সাজেকে অবরোধ, অস্থিরতার নেপথ্যে কী?

টানা অবরোধে অচলবস্থা চলছে সাজেকে
ছবির ক্যাপশান, টানা অবরোধে অচলবস্থা চলছে সাজেকে
    • Author, আবুল কালাম আজাদ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে অন্যতম একটি পর্যটন স্পট সাজেকে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সরেজমিনে খাগড়াছড়ি ঘুরে পাহাড়ের আন্দোলনকারী, ব্যবসায়ী জনপ্রতিনিধি এবং পাহাড়ি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।

পার্বত্যএলাকার আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের অবস্থান পর্যালোচনা করেও সাজেকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

পাহাড়ি দুটি সংগঠনের ডাকে টানা অবরোধে সাজেকে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় পর্যটন অর্থনীতি ও জীবন জীবিকায় এই পরিস্থিতি গভীর সংকট তৈরি করেছে। তবে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলেও পর্যটন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লেগে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা।

অবরোধকারী বা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের আলোচনার পরও তাৎক্ষণিক সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নেয়া খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুইয়া বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সরকার কৌশলে এই সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। তার কথায় আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে একটি অস্ত্রধারী গ্রুপকে সরিয়ে আরেকটি গ্রুপের জন্য জায়গা করে দেয়া রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার সকল অবৈধ অস্ত্রধারীদের সাজেক এলাকা থেকে বিতাড়িত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

পাহাড়িদের সংগঠন সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি অবরোধের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এনেছে 'অস্ত্রধারী জেএসএস সন্তু গ্রুপের' উপস্থিতি। সংগঠনের আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা অভিযোগ করেন, ৩১শে অগাস্ট থেকে সাজেকের মাচালং এলাকায় অস্ত্রধারী গ্রুপ অবস্থান নিয়েছে। ওই গ্রুপের উপস্থিতি পাহাড়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা- চাষাবাদ ব্যহত করছে।

আন্দোলনকারীদের ভাষায়, 'অস্ত্রধারী সন্তু গ্রুপকে' সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অবরোধ চলবে।

"প্রায় দুই মাস যাবৎ তারা সেখানে অবস্থান করতেছে। প্রত্যেকটা পাড়া গ্রামের ময়মুরব্বী যারা দায়িত্বে থাকেন, তাদের মারধর এবং হুমকি, মোবাইল ছিনতাই করে নেয়া এবং অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের কাজ করছে। দেখা যাচ্ছে ওখানে কয়েশ পরিবার ঘরছাড়া হয়ে দিনযাপন করছেন। তাদেরকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা- এটা আমাদের প্রধান লক্ষ্য"।

অভিযোগের ব্যাপারে জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসএর পক্ষ থেকে

পরিস্থিতি জটিল কেন

পাহাড়ি কয়েকটি সংগঠনের ডাকে অক্টোবর মাসে সাজেকে তৃতীয় দফায় অবরোধ শুরু হলে পর্যটন খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। তৃতীয় দফা অবরোধ শুরুর দিন ২২শে অক্টোবর পর্যটকদের সাজেক থেকে ফিরিয়ে আনার সময় সেনাবাহিনীর ভাষায় সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

রাঙামাটির সাজেক উপত্যাকা একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্পট
ছবির ক্যাপশান, রাঙামাটির সাজেক উপত্যাকা একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্পট
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ঘটনাস্থলে সরেজমিনে সংবাদ সংগ্রহে যেতে চাইলে বাঘাইহাট ক্যাম্প থেকে বিবিসি বাংলাকে নিরাপত্তা বাহিনী সাজেক সড়কের উজোবাজার এলাকায় যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।

আন্দোলনে যুক্ত দুই সংগঠনের একটি সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, উজোবাজারের ঘটনায় সেনাবাহিনীর দেয়া বক্তব্যের সঙ্গেও তারা একমত নন।

