'পেশায় যৌনকর্মী মানেই কি ওরা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করতে পারে?'

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
- Author, দিলনওয়াজ পাশা
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনের কিছু অংশ আপনাকে মানসিকভাবে বিচলিত করতে পারে।
"আমি পেশায় যৌনকর্মী, কিন্তু তার মানে কি ওরা আমাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করতে পারে?"- ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলেন দিল্লির এক নারী যাকে দিন কয়েক আগে স্লিপার বাসে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটা ঘটেছিল ১১ ও ১২ই মে রাত ১২টা থেকে ২.৩০-র মধ্যবর্তী সময়ে। এই ঘটনায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, গ্রেফতার ব্যক্তিরা উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা। এদের মধ্যে একজন পেশায় বাসের চালক এবং অন্যজন ওই বাসেরই ক্লিনার। বিহার ও দিল্লির মাঝে চলে ওই বাস।
সংবাদমাধ্যমে যেভাবে কভার করা হয়েছে তাতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বাড়ি বদলাতে হয়েছে ওই নারীকে।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
'সবাই আমার পেশা জেনে গেছে'
বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন ওই নারী।
তিনি বলেছিলেন, "মিডিয়া ক্যামেরা নিয়ে আমার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। পুরো বস্তি জেনে গেছে আমার সঙ্গে কী ঘটেছে। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে এখানে থাকি। কিছুদিন আগে বাধ্য হয়ে আমাকে যৌনকর্ম শুরু করতে হয়েছে। আমার বাড়ির লোকেরা এই বিষয়ে জানত না।"
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কিছুটা আক্ষেপের সুরে তিনি বলেছেন, "আমার সঙ্গে কী ঘটেছিল সে নিয়ে এখন আর কেউ কথা বলছে না। বরং সংসার চালানোর জন্য আমি কী কাজ করছি তার উপর ভিত্তি করে আমার চরিত্র হনন করে চলেছে।"
ওই নারী জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে সংসার চালানোর জন্য 'যৌনকর্মী' হিসাবে কাজ করলেও ঘটনার দিন রাতে পেশাগত কারণে বাড়ি থেকে বের হননি তিনি। অন্য এক কাজে বাইরে যেতে হয়েছিল তাকে।
তার কথায়, "আমার ভাইয়ের বাসা বদলের কাজ শেষ করে আমি বাড়ি ফিরছিলাম। বাসস্ট্যান্ডে ওই বাসটাই এসে দাঁড়ায়, আর বাসের কন্ডাক্টর আমাকে ডাকে। আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমি কাজ করতে চাইনি। তারপরও তারা আমাকে টেনে হিঁচড়ে বাসের ভেতরে নিয়ে যায়।"
"তারা আমাকে যৌনতার জন্য টাকা দিতে চাইলে আমি না করে দিই। বাসে সব মিলিয়ে পাঁচজন ছিল। একজন ঘুমাচ্ছিল। ওরা আমাকে গোটা রাত রাখতে চেয়েছিল। বারবার মানা করলেও দু'জন আমাকে ধর্ষণ করে।"
দিল্লি পুলিশ এই ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-এর আওতায় ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং 'কমন ইন্টেনশন' (দুই বা তার বেশি ব্যক্তি যখন কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো ন্যায়বিরুদ্ধ কাজ করেন)-এর মামলা দায়ের করেছে।
ডিসিপি (আউটার দিল্লি) বিক্রম সিং এক বিবৃতিতে এই ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন, "পুলিশের কাছে এই বিষয়ে যে তথ্য ছিল, সেখানে একজন কল করে জানিয়েছিলেন যে দুই ব্যক্তি তার সঙ্গে অন্যায় কাজ করেছে। নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে নেয় এবং অভিযোগকারীকে সাহায্য করে।"
"দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।"
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর

