নাটোরে ছাত্রদল নেতা হত্যা, ছেলে রিমান্ডে যাওয়ার পর কী বলছেন বিএনপি'র এমপি

ছবির উৎস, https://www.facebook.com/shakil.islam.58910
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নাটোরে ছাত্রদলের একজন নেতাকে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে পড়েছেন সরকার দলীয় এমপি আব্দুল আজিজ। একইসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসছে স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নিয়ন্ত্রণহীন মাদক বাণিজ্যসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ।
এ ঘটনায় মি. আজিজের ছেলেকে আটকের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক। পাশাপাশি গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আজ বুধবার প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাতে এক প্রবাসীর একটি শপিংমলে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। ওই প্রবাসী এমপির ছেলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
মঙ্গলবার রাতে এর আগে নিহত শাকিল ইসলামের জানাজায় এমপি আব্দুল আজিজের বক্তব্যকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আব্দুল আজিজ অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, যিনি খুন হয়েছেন, তিনি তারই সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলেন। তার দাবি, দলের ভেতর ও বাইরের একটি চক্র তাকে বিপদে ফেলতে ঘটনা ঘটিয়ে তার ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা দাবি করেছেন, জেলা বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাবশালী ও জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আব্দুল আজিজ।
হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি এ ঘটনার মূল হোতা বলে তারা তথ্য পেয়েছেন।
"তদন্ত করছে পুলিশ। যেই দোষী হবে তাকেই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে," বলছিলেন তিনি।
নিহত শাকিল ইসলামের ভগ্নীপতি মাসুদ রানা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "স্থানীয় এক প্রবাসী পরিচালিত এক গ্রুপের সাথে শাকিলের শত্রুতা তৈরি হয়েছিল। এটি আমরা জানতাম। আশা করি পুলিশ সব বের করতে পারবে"।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Nazmul Hasan
হত্যার ঘটনায় কী জানা যাচ্ছে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, গত ১৪ই অক্টোবর হামলায় আহত হয়ে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে মারা যাওয়া শাকিল ইসলাম ছিলেন গুরুদাসপুর পৌর শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ই অক্টোবর রাতে গুরুদাসপুরের চাচকৈড় এলাকায় হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিরা মোটর সাইকেলে করে এসে তাকে উপর্যুপরি কুপিয়ে আহত করে।
এরপর প্রথমে স্থানীয়রা তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যান। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রথমে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল, যেটি পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা বিএসএমএমইউ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছিল) নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি মারা যান।
পরে ১৯শে অক্টোবর শাকিল ইসলামের বাবা রবিউল করিম অজ্ঞাত ৮-১০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন।
এ ঘটনার পর ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসে ওই এলাকার অর্থাৎ নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের দুই ছেলের নেতৃত্বাধীন পরস্পরবিরোধী দুই গ্রুপ।
স্থানীয়দের দাবি, হামলার শিকার হয়ে মারা যাওয়া শাকিল ইসলাম এমপি মি. আজিজের ছোটো ছেলে মাহমুদুজ্জামানের গ্রুপে সক্রিয় ছিলেন। তাদের অভিযোগ, দুই ছেলের দুই গ্রুপের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বিবাদের জের ধরেই খুন হয়েছেন মি. ইসলাম।
মঙ্গলবার রাতে নিহত শাকিলের জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে এ নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে পড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন আব্দুল আজিজ।
এসময় মি. আজিজ উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, "আমার ছেলে যদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে ছেলের পাশে নয়, শাকিলের পাশেই থাকবো"।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ঘটনাটির রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি-না কিংবা মূল কারণ জানার জন্য তদন্ত চলছে"।
জেলা পুলিশের আরেকটি সূত্র অবশ্য দাবি করেছে , "প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী মাদক বাণিজ্য নিয়ে বিবাদের জের ধরেই খুন হয়েছেন শাকিল ইসলাম"।