সেনাবাহিনীর পক্ষে আইএসপিআর একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে সরিয়ে আনার সময় অস্ত্রধারীরা ৩০-৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি ছোড়ে।

বাবুধন চাকমার ভাষায় সাজেকের নারী পুরুষ সবাই এ আন্দোলনে অংশ নেয়, তাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হলে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছিল। তাদের দোকান -পাট তছনছ করা হয়, স্থানীয় দোকানপাট ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। এছাড়া সাজেক সড়কের উজোবাজারে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে গোলাগুলির পরিবেশ এবং পরিস্থিতি বা সুযোগ সেখানে ছিল না বলেও দাবি করেন বাবুধন চাকমা। সেনাবাহিনীর লাঠিচার্জের পর অবরোধ কর্মসূচি পাঁচ দফা দাবিতে রূপ নেয়।

পাহাড়ের পরিস্থিতিটা এমন যে সেখানে একটা ভয়ের পরিবেশ রয়েছে। মুক্ত এবং স্বাধীনভাবে সবাই প্রকাশ্যে কথা বলতেও স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। পর্যটন ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের কথায় আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর চাঁদার অর্থের নিয়ন্ত্রণ এখানে একটা বড় ইস্যু।

নেপথ্যে আধিপত্য এবং চাঁদা

পার্বত্য অঞ্চলের সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সীমানায় পড়লে সেখানে সড়ক পথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি দিয়ে। সাজেক পাহাড়ে পর্যটক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে খাগড়াছড়ি থেকে দৈনিক ৫ শতাধিক জিপ চলাচল করে। সাজেকে রয়েছে দেড়শতাধিক হোটেল- রিসোর্ট। সাজেক পর্যটনকে কেন্দ্র করে সে এলাকায় প্রতিদিন অন্তত তিন কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়।

সাজেকে কৃষি, পর্যটন, পরিবহন, বাণিজ্য মিলিয়ে সেখান একটা বড় অংকের চাঁদাবাজি ঘটনা ঘটে। পাহাড়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর এই চাঁদা তোলার বিষয়টি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রশাসন জনপ্রতিনিধিসহ সবার কাছেই ওপেন সিক্রেট।

সাজেক এলাকায় নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য ছিল ইউপিডিএফ নামের একটি সংগঠনের হাতে। তাদেরকে হঠিয়ে সেখানে জেএসএস এখন অবস্থান নিয়েছে এবং সে প্রেক্ষাপটেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বলে বলা হচ্ছে।

খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া সাজেক সংকটের নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টিকেই সামনে আনেন। তার ভাষায়, এই এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রশ্নেই মূল সমস্যাটা হয়েছে।

২৬শে অক্টোবর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকারি প্রতিনিধিদল
ছবির ক্যাপশান, ২৬শে অক্টোবর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকারি প্রতিনিধিদল

"আগে ওই এলাকাতে একটা সশস্ত্র গ্রুপ থাকতো, ডোমিনেট করতো। এখন আরেকটা সশস্ত্র গ্রুপ ওদের হটিয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এটাই হলো মূল সমস্যা। এখন যারা ওখান থেকে বিতাড়িত হয়েছে তাদের ডিমান্ড হলো নিরাপত্তা বাহিনী বা সরকার যারা আধিপত্য বিস্তার করছে তাদেরকে হটায় দিতে হবে। এখন নিরাপত্তা বাহিনী বা সরকারের চিন্তাটা হলো এরকম যে একটা অবৈধ সশস্ত্র গ্রুপের দাবির প্রেক্ষিতে আরেকটা গ্রুপের বিরুদ্ধে তো নিরাপত্তা বাহিনী অবস্থান নিতে পারে না। নিতে হলে সকল অবৈধ সশস্ত্র গ্রুপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে" বলেন ওয়াদুদ ভূইয়া।