ছবির উৎস, @dcpouter
হেল্পলাইনে পুলিশকে কল
অভিযোগকারী ওই নারী জানিয়েছেন বাস থেকে বেরিয়ে আসার পরই পুলিশের যে হেল্পলাইন রয়েছে সেখানে ফোন করে ঘটনাটা জানান তিনি। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
ওই নারী বলেন, "পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরই আমার কথা শোনে। আমাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং আমার অভিযোগের ভিত্তিতে তৎক্ষণাৎ এক মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। তারা আমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল। আমার চিকিৎসা করানো হয়েছিল এবং খাবার খাব কি না-তাও জানতে চাওয়া হয়।"
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।
তার পরিবারের পরিস্থিতির কথা জানিয়ে ওই নারী বলেন, "গত কয়েক বছর ধরে আমার স্বামী গুরুতর অসুস্থ। আমার তিনটি ছোট মেয়ে রয়েছে। বাড়িতে রোজগার করার মতো কেউ নেই। আমি অন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু এমন কোনো কাজ পাইনি যা দিয়ে সংসার চালানোর মতো যথেষ্ট রোজগার করতে পারি। আমি কিছুদিন আগেই এই কাজ শুরু করেছি।"
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, "তিন মেয়ের মা বাড়ির বাইরে গিয়ে যৌনকর্ম করে, তাহলে বুঝতে হবে সে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু তাই বলে কেউ তার বাধ্যবাধকতার সুযোগ নিতে পারে না।"
ওই নারী জানিয়েছেন অভিযুক্তদের তিনি আগে থেকে চিনতেন না।
'রাস্তায় যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকে তারও সুরক্ষার অধিকার ততটাই'
ওই নারীর স্বামী বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, "বাড়ির কেউ জানত না আমার স্ত্রী সংসার চালানোর জন্য কী করছে। সে আমাকে এই নিয়ে কিছু বলেনি। জানায়নি সংসার চালানোর জন্য সে এই কাজ করছে।"
ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা তাদের বাড়িতে এলে ওই নারীর পেশার কথাও জানাজানি হয়।
তার স্বামী বলেছেন, "অনেক সাংবাদিক আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। বড় বড় ক্যামেরা দিয়ে বাইরে ভিডিও করছিলেন তারা। আমার ও আমার স্ত্রীর নাম জানতে চাইছিলেন।"
"এখন সবাই আমাদের সন্দেহের চোখে দেখছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা কি এখানে থাকতে পারতাম?" বাড়ি বদলাতে 'বাধ্য' হয়েছেন ওই নারী ও তার পরিবার।
তবে ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তিনি যে কোনোভাবেই লড়াই ছাড়বেন না তা ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন ওই নারী।
"এটা শুধু আমার নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটা আমার মতো হাজার হাজার মেয়ের সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। রাস্তায় যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকে তারও সুরক্ষার অধিকার ঠিক ততটাই যতটা অন্যান্য মেয়েদের আছে," বলেছেন নির্যাতিতা।
এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নিজের তিন মেয়ের প্রসঙ্গ টানেন তিনি।
তার কথায়, "আমার তিনটি মেয়ে আছে। আমি তাদের ভালো শিক্ষা দিতে চাই। আমাকে যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে আমি চাই না আমার মেয়েরাও তার সম্মুখীন হোক।"
"এই ঘটনায় যতক্ষণ না (দোষীদের) কঠিন শাস্তি দেওয়া হয় ততক্ষণ আমি পিছু হটব না। তাতে আমাকে থানা এবং আদালতের যতবার চক্কর কাটতে হোক না কেন- আমি রাজি।"

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ
ভারতে আদালত বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছে অন্যান্য যে কোনো নাগরিকের মতোই পেশায় যৌনকর্মীদের সাংবিধানিক মর্যাদা, সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার রয়েছে।
২০২২ সালে ভারতের শীর্ষ আদালত একটা যুগান্তকারী আদেশে জানিয়েছিল যে যৌনকর্মও একটা 'পেশা' এবং শুধু এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে পুলিশ বা সমাজ কিন্তু কোনো নারীর অধিকারকে অস্বীকার করতে পারে না।
আদালত আরো জানিয়েছিল একজন যৌনকর্মীর অভিযোগ সমান সংবেদনশীলতার সাথে দায়ের করা উচিত। শুধু তাই নয়, তার পরিচয়তা সম্পর্কে গোপনীয়তা রক্ষা করাও উচিত।
আদালত এই বিষয়টাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে "পেশা নির্বিশেষে যৌন সহিংসতা এবং শোষণ থেকে সুরক্ষার অধিকার প্রত্যেক নারীর আছে"।
ভারতীয় আইন অনুযায়ী, সম্মতি ছাড়া যে কোনো যৌন মিলনকে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং একজন নারীর পেশায় যৌনকর্মী হওয়াটা তার সম্মতির ভিত্তি হতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্ট এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের হাই কোর্টও তাদের রায়ে একাধিকবার জানিয়েছে যে ধর্ষণের মামলায় কোনো নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা তার পেশাকে এই ঘটনায় ভিত্তি হিসেবে দেখার মাধ্যমে কিন্তু ঘটনার অবমূল্যায়ন করা যাবে না।







