আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সাড়ে তিনশো বছরেও লালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ার পেছনে আছে যে গল্প
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৮ মিনিট
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর অন্যতম একটি হলো লালবাগ কেল্লা। এক সময় ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির নাম ছিল 'ফোর্ট আওরঙ্গবাদ', যার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল এখন থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে এবং যে কাজ আর কখনোই শেষ হয়নি।
কেন শেষ হয়নি সেই কাজ? আর কেনই বা নির্মাণ করা হয়েছিল এই দুর্গটি?
এসব প্রশ্নের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস।
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে দুই দফায় বাংলার সুবেদার ছিলেন শায়েস্তা খান। এর মধ্যবর্তী সময়ে এক বছরের বেশি ঢাকায় সুবাদার হিসেবে এসেছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ মুহাম্মদ আযম। তার সময়েই ঢাকায় লালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার 'স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইয়ে লিখেছেন, "ঢাকায় থাকাকালীন সময়ে যুবরাজ আযম বুড়িগঙ্গার তীরে একটি দুর্গ নির্মাণ শুরু করলেন। নাম রাখলেন 'কিল্লা আওরঙ্গবাদ'। যদিও সবাই এটিকে চিনতো লালবাগ দুর্গ নামেই"।
এর নির্মাণকাজ শুরুর কিছুদিনের মাথায় যুবরাজ আযমকে ঢাকা থেকে দিল্লিতে ফিরিয়ে নেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। দ্বিতীয় দফায় ঢাকায় সুবাদার নিয়োগ করা হয় শায়েস্তা খানকে।
ইতিহাসবিদরা বলছেন, শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তিনি এই দুর্গের নির্মাণকাজ আর এগিয়ে নেননি।
এর পরেও আর কোনো শাসক এটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেননি। ফলে সাড়ে তিনশো বছর ধরে এই দুর্গের নির্মাণকাজ অসমাপ্তই থেকে যায়।
এর পেছনে নানা ধারণা ইতিহাস গবেষকদের লেখায় উঠে এলেও সবচেয়ে প্রচলিত যে ধারণা ছিল সেটি হলো, সুবাদার শায়েস্তা খানের মেয়ে পরীবিবির মৃত্যু।
পরীবিবি ছিলেন শায়েস্তা খানের মেয়ে। ঢাকায় সুবাদার হিসেবে এসে যুবরাজ আজম বিয়ে করেছিলেন পরীবিবিকে।
ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ লিখেছেন, পরীবিবির হঠাৎ মৃত্যুর কারণে এই দুর্গটি অশুভ মনে করতেন শায়েস্তা খান। যে কারণে তিনি দ্বিতীয় দফায় ঢাকায় এসে আর এটির নির্মাণ কাজকে এগিয়ে নেননি।
যদিও এই ঘটনাটিকে সত্য বা নির্মোহ হিসেবে মনে করেন না গবেষকদের অনেকেই। এর পেছনে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাও এসেছে ইতিহাসের বইয়ে।
জানা যায়, মুঘল সম্রাজ্যের অবসানের পর আস্তে আস্তে এই অসমাপ্ত দুর্গটিও অবহেলিত হয়ে পড়ে। এক সময়ে ভবঘুরের দখলেও চলে যায় স্থাপনাটি।
পরে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রথমে সেনাবাহিনীর ব্যারাক এবং আরো পরে পুলিশ ব্যারাক হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছিল এটি।
'কিল্লা আওরঙ্গবাদ' থেকে লালবাগ কেল্লা
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় ছেলে যুবরাজ মুহাম্মদ আজম বাংলার সুবাদার থাকাকালে ১৬৭৮ সালে বড় একটি দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। বাবার নাম অনুসারে এই দুর্গটির নাম রাখেন 'কিল্লা আওরঙ্গবাদ' বা আওরঙ্গবাদ দুর্গ। সেখানে একটি প্রাসাদ তৈরির পরিকল্পনাও ছিল।
ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান তার 'দি মুসলিম মনুমেন্টস অব বাংলাদেশ' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই দুর্গ নির্মাণের সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
এই বইয়ে বলা হয়েছে, লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ দিকের প্রধান প্রবেশদ্বারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি দুই তলাবিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন মুঘল স্থাপনা, যার সঙ্গে ছোট ছোট অলংকৃত প্যাভিলিয়ন সংযুক্ত রয়েছে। কেল্লাটি মূলত একটি সামরিক দুর্গের চেয়ে বেশি একটি প্রাসাদ-দুর্গ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