তিনি এ-ও বলেন, ওই জায়গাতে একটা বড় রকমের চাঁদাবাজি হয়।

"দুইটা জিনিস কাজ করে। কর্তৃত্ব জায়গার নিয়ন্ত্রণ আর হলো চাঁদা। এখন চাঁদাটা এরা বঞ্চিত হয়ে গেছে। অ্যানাদার গ্রুপ চাঁদাটা কালেকশন করছে, ওর ডোমিনেট করছে। সরকারের কাধে বন্দুক রেখে এদেরকে হটিয়ে দিতে পারলে চাঁদাটা আমরাই নেব বা আগের মত নিয়ন্ত্রণ করবো ক্ল্যাশটা ওই জায়গায়। ওখানে যে গ্রুপটা এসেছে, দখল নিয়েছে সবচেয়ে পূরণো সশস্ত্র সংগঠন- তাদেরকে হটিয়ে দেওয়াটাই মূল দাবি।"

খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন জিপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাকদ মো. মীর হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য একদল আরেকদলকে দোষারোপ করে। আমরা চাই স্থায়ী সমাধান। আমরা চাই শান্তি। কোনো অস্ত্রধারী যেন না থাকে, আমরা কোনো অস্ত্রধারীর কাছে যেন জিম্মি না থাকি।

"আমাদের বছরে টোকেন করতে হয়। যদি আমরা টোকেন না দেই আমাদের ড্রাইভারকে মারধর করে। গাড়ি জালিয়ে দেয়। আমরা তাদের কাছেতো জিম্মি। বছরে আমাদের প্রত্যেক গাড়ির পিছনে দুই-তিন হাজার করে চাঁদা দিতে হয়।"

মি. হোসেন বলেন, সারা বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক আসে তারা যেন স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামে। নির্ভয়ে সাজেক থেকে আসা যাওয়া করতে পারে সেটাই প্রত্যাশা।

মীর হোসেন বলেন, আগে একটা সংগঠন নিত, এখানে চারটা সংগঠন আছে। ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ সংস্কার। জেএসএস জেএসএস সংস্কার। এই চারটা সংগঠনকে টাকা দিয়ে আমাদের এখানে ব্যবসা বাণিজ্য করতে হয়।

"আমরা চাই কোনো অস্ত্রধারী না থাকুক। আমরা কোনো অস্ত্রধারীর কাছে জিম্মি থাকতে চাই না। সকল সম্প্রদায়ের লোক, পাহাড়ি, বাঙালী, বৌদ্ধ আছে এবং ত্রিপুরা আছে, মারমা আছে- সকল সম্প্রদায়ের লোক তাদের কাছে জিম্মি। এটা থেকে আমরা বাঁচতে চাই, মুক্তি চাই।"

খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূইয়া
ছবির ক্যাপশান, খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূইয়া

সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, অবশ্যই চাঁদা দিতে হয় এটা মিথ্যা বলবো না।

"সবজায়গায়তো চাঁদা রয়েছে। এখানে একটু ভিন্ন। এখানে আমরা বাৎসরিকভাবে দেই। তারপর মালপত্র আনার সময় দিতে হয়। এটা আসলে সরকারের ব্যাপার সরকার দেখবে। এখানে আসলে আমার জানামতে চারটা সংগঠন রয়েছে, আবার বান্দরবানের দিকে পাঁচটা সংগঠন রয়েছে।"

মি. জন বলেন, আমরা চাই ব্যবসা তাড়াতাড়ি খুলুক। আসলে কয়েকদিন পর পর এইসব গ্যাঞ্জাম হয়। আমরা লেখাপড়া শেষ করে ব্যবসায় নেমেছি। কয়েকদিন পর পর এ ধরনের বিভিন্ন রকম সমস্যা ফেইস করার কারণে আমরা উদ্যোক্তারাও মন থেকে ব্যবসা করার ধৈর্য্যটা হারিয়ে ফেলছি।