ছবির উৎস, https://www.facebook.com/shakil.islam.58910
কেন এই খুন
পুলিশ এবং নাটোর জেলা বিএনপি ও গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিহত শাকিল ইসলাম ওই এলাকার অর্থাৎ নাটোর-৪ আসনের এমপির পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে গুরুদাসপুরের উপজেলার নিয়ন্ত্রণ কার্যত এই পরিবারের হাতে চলে যায় বলে অভিযোগ আছে। আর এই নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব নিয়ে পারস্পারিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েন এমপির দুই ছেলে- নুরুজ্জামান মিন্টু ও মাহমুদুজ্জামান।
পুলিশ ও বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, এমপির পরিবারের মধ্যকার কোনো বিরোধের শিকার হয়ে থাকতে পারেন শাকিল। এলাকার ক্রমবর্ধমান মাদক বাণিজ্য নিয়েই এই বিরোধ তৈরি হয়েছে এমন অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার শরীফুল হক বলেছেন, "যিনি মারা গেছেন তিনি রাজনৈতিক নেতা। তার পদও ছিল। কিন্তু হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক কারণেই হয়েছে কি-না তা এখনি বলা যাবে না"।
অন্যদিকে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান খান চৌধুরী (বাবুল চৌধুরী নামে পরিচিত) বলছেন, বিষয়টি এমপি পরিবারের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় হতে পারে বলে তারা শুনেছেন।
"যতখানি জেনেছি এই ছেলেটা এমপি আজিজ সাহেবের বলয়েই ছিলেন। তার ও তার সন্তানের সঙ্গে ছেলেটির অনেক ছবি দেখেছি। এখন আবার পুলিশ প্রশাসন এমপি সাহেবের ছেলেকে আটক করেছে। তাই মনে হচ্ছে ঘটনাটি তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় হতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. চৌধুরী।
গুরুদাসপুরের একাধিক বিএনপি নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত মার্চ- এপ্রিলে এমপি সাহেবের এক ছেলের সঙ্গে মাদকের একটি চালান নিয়ে শাকিলের বিরোধ তৈরি হয়েছিল এমন অভিযোগ আলোচনায় এসেছিল।

ছবির উৎস, Nazmul Hasan
এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে জোরদার আলোচনার মধ্যেই ২০শে এপ্রিল শাকিল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছিলেন যে তিনি তার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছেন।
"আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে, যারা আমাকে মারতে পারবে তাদের কে নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডাইরি করেছি, এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে ওই ডাইরি অনুযায়ী মামলা করে দিবেন। আর আমাকে হামলা করার পরে যদি আমি বেঁচে যাই। তাহলে তো ভাই বুঝতেই পারতিছেন, কি হবে এই শহরে, আমি কামলা দিয়ে কাজ করাই না, সাবধান ভাই," লিখেছিলেন তিনি।
যদিও স্থানীয় থানা জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো জিডি তাদের থানায় হয়নি।
তবে গত কয়েকমাসে স্থানীয় কয়েকটি ঘটনায় এমপির দুই ছেলে ও তাদের মধ্যকার বিরোধ আলোচনায় এসেছে বলে বিএনপির স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন।
তবে শাকিল ইসলামের ভগ্নীপতি মাসুদ রানা বলেছেন, "এমপির ছেলের বিষয়টি আমরা জানি না। এখানে স্থানীয় এক প্রবাসীর একটি গ্রুপ সক্রিয় আছে। এ গ্রুপের অনেকে জেল খেটেছে। তাদের সাথে শাকিলের শত্রুতা ছিল"।
শাকিল হত্যাকাণ্ডের সাথে ছেলের জড়িত থাকা এবং মাদক বাণিজ্যে তার ছেলেদের জড়িয়ে পড়াসহ অন্য সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল আজিজ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দলের ভেতরে ও বাইরের একটি চক্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব অপপ্রচার করছে।
"শাকিল ২৪ ঘণ্টা আমার সাথেই থাকতো। তার পরিবার আমাদের ঘনিষ্ঠ। হামলার পর তার চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করেছি। অনেক বার কথা হয়েছে। কারা হামলা করেছে সেটা সে বলতে পারেনি। এখন মৃত্যুর পর ছেলেকে জড়িয়ে এমপিকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে," বলছিলেন মি. আজিজ।
কারা এটি করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমি ২০ বছর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ আমলে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। ২০১৮ সালে দলের মনোনয়ন পেয়েছি। এবার এমপি হয়েছি। আমার অনেক প্রতিপক্ষ। তারাই আমাকে ঘায়েল করতে চাইছে"।
তারা তার দলের ভেতরেরই লোকজন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. আজিজ বলেন, "একটি কর্নারের চাপে প্রশাসন আমার ছেলেকে আটক করেছে। ছেলে দোষী হলে আইনের কাঠগড়ায় যাবে। যে বিচার হবে তা মাথা পেতে নিব। কিন্তু ন্যায্য বিচার যেন হয়"।









