অভিযোগের 'সত্যতা' মেলায় পদ হারালেন এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
ছবির ক্যাপশান, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন বিএনপি'র মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।

গত মে মাসে শপথ নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করলেন মিজ মিষ্টি।

স্পিকারের কাছে যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কারণ উল্লেখ না করে 'সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায়' পদত্যাগ করছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।

সম্প্রতি ঢাকার মিরপুর এলাকার বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে যে হামলার ঘটনাটি ঘটেছে, সেটার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

যদিও মিজ মিষ্টি শুরু থেকেই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হওয়ার পর বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, বিএনপি'র ওই নারী এমপির বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রাথমিক তদন্তে মিজ মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা মেলায় তাকে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী; এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতেই বিএনপি সরকার এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানাচ্ছেন দলটির নেতারা।

"বিএনপি কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এটি আবারও প্রমাণিত হলো," ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড প্রোফাইলে লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন।

পদত্যাগের পর দলীয়ভাবেও মিজ মিষ্টির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপি নেতারা।

উল্লেখ্য যে, মিজ মিষ্টি বিএনপি'র ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক পদে ছিলেন।

রাড্ডায় হামলার ঘটনার পর গত বুধবার ওই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে দলটি। সেইসঙ্গে, হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের ডজনেরও বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি-না, জানতে চাইলে দলীয় একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে যে, তদন্ত শেষে পুলিশ তাদের মতো করে ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও জানিয়েছেন, পুলিশের তদন্তে মিজ মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

কী বলছেন মিষ্টি?

সরকার প্রধানের কাছ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কার্যালয়ে যান বিএনপি'র সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে পৌনে দুইটার দিকে গিয়ে দশ মিনিটের মতো সেখানে অবস্থান করেন তিনি।

সেখান থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের জানান যে, স্পিকারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন।

"আমি স্পিকারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, কথা বলেছি," সাংবাদিকদের বলেন মিজ মিষ্টি।

তবে পদত্যাগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি কোনো জবাব দেননি।

"তদন্ত হোক। তদন্ততে যা হবে, সেটাই হবে," বলেন মিজ মিষ্টি।

স্পিকারের কাছে যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, সেখানে তিনি লিখেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে গত পাঁচ মাস ধরে এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

"আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় জাতীয় সংসদের সদস্য (সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩) পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। অতএব, বিনীত প্রর্থনা এই যে আমার পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করে পদত্যাগ কার্যকর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনার সদয় মর্জি হয়।"

স্পিকার তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে পদত্যাগপত্র জমা দিতে স্পিকারের কার্যালয়ে যান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
ছবির ক্যাপশান, বৃহস্পতিবার দুপুরে পদত্যাগপত্র জমা দিতে স্পিকারের কার্যালয়ে যান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

প্রজ্ঞাপন জারি

পদত্যাগপত্র হাতে পাওয়ার পর দুপুরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, মিজ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন এবং তার আসনটি শূন্য হয়েছে।

"সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, পত্রটি পাওয়ার পরই তার পদ শূন্য হয়ে গেছে। আমরা এটি নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দেবো। আজ থেকেই এই পদত্যাগ কার্যকর হবে," বলেন স্পিকার মি. আহমদ।

পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে কি-না, জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "সংসদের বিধান হলো এমপি যখন পদত্যাগ করেন, তখন কোনো কারণ উল্লেখ করেন না"।

এরপর বৃহস্পতিবার বিকেলে মিজ মিষ্টির আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের বর্তমান সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করায় বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৭ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আসন-৩২৩ (মহিলা আসন-২৩) শূন্য হয়েছে।

সংবিধানের ৬৭ (২) অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে, "কোনো সংসদ-সদস্য স্পিকারের নিকট স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন এবং স্পিকার- কিংবা স্পিকারের পদ শূন্য থাকিলে বা অন্য কোনো কারণে স্পিকার স্বীয় দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ডেপুটি স্পিকার- যখন উক্ত পত্র প্রাপ্ত হন, তখন হইতে উক্ত সদস্যের আসন শূন্য হইবে"।

রাড্ডা গুড়িয়ে দিয়ে জমির মালিকানা দাবি করে একটি সাইনবোর্ডও বসানো হয়
ছবির ক্যাপশান, রাড্ডা হেলথ সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে সাইনবোর্ডও টানিয়ে দেয় হামলাকারীরা

রাড্ডায় হামলা ঘিরে যা যা ঘটেছে

গত ২৪শে সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে মিরপুরে শাহ আলী মাজার সংলগ্ন ছিন্নমূল শপিং কমপ্লেক্সের পেছনেই অবস্থিত বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় দুই থেকে আড়াইশো ব্যক্তি।

দুই জন নিরাপত্তারক্ষীকে বেঁধে রেখে গুড়িয়ে দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটির একটি পাকা এবং তিনটি আধাপাকা ঘর।

হামলার সময় সরকারি ইপিআইয়ের টিকা, ওষুধ-ভ্যাকসিন, নগদ টাকা, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসিসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র লুট করা হয়।

সবমিলিয়ে সব মিলিয়ে এক কোটি নয় লাখ টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার।

ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে চলে যাওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে যান হামলাকারীরা।

যেখানে লেখা রয়েছে যে, "গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ও রেজিস্ট্রি মূলে এই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা"।

পরে অভিযোগ ওঠে যে, মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সঙ্গে ওই এলাকার বিএনপি নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততা রয়েছে।

হামলার ঘটনার পর মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান 'ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ'র (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একটি বিবৃতিতে বলেন, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
ছবির ক্যাপশান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

এ ধরনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে দলটির ভেতরে 'শুদ্ধি অভিযান' শুরু করার আহ্বান জানায় টিআইবি।

পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠায় প্রত্যাহার করা হয় শাহ আলী থানার তখনকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে।

হামলায় জড়িত অভিযোগে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয় ১২ জনকে।

এছাড়া অভিযুক্ত সংসদ সদস্য মিজ মিষ্টির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে বুধবার জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

"তদন্তে কারো সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না," বলেন মি. আহমদ।

সেইসঙ্গে এটাও জানানো হয় যে, অপরাধীদের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর বুধবার রাতে থেকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বিবিসি বাংলাকে জানান, তারেক রহমান মিজ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।

এরপর বেলা পৌনে দুইটার দিকে স্পিকারের কার্যালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিতে যান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।