পাল্টাপাল্টি জেএসএস ও ইউপিডিএফ

সাজেক অঞ্চলে অস্ত্রধারী গ্রুপের অস্তিত্ব স্বীকার করে না জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বিবিসি বাংলার প্রশ্নে অডিও বার্তায় বলেন, "জনসংহতি সমিতি কোনো সশস্ত্র আন্দোলনের ঘোষণা করেনি বা সশস্ত্র আন্দোলন করছে না; তাই জন সংহতি সমিতির কোনো সশস্ত্র সদস্য বা সংগঠন থাকার প্রশ্ন আসে না।"

সাজেকে বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, সেখানকার জনগণ এবং শান্তি চুক্তির পক্ষের জনগণ ইউপিডিএফর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ। দীর্ঘদিন এটা প্রতিরোধের চেষ্টা করছে এবং নানাভাবে তাদেরকে সরানোর চেষ্টা করছে। সাজেকের কিছু কিছু এলাকা থেকে জনগণের প্রতিরোধ এবং অসহযোগিতার কারণে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং চাপের মুখে পড়েছে।

সজীব চাকমা অভিযোগ করেছেন, জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তারা সেখানে যে আন্দোলনগুলো করছে। যে সংগঠনগুলো আন্দোলন করছে এগুলো ইউপিডিএফএর পকেট সংগঠন।

"যেটা ঘটছে সেটা হলো চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র দল অবস্থান গ্রহণ করে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা সাধারণ জনগণের উপর হয়রানি, অপহরণ, মারধর সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছে। জনগণকে জিম্মি করেছে। যাতায়াত বন্ধ করে, গাড়িঘোড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে হয়রানি করে চলেছে। এটাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য জেএসএসকে অভিযুক্ত করে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দুটো সংগঠন দিয়ে তারা সড়ক অবরোধ করছে।"

এদিকে আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ এর পক্ষ থেকেও আন্দোলনে ইন্ধন বা সশস্ত্র গ্রুপের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে।

ইউপিডিএফ এর সংগঠক মাইকেল চাকমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, সাজেক এলাকার জনগণের মধ্যে তাদের জনসমর্থন আছে। এছাড়া এই আন্দোলনের দাবির প্রতি তাদের সমর্থন আছে। কিন্তু আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোকে সাধারণ পাহাড়িদের সংগঠন বলে দাবি করেন মাইকেল চাকমা।

আন্দোলনে অংশ নেয়া পাহাড়িরা
ছবির ক্যাপশান, আন্দোলনে অংশ নেয়া পাহাড়িরা (ফাইল ছবি)

মাইকেল চাকমা বলছেন, নারী- পুরুষ সবাইতো রাস্তায় নেমে আন্দোলনটা করছে। তাদের যে অভিযোগ সেনাবাহিনীর ইন্ধনে ও সহযোগিতায় সন্তু গ্রুপ সেখানে গিয়েছে। কাজেই যা কিছু সেখানে হচ্ছে, তাদের এজেন্ডা জেএসএসকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

"জনগণের প্রকৃত আন্দোলনকে ইউপিডিএফ ট্যাগ লাগানো হচ্ছে। যারা আন্দোলন করছে ন্যায্য অধিকারের জন্য, তাদেরকে খুব সহজে টার্গেট করা যায়। তাদেরকে কোনঠাসা করে রাখার কৌশল। ইউপিডিএফ বললে তাদের উপর জেএসএস এবং সব গ্রুপের হামলার করার একটা সুযোগ তৈরি হয়। একটা যৌক্তিকতা তৈরি করা। ইউপিডিএফ বলে তাদেরকে ভালনারেবল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই আন্দোলনের সঙ্গে ইউপিডিএফএর কোনো সম্পর্ক নাই। তবে তাদের দাবির সঙ্গে আমাদের সংহতি আছে।"