যে কারণে লালবাগ কেল্লাকে ঢাকার ইতিহাসের স্বর্ণযুগের একটি মূল্যবান স্মারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তখন যুবরাজ আযম এটিকে শুধু প্রশাসনিক দুর্গ নয়, রাজপরিবারের আবাস হিসেবেও ব্যবহার করার চিন্তা করেছিলেন।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার 'স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইয়ে লিখেছেন, দুর্গ সাধারণত নির্মিত হতো আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। তবে লালবাগ দুর্গের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল খানিকটা ভিন্ন। কারণ যুবরাজ আযম চেয়েছিলেন বুড়িগঙ্গার তীরে একটি মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করতে। এবং সে প্রাসাদ রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রাচীরবেষ্টিত একটি দুর্গ।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে কেল্লার মধ্যে যে স্থাপনাগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে টিকে আছে, সেগুলো হলো বিবিপরি বা পরীবিবির সমাধি, লালবাগ মসজিদ, হাম্মামখানা, দরবার হল, দক্ষিণ ফটক এবং প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও বুরুজ।
'দি মুসলিমস মনুমেন্টস অব বাংলাদেশ' বইয়ে বলা হয়েছে, কেল্লার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পরীবিবির সমাধি পুরো কমপ্লেক্সের সবচেয়ে দর্শনীয় ও সর্বাধিক সংরক্ষিত স্থাপনা। এটি একটি বর্গাকার এক-গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধ, যার চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির মিনার রয়েছে। সমাধির কেন্দ্রে রয়েছে মূল কবর, আর তার চারপাশে আটটি কক্ষ নির্মিত হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুফি মুস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মুঘলরা দীর্ঘদিন বাংলা শাসন করলেও তারা শুধু শাসনই করেছে, এই অঞ্চলে অনেক বেশি স্থাপনা নির্মাণ করেনি। তবে, যুবরাজ আযমই একটি থাকার যায়গা তৈরি করেছিলেন, সেটি ছিল লালবাগ কেল্লা"।
হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ
যুবরাজ মুহাম্মদ আযমের তত্ত্বাবধানে যখন নির্মাণ কাজ চলছিল, তখন হঠাৎই মারাঠা বিদ্রোহ শুরু হয়। এই বিদ্রোহ দমনে সহযোগিতার জন্য যুববাজ আজমকে দিল্লি ডেকে পাঠান সম্রাট আওরঙ্গজেব।
অধ্যাপক মামুন তার বইয়ে লিখেছেন, "যুবরাজ আযম দুর্গটি নির্মাণ শুরু করলেও অচিরেই তাকে ঢাকা ত্যাগ করতে হয়েছিল সম্রাটের আদেশে। তার পরিবর্তে ১৬৭৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলার সুবাদার হয়ে রাজধানী ঢাকায় এলেন শায়েস্তা খান"।
তার মতে, সম্রাট আওরঙ্গজেব যখন যুবরাজ আযমকে দিল্লিতে ডেকে পাঠান, তখন দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলা শাসনের জন্য পাঠানো হয়েছিল শায়েস্তা খানকে। যুবরাজ আযমও শায়েস্তা খানকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন কেল্লার নির্মাণকাজটি সমাপ্ত করতে।
"কিন্তু শায়েস্তা খান ব্যক্তিগতভাবে এর মালিক হওয়া সত্ত্বেও এই দুর্গের প্রতি তেমন কোনো আকর্ষণ বোধ করেননি। সুতরাং দুর্গের নির্মাণকাজও তিনি শেষ করেননি," লিখেছেন অধ্যাপক মামুন।
পরবর্তীতে এই লালবাগ কেল্লা নিয়ে যে সব প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে সেখানেও উঠে এসেছে, যে এটি একটি অসমাপ্ত প্রকল্প ছিল।
ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসানের মতে, গঠনগত-ভাবে অসম্পূর্ণ হলেও, লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ ফটকটি চমৎকারভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মুঘল স্থাপত্য রীতির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সাথে সুনির্দিষ্ট সামঞ্জস্য রেখে, এটিকে মূলত একটি তিনতলা ভবন হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত উপরের তলাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মি. হাসান লিখেন, "বিশেষ করে এই কেল্লার ভেতরের দিক থেকে ওপরের তলাগুলোতে যাওয়ার সিঁড়ি কখনোই তৈরি করা হয়নি। তা সত্ত্বেও এটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য সৌন্দর্যের একটি প্রভাবশালী কাঠামো"।
