'কেউ মামলা করেনি' - অজুহাতে পুলিশ কি দায়িত্ব এড়াতে পারে?

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঢাকার মিরপুর এলাকায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি থেকে স্থানীয় থানার দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। তারপরও পুলিশ কেন ঘটনাস্থলে গেল না এবং হামলা ঠেকাতে পারলো না, সে প্রশ্ন সামনে আসছে।

অন্যদিকে, স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, সালমান মুক্তাদির 'ফেসবুক লাইভে এসে অভিযোগ করলেও থানায় মামলা কেন দায়ের করেননি?'

সে পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনেকেই পাল্টা প্রশ্ন রাখেন যে, থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ না দিলে বা মামলা না করলে পুলিশ কি অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না?

যদিও পরবর্তীতে ভুক্তভোগী মি. মুক্তাদিরের বক্তব্য থেকে জানা যায়, হামলার ঘটনার পর শনিবার রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। পরে মামলা নিতে দেরি হওয়ায় একপর্যায়ে 'ক্লান্ত হয়ে' বাসায় ফিরে যান।

পরদিন সকালে ক্ষতিগ্রস্ত স্টুডিও'র ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এরপর রোববার দুপুরে মামলা নেয় পুলিশ।

মামলা নিতে গড়িমসি করার এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। বাংলাদেশের এর আগেও বিভিন্ন সময় এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসতে দেখা গেছে।

মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও অনেক সময় 'ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বা কেউ মামলা করেনি' -এমন অজুহাত দেখিয়ে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায়।

এমন ঘটনা বেশি ঘটে যদি সমাজের প্রভাবশালী কেউ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সেটি নিয়ে 'কেউ মামলা করেননি' -এ রকম অজুহাতে পুলিশ কি বসে থাকতে পারে?

আইনে কী আছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার বিপক্ষে সংঘটিত যে কোনো অপরাধকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে আলাদা আইন রয়েছে, যা 'ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮' বা সিআরপিসি নামে পরিচিত।

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, "এ আইনে পুলিশের দায়িত্বের বিষয়ে বলা হয়েছে যে, তারা যদি ধর্তব্য বা আমলযোগ্য অপরাধের কোনো তথ্য পায়, তাহলে তাদের দায়িত্ব হবে দ্রুত সেটির বিষয়ে রেসপন্স করা।"

এখানে ধর্তব্য বা আমলযোগ্য অপরাধ বলতে সে সব অপরাধকে বোঝানো হয়, যেসব অপরাধের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে।

সেজন্য আদালতের কাছ থেকে আলাদা করে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, অর্থ্যাৎ অপরাধীকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার কতে পারে পুলিশ।

"খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর - এসব ধরনের অপরাধগুলো ধর্তব্য বা আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়," বলেন মি. মোরসেদ।

আইনে বলা হয়েছে যে, আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত সেই ঘটনাস্থলে চলে যাবে এবং অপরাধ কর্মকাণ্ড থামিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার ব্যবস্থা করবে।

"এক্ষেত্রে তারা অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারবে। সেইসঙ্গে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সেখানে যা যা ঘটেছে, সেগুলো লিপিবদ্ধ করাসহ তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন," বলেন আইনজীবী মি. মোরসেদ।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, অপরাধের ঘটনার বিষয়টি লিপিবদ্ধ করার পর সেটি তথ্য প্রদানকারীকে পড়ে শোনাতে হবে। এরপর তথ্য প্রদানকারীর স্বাক্ষর নিয়ে এজাহার বা মামলার নথি সংরক্ষণ করতে হবে।

"কিন্তু কোনো কারণে যদি তথ্য প্রদানকারী বা ঘটনায় ভুক্তভোগী তথ্য দিতে না চান বা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ না করেন, সেক্ষেত্রে পুলিশ নিজেই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে অপরাধ ও অপরাধীদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন," বলেন মি. মোরসেদ।

কোনো অজুহাতে এর ব্যত্যয় ঘটালে সেটি আইনের লঙ্ঘন হবে বলে জানান আইন বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেছেন, "(আইনের) ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ নেই। অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে পুলিশ যদি তথ্য পায়, তাহলে অবশ্যই সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা হলে ভালো। না হলেও বসে থাকার সুযোগ নেই। পুলিশকে তার মত করে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।"

আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্মকর্তা আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণ কী?

আইনে পরিষ্কারভাবে নির্দেশনা থাকার পরও সাম্প্রতিক সময়ে আমলযোগ্য অনেক অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকার অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে।

বিশেষ করে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গত দুই বছরে মব সৃষ্টি করে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় যেসব হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

কারণ হিসেবে সাবেক আইজিপি মি. হুদা বলছিলেন, "মূলতঃ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ব্যবহার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কারণে নৈতিক দিক থেকে পুরো বাহিনী দুর্বল অবস্থানে চলে গেছে।

এখনও সেটা পুরোপুরি রিকভার (পুনরুদ্ধার) করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুলিশ এখনও ভয়ে আছে এবং মবের মত শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারছে না।"

এর বাইরে, ভালো পদ-পদবি বা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার আশায় ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগও রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, "বিশেষ করে, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় স্থানীয় থানার যে ভূমিকা, সেটি নানান প্রশ্ন সামনে আনছে। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের আঁতাতের বিষয়টি সামনে আসছে, আবার ক্ষেত্রবিশেষে এটাও মনে হচ্ছে যে, ভয় বা লাভ কিংবা দায়িত্ব এড়ানোর জন্যও তারা (পুলিশ) হয়তো নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।"

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় স্থানীয় থানার ভূমিকা নিয়ে পুলিশের ভেতর থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে শনিবার সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন যে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

কেন পুলিশ সেই দায়িত্ব পালন করলো না, সেটি তদন্ত করেছে বাহিনীটি।

রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এবং এরপর ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়।

কিন্তু শুধু প্রত্যাহার করে নিলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা।

তিনি বলছেন, সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের সদিচ্ছাও জরুরি।

"সরকারকে আগে সদিচ্ছা দেখাতে হবে। তারা যদি পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয় এবং দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে, নেতারা যদি পুলিশের ওপর ছড়ি ঘুরাতে না পারে এবং অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই ট্রিট করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে এ সমস্যা থাকবে না," বলেন মি. হুদা।

সরকার কী বলছে?

সরকার অবশ্য বলছে যে, তারা পুলিশকে স্বাধীনভাবেই কাজ করতে দিচ্ছে।

এক্ষেত্রে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

"আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে...এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, বরং দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে," রোববার বলেন মি. আহমদ।

সেইসঙ্গে, কোন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গাফিলতি প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মি. আহমদ।

সেই ধারাবাহিকতায় মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা ও লুটপাটের ঘটনার পর শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

এদিকে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও দাবি করছেন যে, বাহিনীর সদস্যরা আইন মেনেই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, "অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট। কোনো দল বা মত দেখা হবে না, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে।

কোনো ধরনের দখল, বেআইনি বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেউ করতে পারবে না। যারা এসব করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।"