বিতর্কিত বক্তব্যের অভিযোগে প্রত্যাহার খুলনার পুলিশ কর্মকর্তা, ঠিক কী ঘটেছে?

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

ছবির ক্যাপশান, বিতর্কিত বক্তব্যের জের ধরে সমালোচনার মুখে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারকে সদর দপ্তরে সরিয়ে আনা হয়েছে
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"দারোগার কাছে কওয়ার পর যদি ইনফরমেশন পাস হয় ইন্সপেক্টর টু আপওয়ার্ড, আমি নিজে মুসলমান হিসেবে কথা দিচ্ছি, ওই ইন্সপেক্টররে এনে ঝুলায়া দিমু আপনেরা পিটায়া মারবেন" খুলনার এক মতবিনিময় সভার একটি ভিডিওতে এমন কথা বলতে দেখা যায় খুলনার একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে তিনদিনের মাথায় তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে যে, খুলনার লবণচরা থানার এলাকায় গত ১৭ই জুন স্থানীয়দের সঙ্গে আয়োজিত এক মত বিনিময় সভায় ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন খুলনা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান।

এই ঘটনার তিনদিন পর, ২০শে জুন, শনিবার মি. খানকে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্বভার অর্পণ করে রোববারই ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ মহাপরিদর্শক মোঃ আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক অফিসিয়াল আদেশে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে, ওই বক্তব্যের কারণেই প্রত্যাহার করা হয়েছে কিনা সেটি উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে, নির্দেশ অনুযায়ী, ঢাকায় সদর দপ্তরে যোগদানের জন্য, এরই মধ্যে রোববার সকালে রওনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেন, ওই ঘটনার সময় খুলনার সাধারণ মানুষের মাঝে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ দেখতে পান তিনি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনের অজান্তেই এমন কথা উচ্চারণ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

"পুলিশের প্রতি সেসময় তাদের কিছুটা ক্ষোভ আমি লক্ষ্য করি সাধারণ জনগণের মাঝে। সেই পরিস্থিতিকে ট্যাকেল করার জন্য এবং পুলিশের ভাবমূর্তিকে জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য হয়তোবা মনের অজান্তে স্লিপ অব টাং এই শব্দটা আমার কাছ থেকে উচ্চারণ হয়েছে" বলেন মি. খান।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বক্তব্যের একটি ভিডিও প্রকাশিত হলে কেবল সাধারণ মানুষই নয় বরং পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

এমন বক্তব্যে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার চরম অবমাননা করেছেন বলে ক্ষোভ জানিয়েছেন কেউ কেউ।

ওই পুলিশ কর্মকর্তার এমন মন্তব্যে পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশন।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে, পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, পেশাদারিত্ব ও ইতিবাচক কর্মপরিবেশ বজার রাখার আহ্বান জানিয়েছে এই সংগঠনটি।

পুলিশের সাবেক সহকারী মহাপরিদর্শক শফিউল ইসলাম মনে করেন, দায়িত্বরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা এমন মন্তব্য করতে পারেন না, এটি আইনি প্রক্রিয়ার চরম অবমাননা।

"বাহিনীর কোনো সদস্য যদি অপরাধ বা তথ্য ফাঁস করেন, তবে দেশের প্রচলিত আইন এবং বিভাগীয় শৃঙ্খলা বিধিমালা অনুযায়ী তার চাকরিচ্যুতি বা জেল হওয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু একজন কর্মকর্তা কীভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে "ঝুলায়ে পিটানোর" মধ্যযুগীয় হুমকি দেন?" বলেন পুলিশের সাবেক এই কর্মকর্তা।

"আল্লাহ ছাড়া যদি কেউ জানে, আমি আপনাদেরকে ওয়াদা দিতেছি, আল্লাহ ছাড়া যদি কেউ জানে, এই গাছের(পাশের গাছের দিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করে দেখান) তলে ঝুলায়া পিটামু, আমি দিয়া যামু আপনারে" মতবিনিময় সভায় বলেন কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

ছবির ক্যাপশান, খুলনার নাগরিকদের মধ্যে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ দেখতে পান বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা

ঠিক কী ঘটেছে এবং যা বলছেন রাশিদুল ইসলাম

খুলনার লবণচরা থানার এলাকায় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়েছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান।

এই সভায় স্থানীয় নাগরিকরা অভিযোগ করেন, অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশকে গোপন তথ্য দিলে পুলিশের ভেতরেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তারা সেটি সন্ত্রাসীদের কাছে ফাঁস করে দেয়।

স্থানীয়দের এমন ক্ষোভ ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে মি. খান তাদের আশ্বস্ত করতে বলেন, "থানার ওসি টু আপওয়ার্ডের কাছে। দারোগার কাছে কওয়ার দরকার নাই।"

৪২ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায় মি. খান বলছেন, "দারোগার কাছে কওয়ার পর যদি ইনফরমেশন পাস হয় ইন্সপেক্টর টু আপওয়ার্ড, আমি নিজে মুসলমান হিসেবে কথা দিচ্ছি, ওই ইন্সপেক্টররে এনে ঝুলায়া দিমু আপনেরা পিটায়া মারবেন।"

এ সময় স্থানীয়রা কাউকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, স্যার ওনার কথার সত্যতা আছে।

সেসময় আবার এই পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, "আমি অসত্যতো বলি নাই। আপনে সাব-ইন্সপেক্টর টু আপওয়ার্ড গোপন তথ্য দিবেন।"

ডানদিকে থাকা একটি গাছকে লক্ষ্য করে আঙুল তুলে তিনি তাদের কাছে ওয়াদাও করেন।

"আল্লাহ ছাড়া যদি কেউ জানে, আমি আপনাদেরকে ওয়াদা দিতেছি, আল্লাহ ছাড়া যদি কেউ জানে, এই গাছের (পাশের গাছের দিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করে দেখান) তলে ঝুলায়া পিটামু, আমি দিয়া যামু আপনারে" বলেন কেএমপির এই অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার।