প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুফি মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, মুঘল শাসকরা বাংলা শাসনে আসার পর তারা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল যুদ্ধ বিগ্রহে। যে কারণে ঢাকা যখন বাংলার রাজধানী হয় তখনও সেখানে সুবাদারদের বসবাসের জন্য তেমন কোনো প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়নি।
আর এর ব্যতিক্রম ছিলেন যুবরাজ আযম। যিনি মাত্র অল্প সময়ের জন্য বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই নির্মাণ শুরু করেছিলেন একটি অত্যাধুনিক দুর্গ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "প্রথম দফায় দায়িত্ব পালনের পর যখন শায়েস্তা খান আবার দিল্লি চলে গেলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের ডাকে, তখন মুহাম্মদ আযম ডেপুটি সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আসেন। অর্থাৎ শায়েস্তা খানের অনুপস্থিতিতে তিনি বাংলার শাসনকাজ পরিচালনা করছিলেন"।
তার মতে, শায়েস্তা খানের অবর্তমানে যুবরাজ আযম এই কেল্লাটি নির্মাণ করেছিলেন, যেটিকে খুব একটা ভালোভাবে নেননি সুবাদার শায়েস্তা খান। যে কারণে তিনি পরবর্তীতে আর এটির নির্মাণকাজ এগিয়ে নেননি।
তবে এ সংক্রান্ত নানা বই ও গবেষণায় এই কেল্লাটি অসমাপ্ত থাকার পেছনে অন্যান্য কারণের কথাও উঠে এসেছে।
পরী বিবির মৃত্যু ও অসমাপ্ত দুর্গ
শায়েস্তা খান তখন ছিলেন পূর্ব বাংলার সেনাপতি। তিনি ছিলেন আওরঙ্গজেবের মামা। পরী বিবি ছিলেন শায়েস্তা খানের কন্যা।
ইতিহাসবিদদের লেখায় উঠে এসেছে, এই দুর্গ নির্মাণ না করার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল পরীবিবির মৃত্যু। তার প্রকৃত নাম ছিল ইরান দুখত, যদিও তিনি পরিচিত ছিলেন পরী বিবি নামেই।
পরী বিবির বিয়ে হয়েছিল যুবরাজ মুহাম্মদ আযমের সাথে, যিনি তখন ঢাকার এসেছেন সুবাদার হিসেবে।
কোনো কোনো লেখকের লেখায় উঠে এসেছে, যুবরাজ মুহাম্মদ আযম দিল্লিতে চলে যাওয়ার পরও শায়েস্তা খান লালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে, ১৬৮৪ সালে কন্যা পরী বিবির অকালমৃত্যুতে শায়েস্তা খান দুর্গ নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেন।
পরীবিবির মৃত্যুর পর দুর্গের ভেতরে মসজিদের পূর্ব দিকে পরী বিবিকে সমাহিত করা হয়। এরপর শায়েস্তা খান কন্যার সমাধির ওপর একটি সুদৃশ্য সৌধ নির্মাণ করেন।
অধ্যাপক আব্দুল করিম তার 'বাংলার ইতিহাস' বইয়ে লিখেছেন, "লালবাগ দুর্গের ভেতরে শায়েস্তা খান তার কন্যা বিবি পরীর বা ইরানদুখতের কবরের উপর একটি অত্যন্ত সুন্দর ইমারত নির্মাণ করেন। এটা বিবি পরীর মাজার নামে পরিচিত একটি অনিন্দ্য সুন্দর দালান। এতে সাদা মর্মর পাথর ব্যবহৃত হয়েছে"।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের 'স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইয়ে বলা হয়েছে, দুর্গ নির্মাণের সময়ই যখন পরীবিবির মৃত্যু হয়। যে কারণে শায়েস্তা খান মনে করতেন দুর্গটি অপয়া। যে কারণে তিনি আর দুর্গের নির্মাণ কাজ শেষ করেননি।
যদিও ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে ইতিহাস গবেষকদের মধ্যে। অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "যুবরাজ আযমের শশুর ছিলেন শায়েস্তা খান। নিজের মেয়ের জামাই একটা কেল্লা নির্মাণ করছিলেন, এই বিষয়টি হয়তো শায়েস্তা খানের ভালো লাগেনি, যে কারণে তিনি আর এই দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ করেননি"।
তিনি বলছিলেন, "নিজের মেয়ের মৃত্যুর কারণে দুর্গটিকে অপয়া মনে করার বিষয়টি অসত্য বলে মনে হয়। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন লেখা পড়ে যতটুকু বোঝা যায় শায়েস্তা খানের ব্যক্তিগত অপছন্দ ছিল বলেই তিনি এই নির্মাণ কাজ আর শেষ করেননি।"
