দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যায় অভিযুক্ত হিশাম চ্যাটজিপিটিকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল লিমন নিখোঁজের পোস্ট করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

ছবির উৎস, Hillsborough County Sheriff's Office

ছবির ক্যাপশান, নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল লিমন নিখোঁজের পোস্ট করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

''আমার ভাইয়া খুবই হার্ডওয়ার্কিং এবং খুবই জলি এবং সে সবসময় হেসে কথা বলতো। রিসার্চ বা কাজ নিয়ে সে খুবই সতর্ক ছিল। বৃষ্টি খুব ভালো রান্না করতে পারে এবং খুব ভালো গান গায়," যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিহত নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমন সম্পর্কে এভাবেই বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জামিল আহমেদ লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নিহত জামিল আহমেদের ২৬ বছর বয়সী রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহ'র বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

শুক্রবার হিশাম আবুঘরবেহকে হিলসবরোতে তার পারিবারিক বাসস্থান থেকে আটক করা হয়।

যদিও তিনি ২০২৩ সাল থেকে পরিবারের সাথে সেই বাসায় থাকতেন না।

শুক্রবার সকালে হঠাৎ তাকে বাসায় দেখে চমকে ওঠেন বলে যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসি'র মার্কিন সহযোগী সিবিএস নিউজকে জানান হিশাম আবুঘরবেহ'র ছোট ভাই আহমেদ আবুঘরবেহ।

পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে হিশাম আবুঘরবেহর ছোট বোন হঠাৎ দেখেন যে তার ভাই লিভিং রুমে বসে টাওয়েল পড়ে ভিডিও গেমস খেলছেন।

বোনকে দেখে তিনি এগিয়ে গেলে তার বোন তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন।

এরপর হিশামের ছোট ভাই আহমেদ আবুঘরবেহ পুলিশকে ফোন করে তার ভাইয়ের উপস্থিতির খবর দেন।

এর কিছুক্ষণ পর সোয়াট টিম এসে সেখান থেকে হিশাম আবুঘরবেহকে আটক করে।

সোয়াট টিমের হিশাম আবুঘরবেহকে আটকের মুহূর্ত

ছবির উৎস, Hillsborough County Sheriff's Office

ছবির ক্যাপশান, সোয়াট টিমের হিশাম আবুঘরবেহকে আটকের মুহূর্ত
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডায় পিএইচডি করতে যাওয়া দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ১৬ই এপ্রিল নিখোঁজ হন। জামিলের রুমমেট ছিলেন হিশাম।

হিশাম আবুঘরবেহকে আটকের পর হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কলিন ব্রিজের কাছে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এরপর জামিল লিমনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। যদিও বৃষ্টির মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত গত শনিবার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন যে, "পুলিশ এখনো মরদেহ না পেলেও সন্দেহভাজনের অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের পরিমাণ দেখে তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছে"।

জামিল আহমেদের ভাই জুবায়ের আহমেদ বলছিলেন, হিশাম আবুঘরবেহ'র ব্যবহার সম্পর্কে নিজের পরিবারকে জানিয়েছিলেন নিহত জামিল লিমন।

''ভাইয়া দুই মাস হলো ওই অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছেন। হিশাম এবং আরেকজন ইন্ডিয়ান রশিদ আগে থেকেই ওখানে অ্যাপ্যার্টমেন্টে ছিল। ভাইয়াকে বিষয়টা জানানো হয়নি যে তার ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে।''

''ভাইয়া শুরু থেকে আমাদের এটা বলত যে তার ওই আমেরিকান রুমমেটটা খুবই আনপ্লিজেন্ট, আনসোশ্যাল এবং সারাক্ষণ রুমের মধ্যেই থাকে। আমি যেটা জানতে পারছি ভাইয়ার ক্লোজ ফ্রেন্ডের মাধ্যমে—ভাইয়া এবং রশিদ দুজনেই হচ্ছে একসাথে হয়ে হিশামের বিরুদ্ধে কমপ্লেইন (অভিযোগ) করেছিল। সেটা ১৫ দিনের মতো আগে, মানে ঘটনা ঘটার ১৫ দিন আগে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জুবায়ের আহমেদ।

হিশাম আবুঘরবেহ'র বিরুদ্ধে তার পরিবারের সদস্যরা এর আগে দুইবার প্রোটেক্টিভ অর্ডার জারির আবেদন করেছিল।

সাধারণত কোনো ব্যক্তি যেন তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সহিংস আচরণ না করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রোটেক্টিভ অর্ডার জারি করে আদালত।