মাইকেল চাকমার দাবি সাজেক এলাকায় ইউপিডিএফ এর যে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক কার্যক্রম রয়েছে এবং তার ব্যাপারে সেখানকার জনগণের সমর্থন রয়েছে। এতদিন পর্যন্ত সেখানে তাদের কার্যক্রম নিয়ে কেউ কোনো আপত্তি করেনি। ইউপিডিএফ এর চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রধারী গ্রুপ থাকলে তার ব্যাপারে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে।

"কারোর কাছে যদি অভিযোগ থাকে বা অবৈধ অস্ত্র এবং বেআইনি কার্যক্রম করে থাকে, তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের আছে। যদি ইউপিডিএফ কোনো কিছু করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এখন যেহেতু সাজেকের জনগণ প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমে সেখানে জেএসএস সন্তু গ্রুপের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটা নিয়ে আসছে- এটাতো আমলে নেয়া উচিত"।

পাহাড়ি নেতা সন্তোষিত চাকমা
ছবির ক্যাপশান, পাহাড়ি নেতা সন্তোষিত চাকমা

পাল্টাপাল্টি অবস্থানের এ বাস্তবতায় সাজেককে ঘিরে সংকটের পেছনে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পরস্পর বিরোধ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির একধরনের দায় দেখেন পাহাড়ি নেতা সন্তোষিত চাকমা। তিনি বলেন, এখন ছয়টা গ্রুপ। চুক্তির আগে একটা দল ছিল পার্বত্য জেলায়।

" প্রথমে ইউপিডিএফ সৃষ্টি হল। এরপর জেএসএস এম এল লারমা, তারপর ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, কুকি চিন দল এবং মগ পার্টি। এগুলোতো সম্পূর্ণ সরকারের। অনেকে বলে যে, নাম উচ্চারণ করলেতো সমস্যা। এখানে আমরা একটা গ্রুপ ছিল বিফোর সিএইচটি এগ্রিমেন্ট। কিন্তু এরপর সরকারিভাবে করা হচ্ছে।"

সাজেকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। কোনো দেশেই যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান হয় না। সমাধান হয় আলোচনার মাধ্যমে, আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত।

"এই যে সাজেকটা এটাতো মূলত সরকারি বন। তারা ওখানে কীভাবে গেল? চুক্তির আগে যে তেরটি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে সেই ডিসপ্লেস মানুষগুলো ওখানে গিয়ে আছে। তাদেরকে পুনর্বাসন করলে রিজার্ভটা ঠিক থাকতো। এখন রিজার্ভটাও ধ্বংস হয়ে গেল। এটাতো সরকারের কাজ। সরকারই দায়ী সম্পূর্ণ এ পরিস্থিতির জন্য।"

সাজেকে অস্ত্রধারী সংগঠনের অবস্থানকে ঘিরে আন্দোলনকারীরা বাহিনীর ইন্ধন বা পক্ষপাতিত্বের একটি অভিযোগ তুলেছেন। এ ব্যাপারে সেনা বাহিনী বক্তব্য না দিলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুইয়া তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

"এখন দেখা গেল কোনো একটা গ্রুপের সাথে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ হলো বা মারামারি হল, ফায়ারিং হলো তখন ওরা ভাবে সেনাবাহিনী বুঝি আমাদের শত্রু অপজিট গ্রুপের শত্রু না। কিন্তু আবার অন্যসময় যখন দেখা যায় অপরগ্রুপের সাথে ফাইট হয় বা ওদেরকে শায়েস্তা করতে চায়, তখন ওই গ্রুপটাও মনে করে যে সেনাবাহিনী আমাদেরকে ডিজফেভার করছে, ওদেরকে ফেভার করছে।"

খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, সরকার শান্তিপূর্ণ উপায়ে একটা সমাধান চায়।

"সরকার আন্তরিকভাবে প্রাথমিকভাবে ফার্স্ট প্রায়োরিটি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে, সমঝোতার মাধ্যমে একের প্রতি অন্যের বিশ্বাস- আস্থা অর্জনের মাধ্যমে সমাধানের পথে এগুচ্ছে। "