্ট শাখায় কর্মরত সাব-ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর আলম।

ডিসমিসল্যাব বলছে, তাদের পক্ষ থেকে চুয়াডাঙা জেলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পেইজটি চালানো পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২০২২-২৩ সালের দিকে মনিটাইজড হলেও পরে তা ব্লক করে দেওয়া হয় এবং বর্তমানে পেইজটি থেকে কোনো আয় করা হচ্ছে না।

যদিও মেটার সহযোগী প্রকাশকদের তালিকা এবং হোয়াট টু ফিক্সের মনিটাইজেশন আর্কাইভ বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্ত হওয়া কন্টেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামটি এখনও সক্রিয়।

অন্যদিকে, কুমিল্লা জেলা পুলিশের পেইজের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আয়ের বিষয়ে স্বীকার করলেও টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা না করায় তা এখনও উঠানো হয়নি বলে জানান।

এদিকে সামাজিক মাধ্যমকে জনসেবা ও জনগণের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ আরও কার্যকর করার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি এ. এইচ. এম. শাহাদাত হোসাইন।

"কোনো প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে যদি মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকে এবং তা প্রযোজ্য বিধি-বিধানের আওতাভুক্ত হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সেটি ব্যবহৃত হবে। এক্ষেত্রে বিধি-বহির্ভূতভাবে অর্থ ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই", বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মেটার নীতিমালাতেও যা নেই

মেটার নিজ নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানসমূহ আয়ের জন্য বিবেচ্য হবে না। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৯টি পেইজ থেকে আয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব পেইজের বেশিরভাগই সরকারি সংস্থা, পুলিশ স্টেশন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। আবার মেটার যেকোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে আয়ের সুবিধা কেবল "আমন্ত্রণের ভিত্তিতেই পাওয়া যাচ্ছে"।

"নির্মাতারা ফেসবুক অ্যাপ, ইমেল, মেটা বিজনেস স্যুট এবং প্রফেশনাল ড্যাশবোর্ডের মতো ফেসবুক বা মেটার অফিসিয়াল চ্যানেলের মাধ্যমে এই আমন্ত্রণ পাবেন", উল্লেখ আছে মেটার হেল্প পেইজে।

তবে কেউ আমন্ত্রণ পাননি, কিন্তু আয়ের সুযোগ চান- তারাও আগ্রহ প্রকাশ করতে পারবেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও 'মনিটাইজেশনের' কোনো নিশ্চয়তা না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন বলছে, "বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৯টি ফেসবুক পেইজও মেটার আমন্ত্রণে কন্টেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে"।

তারা বলছে, কেবল বাংলাদেশই না, ভারত, ফিলিপিন্স, ইজরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত।

সামাজিক মাধ্যম থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আয়ে সমস্যা কোথায়?

সামাজিক মাধ্যম থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অর্থ উপার্জনের সুযোগ জনগণের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করে হোয়াট টু ফিক্স।

তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "জননিরাপত্তা ও আইন সমুন্নত রাখাই পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর মূল দায়িত্ব, 'ক্লিক' বা অনলাইন সাড়া পাওয়ার পেছনে ছোটা নয়। এনগেজমেন্ট বা মিথস্ক্রিয়া-ভিত্তিক আর্থিক প্রণোদনা চালুর ফলে জননিরাপত্তা ও গোপনীয়তার চেয়ে অর্থনৈতিক লাভকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে"।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে আয়ের সুযোগ তৈরি হবার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনও।

নৈতিক জায়গা থেকে আয়ের বিষয়টি সমর্থনের সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, এধরনের সংস্থার মধ্যে সেবার মতো মূল বাজের বদলে আয়ের বিষয়টি প্রাধান্য পেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে যে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন, তা থাকবে না।

"ধরেন, সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিল যে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন কন্টেন্ট প্রকাশ করবে এবং সেটার ভেতর দিয়ে যদি আয় হয়, সেটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাবে"।

"সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে লোকবলের যে সমস্যা, আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে যে দুর্বলতা রয়ে গেছে, সেই কাজগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা প্রাধান্য না দিয়ে যদি এই কন্টেন্ট ক্রিয়েশনে ব্যস্ত হয়ে যায়, সেটাই আমাদের দুশ্চিন্তার জায়গা", বলেন তিনি।