২০২৫ সালে হিশাম আবুঘরবেহ তার ছোট ভাই আহমেদ আবুঘরবেহকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার পর তিনি একটি প্রোটেক্টিভ অর্ডার জারির আবেদন করেন।

সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ওই আবেদনে আহমেদ আবুঘরবেহ উল্লেখ করেছিলেন যে হিশাম আগেও পরিবারের সদস্যদের সাথে সহিংস আচরণ করেছেন।

সন্দেহভাজন হিশাম সালেহ আবুঘারবেইহ

ছবির উৎস, Hillsborough County Sheriff's Office

ছবির ক্যাপশান, সন্দেহভাজন হিশাম সালেহ আবুঘারবেইহ

একবার তার মায়ের সাথে সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে পুরো লিভিং রুম ভেঙে ফেলেছিলেন হিশাম আবুঘরবেহ।

ওই আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় হিশাম কখনো কখনো মধ্যরাতে নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করে চিৎকার করে উঠতেন এবং বলতেন যে সবার তার সামনে মাথা নত করা উচিত।

হিশাম আবুঘরবেহরকে অভিযুক্ত করে দাখিল করা নথিতে পুলিশ উল্লেখ করেছে যে তিনি সাতই এপ্রিল অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ এবং ১১ই এপ্রিল ময়লা ফেলার ট্রাশ ব্যাগ কিনেছিলেন।

এছাড়া, তিনি ১৩ই এপ্রিল চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে কালো গার্বেজ ব্যাগে মানুষ ভরে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিলে কী হবে?

জবাবে চ্যাটজিপিটি বলেছিল যে এটি বিপজ্জনক।

এরপর হিশাম জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তারা খুঁজে পাবে কীভাবে?

এরপর ১৭ই এপ্রিল রাতে তিনি চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে হিলসবরো রিভারসাইড পার্কে গাড়ি চেক করা হয় কিনা?

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ ডিপার্টমেন্ট তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আহ্বান জানিয়েছে যে রিভারসাইড পার্ক এলাকায় ১৭ই এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত কোনো গাড়ি যদি উপস্থিত থেকে থাকে, তাহলে সেসব গাড়ির ড্যাশক্যামের ফুটেজ দিয়ে যেন পুলিশকে তদন্তে সহায়তা করা হয়।

দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার পর হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ থেকে তাদের 'মিসিং এনডেনজার এডাল্ট' বা নিখোঁজ বিপদগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।

সেটা দেখে হিশাম চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এর মানে কী বোঝায়?

শেরিফ অফিস জানিয়েছে, এই ঘটনায় তারা চ্যাটজিপিটিকে অভিযুক্ত করার কথাও ভাবছেন।

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের ফেসবুক পাতায় হিশামের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে

ছবির উৎস, Hillsborough County Sheriff's Office

ছবির ক্যাপশান, হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের ফেসবুক পাতায় হিশামের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে

শেরিফ অফিসের বরাত দিয়ে সিবিএস জানিয়েছে, আবুঘারবেইহ আগে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী ছিলেন, তবে বর্তমানে তিনি এনরোল্ড ছিলেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি ২০২১ সালের বসন্ত থেকে ২০২৩ সালের বসন্ত পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেছেন এবং ম্যানেজমেন্টে বিএস ডিগ্রি নিচ্ছিলেন।

শেরিফ অফিস জানায়, আবুঘারবেইহের বিরুদ্ধে আগে একাধিকবার গ্রেপ্তারের রেকর্ড রয়েছে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার বিরুদ্ধে হামলা এবং ফাঁকা বাড়িতে চুরি (বার্গলারি) করার অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের মে মাসে তার বিরুদ্ধে আরও একটি হামলার অভিযোগ ছিল, যেগুলো আদালতের নথিতে মিসডিমিনর বা কম গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমগুলোয় বলা হয়েছে, আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রথমবার অপরাধে অভিযুক্তদের জন্য একটি ডাইভারশন প্রোগ্রামে অংশ নেন তিনি। ২০২৪ সালে সেটি সম্পন্ন করার পর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়।

এ বিষয়ে তার আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

হিলসবরো কাউন্টির আদালতের নথিতে আরও দেখা যায়, ২০২৩ সালে তার পরিবার থেকে করা পারিবারিক সহিংসতার আবেদন দু'টোর একটি মামলায় বিচারক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, আর অন্যটি খারিজ করে দেন।

এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।