ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি 'মারাত্মক সংকটাপন্ন অবস্থায়' আছে- বললেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতি 'মারাত্মক সংকটাপন্ন অবস্থায়' রয়েছে বলে মন্তব্য বরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও সেটি "অবিশ্বাস্যরকম দুর্বল" হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার ওভাল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ এক্স হ্যান্ডের একটি পোস্টে লিখেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী "যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব এবং শিক্ষা দিতে প্রস্তুত আছে"।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাবে রোববার ইরান যে পাল্টা প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সেখানে যুদ্ধ বন্ধ এবং মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নিয়ে হরমুজ প্রণালীকে পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তেহরানের এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে সেটাকে "সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য" এবং "আবর্জনা" বলে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরানের প্রস্তাবগুলো ছিল "দায়িত্বশীল" এবং "উদার"।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জবাব দিতে প্রস্তুত বলে মন্তব্য করার পর ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মি. গালিবাফ তার এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত আরেকটি পোস্টে বলেছেন, "১৪-দফা প্রস্তাবে বর্ণিত ইরানি জনগণের অধিকার মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই" যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।

"তারা যত গড়িমসি করবে, মার্কিন করদাতাদের তত বেশি মূল্য দিতে হবে," বলেন মি. গালিবাফ।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের খবরে বলা হয়েছে, তেহরান প্রস্তাবিত ১৪-দফা শান্তি প্রস্তাবের মধ্যে লেবাননসহ সব জায়গায় অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং দেশটির ওপর নতুন করে আর কোনো হামলা না চালানোর নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি তেল গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালি তেল গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রস্তাবটিতে লেবাননের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সেখানে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

সেইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তেহরান। এছাড়া হরমুজ প্রণালির ওপর দেশটির একক নিয়ন্ত্রণ বজা রাখার বিষয়টিও ১৪-দফা শান্তি প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

ইরানের এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে রোববার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, "ইরানের তথাকথিত 'প্রতিনিধিদের' পক্ষ থেকে পাঠানো প্রতিক্রিয়াটি আমি এইমাত্র পড়লাম। এটা আমার পছন্দ হয়নি, পুরোপুরিভাবে অগ্রহণযোগ্য"।

ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মি. বাঘাই বলেছেন, "আমাদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নেবে ইরান"।

এ ঘটনার পর সোমবার নিজের ওভাল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সেখানে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি, যেটি কিছু গোলাগুলির ঘটনার পরও গত এপ্রিল মাস থেকে কার্যকর রয়েছে, সেটি নিয়ে কথা বলেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, "আমি বলবো যুদ্ধবিরতি এখন 'ম্যাসিভ লাইফ সাপোর্টে' বা জীবনমৃত্যুর চরম সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

"এটা ঠিক সেই অবস্থা যখন ডাক্তার এসে বলেন, 'স্যার, আপনার প্রিয়জনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র এক শতাংশ'," বলেন ট্রাম্প।

বক্তব্য প্রদানকালে ইরানি নেতাদের "অত্যন্ত অসম্মানজনক ব্যক্তি" বলে অভিহিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তিনি আরও বলেন, "দেখুন, আমাকে তাদের সঙ্গে চার-পাঁচবার কাজ করতে হয়েছে। তারা বার বার তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে"।

হরমুজ প্রণালীর চিত্রসম্বলিত একটি বিলবোর্ড, যার ওপর ফারসি ভাষায় লেখা রয়েছে—"চিরকাল ইরানের হাতে"

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালীর চিত্রসম্বলিত একটি বিলবোর্ড, যার ওপর ফারসি ভাষায় লেখা রয়েছে—"চিরকাল ইরানের হাতে"

স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরানের পাঠানো প্রস্তাবের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, "ওরা আমাদের যে আবর্জনাটা পাঠিয়েছিল, সেটা আমি পড়ে শেষও করিনি"।

ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেছেন যে, ইরান যতটুকু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, সেটি সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না তেহরান।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, "ইরানের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না"।

ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিমের একটি খবরে দেশটির সরকার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরোনিয়াম অপসারণের জন্য যে প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে, সেটি মেনে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত ইরানের পাঠানো ১৪ দফা প্রস্তাবে নেই।

এর আগে, এ সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প আবারও বলেছিলেন যে, ইরানের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ "দ্রুত শেষ হয়ে যাবে"।

তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিয়ে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অবশ্যই সরিয়ে ফেলতে হবে।

"এখনো কিছু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ইরানে রয়েছে। সেগুলো ভেঙে ফেলতে হবে," সিবিএসে'র 'সিক্সটি মিনিটস' অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি বলেছেন মি. নেতানিয়াহু।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ইতি টানার জন্য ১৪-দফা সম্বলিত এক পৃষ্ঠার একটি প্রাথমিক স্মারকলিপি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

সেখানে ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল চালু করার বিপরীতে ইরানের ওপর থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালির ছবি

দু'জন মার্কিন কর্মকর্তা এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও দু'টি সূত্রকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, যারা স্মারকলিপিটি সম্পর্কে জানেন বলে খবরে বর্ণনা করা হয়েছে।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি ও যুক্তরাষ্ট্রে যৌথভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে।

ওই ঘটনার পর থেকে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে ইরান। এতে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়ে গেছে।

সাধারণত বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথটি দিয়ে সরবরাহ হয়ে থাকে।

অন্যদিকে, তেহরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে তাদের নৌবন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পদক্ষেপের বিরোধিতা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইরান।

প্রায় ৪০ দিনের যুদ্ধ শেষে গত এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এরপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দু'পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা হলেও সেটি এখনও ফলপ্রসু হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়পক্ষ নিজেদের মতো করে আলাদা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু কোনোপক্ষই চুক্তির বিষয়ে এখনও ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।