মি. খান বিবিসি বাংলাকে জানান, পুলিশ নিয়মিতই রুটিন ওয়ার্কের অংশ হিসেবে এমন উঠান বৈঠক করে থাকে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত খুলনার নাগরিকদের কেউ কেউ তাকে বলেন, পুলিশকে কোনো তথ্য দিলে সেগুলো নিরাপদ থাকে না। সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন চালায়।

এ সময় নাগরিকরা তথ্য দেওয়ার পর তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বলে জানান তিনি।

মি. খান তাদের বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, "অনেক দিন ধরে আমরা যখন তথ্য দেই তখন আমরা এই সমস্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হই। আর আপনি আমাদের কাছ থেকে তথ্য চান, আমাদের নিরাপত্তা কে দিবে?"

সেসময় খুলনার নাগরিকদের মধ্যে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ দেখতে পান বলে দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মনের অজান্তেই এমন শব্দ উচ্চারণ হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, "পুলিশের প্রতি সেসময় তাদের কিছুটা ক্ষোভ আমি লক্ষ্য করি সাধারণ জনগণের মাঝে। সেই পরিস্থিতিকে ট্যাকেল করার জন্য এবং পুলিশের ভাবমূর্তিকে জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য হয়তোবা মনের অজান্তে স্লিপ অব টাং এই শব্দটা আমার কাছ থেকে উচ্চারণ হয়েছে।"

তবে, বক্তব্যটি ভাইরাল হওয়ার পর এ ধরনের শব্দ উচ্চারণ করেছেন বলে উপলব্ধি করেছেন উল্লেখ করে মি. খান বলেন, "যখন এটা ভাইরাল হয়েছে তখন আমি বুঝতে পেরেছি আমি মনে হয় এই শব্দটা বলেছি। এখানে আমার কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, ছোট করা, অসম্মান করা কিংবা সহকর্মীর পেশাগত-ব্যক্তিগত খারাপ করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না।"

অপরাধীদের বিষয়ে সাধারণ জনগণ তথ্য দিলে গোপনীয়তা কেন ভঙ্গ হবে এমন প্রশ্নে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, "এটা ইনডিভিজ্যয়াল সমস্যা, এটা কোনো একটা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা না। এটা একটা ব্যক্তির সমস্যা, সুতরাং ব্যক্তির সমস্যা কোনো প্রতিষ্ঠান নেবে বলে আমি মনে করি না।"

পুলিশ

ছবির উৎস, Getty Images

"বক্তব্যে সর্বদা পেশাদারিত্ব, সংযম এবং প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয়"

পুলিশ এসোসিয়েশন শনিবার এক বিবৃতিতে, ভবিষ্যতে সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার সময় আরো সতর্কতা, সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেছে।

"যাতে পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা, ঐক্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদার ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় হয়" বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই বিবৃতিতে।

একইসঙ্গে, বিগত সময়ের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই বাহিনী পেশাদারিত্ব, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জনসেবা দেওয়ার মাধ্যমে জনগণের আস্থা বৃদ্ধির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সংগঠনটি মনে করছে, "পুলিশ বাহিনীর সকল সদস্য ও কর্মকর্তার বক্তব্যে সর্বদা পেশাদারিত্ব, সংযম এবং প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয়। জনসম্মুখে প্রদত্ত যে কোনো বক্তব্য এমন হওয়া উচিত, যা বাহিনীর মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও জনগণের আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করে।"

খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে 'নানামুখী প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছে' বলেও বিবৃতিতে জানিয়েছে এই সংগঠনটি।

এতে বলা হয়েছে, "অনেক সদস্য বিষয়টিকে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করে তাদের উদ্বেগ ও মতামত প্রকাশ করেছেন।"

কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার বিষয় থাকলে তা প্রচলিত আইন, বিভাগীয় বিধি-বিধান ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলে বিশ্বাস করে পুলিশ এসোসিয়েশন।

সংগঠনটি বলছে, "এ ধরনের বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই সর্বোত্তম ও গ্রহণযোগ্য পন্থা।"

এছাড়া, এই বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, পেশাদারিত্ব ও ইতিবাচক কর্মপরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

পুলিশ সদর দপ্তরের সাবেক সহকারী মহাপরিদর্শক শফিউল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মি. খানের এমন বক্তব্যের তিনটি অপেশাদারি দিক তুলে ধরে সমালোচনা করেছেন।

খুলনার পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যে আইনি প্রক্রিয়ার অবমাননা ছাড়াও ধর্মীয় আবেগের সস্তা ব্যবহার হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

একইসঙ্গে, এই ধরনের রূঢ় এবং আক্রমণাত্মক আচরণে অধস্তনদের মধ্যে ভীতি ও অনাস্থা তৈরি এবং বাহিনীর ভেতরের চেইন অব কমান্ড এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয় বলেও মনে করেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মি. ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "গভর্নমেন্টের পারমিশন ছাড়া কোনো বক্তব্যই আইনত তিনি দিতে পারেন না।"

সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, এ কারণেই মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট এবং কড়া আইনি গাইডলাইন বা পুলিশ রেগুলেশনস প্রয়োজন।

"মেট্রোপলিটন পুলিশের রেগুলেশনস যদি থাকত, তবে কোনো কর্মকর্তার পক্ষে এভাবে প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে আইনের পরিপন্থী ও অপেশাদার বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হতো না" বলেন মি. ইসলাম।

আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তা এমন বক্তব্য দিতে পারেন না বলেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।