যদিও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের বইয়ে বলা হয়েছে, নিজের কন্যার সমাধিসৌধ নির্মাণের জন্য শায়েস্তা খান রাজমহল থেকে এনেছিলেন ব্যাসাল্ট, চুনার থেকে বেলে পাথর, জয়পুর থেকে সাদা মার্বেল। সমাধিসৌধে ঢোকার জন্য যে চারটি দরজা ছিল তার মধ্যে তিনটি মার্বেল পাথরের ঝালরে আবৃত।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর
যেভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হয়ে উঠল
লালবাগ কেল্লা অসম্পূর্ণ হলেও এটি মুঘল আমলে ঢাকার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের অন্যতম প্রধান স্মারক।
পরী বিবির মৃত্যুর কয়েক বছর পরে ১৬৮৮ সালে শায়েস্তা খান অবসর নিয়ে আগ্রা চলে যাওয়ার সময় দুর্গের মালিকানা উত্তরাধিকারীদের দান করে যান। এর পর নানা কারণে লালবাগ দুর্গের গুরুত্ব কমতে থাকে।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের মতে, শায়েস্তা খান ঢাকা ত্যাগের পর রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে পর্যন্ত মুঘল সৈন্যরা এই কেল্লাটি ব্যবহার করতো। এরপর এই কেল্লাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।
পরবর্তীতে আস্তে আস্তে করে এই কেল্লাটি ভবঘুরেরা থাকতে শুরু করে। সেখানে যে মসজিদটি ছিল সেটি ব্যবহার হতো মাঝে মধ্যে।
'স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইয়ে বলা হয়েছে, এরপর আস্তে আস্তে লালবাগের প্রাচীর, ভেতরের ইমারতসমূহ জীর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ছিল। হামাম্মের পাশে যে পুকুরটি ছিল সেটি হয়ে ওঠে দুর্গন্ধময়। যেখানে গড়ে ওঠে জঙ্গল।
দীর্ঘদিন এটিতে বসবাস করে ভবঘুরে ও গৃহহীনদের অনেকে। পরে ১৮৪২ সালে ঢাকা শহর উন্নয়নের জন্য গঠিত ঢাকা কমিটি ঠিক করেছিল শহরের একটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে লালবাগ দুর্গের উন্নয়ন করবে।
পরে ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গের উন্নয়ন কাজ শুরু করে। এ সময় দুর্গটি 'লালবাগ দুর্গ' নামে পরিচিতি লাভ করে।
অধ্যাপক মামুনের 'স্মৃতি বিস্মৃতি নগরী' বইয়ে বলা হয়েছে, কমিটি ১৮৪৪ সালে দুর্গের লিজ নেওয়ার পর উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছিল। এজন্য সরকার বিশেষ মঞ্জুরি প্রদান করেছিল। দুর্গের প্রাচীর ও ইমারত মেরামতের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের।
আগে থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় যারা দুর্গের ভেতরে অবস্থান নিয়েছিল তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে।
সে সময় একটি বাগান করা হয় দুর্গের ভেতর। এই উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন স্কিনার, পাদরি শেফার্ড ও ডা. টেইলর।
১৮৪৪ থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত এই তিন বছরে শেষ করা হয় উন্নয়ন কাজ, ইতিহাসের বিভিন্ন বইয়ে যার উল্লেখও রয়েছে।
অধ্যাপক মামুন লিখেন, "১৮৫৩ সালে পুরানা পল্ট থেকে সেনানিবাস স্থানান্তর করা হয় লালবাগ দুর্গে। কারণ তখন পুরানা পল্টন পরিণত হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর অঞ্চলে। ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের পর লালবাগ থেকে সেনানিবাস সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পুলিশ রিজার্ভ ফোর্সকে স্থানান্তর করা হয়েছিল লালবাগে"।
ব্রিটিশ আমল থেকেই দুর্গটি পুলিশরা ব্যবহার করতেন। ১৯৪৭ সালে এর আগে এখানে থাকতেন গাড়োয়ালী পুলিশরা। আর ১৯৪৭ এর পরে সেখানে ছিল আইবি অফিস ও পুলিশ কর্মচারীদের বাসগৃহ। যদিও এর বেশ আগেই লালবাগকে সংরক্ষিত কীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
পরে ১৯১০ সালে লালবাগ দুর্গের প্রাচীর সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয়। গত শতকের আশির দশকে লালবাগ দুর্গের যথাসম্ভব সংস্কার করে এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনা হয় এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।