কীভাবে ৯/১১-এর ঘটনা থেকে এখনো শেখার আছে?

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ এর হামলা

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার
    • Role, নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

একটি সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো তার জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া- কয়েক দশক ধরে অসংখ্য নেতা এমন কথাই বলে এসেছেন। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই তা করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য ছিল, কিন্তু দুঃখজনকভাবে কেউ সময়মতো তথ্যগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া ওই হামলাগুলো, যা 'নাইন ইলেভেন' (৯/১১) নামে পরিচিত হয়ে ওঠে, এবং এর প্রতিক্রিয়া, এই শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে বৈদেশিক নীতি, নিরাপত্তা নীতি ও গোয়েন্দা নীতির একটি পুরো প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করেছে।

২০০১ সালের ১১শে সেপ্টেম্বর, যখন আল-কায়েদার আত্মঘাতী পাইলটরা ছিনতাই করা বিমানগুলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত করছিল, তখন আমি মধ্যপ্রাচ্য ব্যুরোতে আমার দায়িত্ব শেষ করছিলাম।

একজন ফিলিস্তিনি ট্যাক্সিচালক আমাকে জেরুজালেমের পশ্চিমে পাইনগাছে ঘেরা পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি গাড়ির রেডিওর শব্দ বাড়িয়ে দিলেন।

"আমেরিকায় বড় কিছু ঘটেছে," তিনি বললেন।

তিনি মোটেও বাড়িয়ে বলেননি। সেদিন দুই হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন।

এই হামলা হঠাৎ করেও ঘটেনি।

সিআইএ ২০০১ সালের বহু বছর আগে থেকেই আল-কায়েদা নেটওয়ার্ক এবং এর নির্বাসিত সৌদি নেতা ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে অবগত ছিল। এমনকি তাকে খুঁজে বের করার জন্য তাদের একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও ছিল।

১১শে সেপ্টেম্বরের হামলার নয় দিন পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ "সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ" ঘোষণা করেন।

একটি রুমে গাঢ় রঙের স্যুট পরা তিনজন ব্যক্তি। সেখানে একটি টেলিভিশন রয়েছে, যার পর্দায় টুইন টাওয়ার দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যক্তিটি জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং তিনি একটি নোটবুকে লিখছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হামলার সময় জর্জ ডব্লিউ বুশ ফ্লোরিডার একটি স্কুলে ছিলেন

পরবর্তী ২৫ বছরে আটলান্টিকের উভয় তীরে গোয়েন্দা কার্যক্রমে বহু সাফল্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল ব্যর্থতাও।

সাফল্যের মধ্যে রয়েছে ভণ্ডুল করে দেওয়া ষড়যন্ত্র, সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার, বিচার, দণ্ড এবং কারাদণ্ড।

কিন্তু বৃহত্তর চিত্রটি কী?

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পরবর্তী ২৫ বছরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং কৌশলগত পরিকল্পনায় কী পরিবর্তন এসেছে?

বিরাট গোয়েন্দা ব্যর্থতা

৯/১১ যে একটি বিরাট গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল, তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, এটি ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের কল্পনাশক্তির ব্যর্থতা।

সে সময় সিআইএ ও এফবিআই উভয়ের কাছেই এমন তথ্য ছিল, যা সঠিকভাবে আদান-প্রদান করা হলে ঘটনাটি ঠেকানো সম্ভব হতে পারত।

পরবর্তী ৯/১১ কমিশন রিপোর্টে মার্কিন সরকারের "কল্পনাশক্তি, নীতি, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা"-কে দায়ী করা হয়।

প্রতিবেদনটি উপসংহারে জানায়, সিআইএ ও এফবিআই গোয়েন্দা তথ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে, পরস্পরের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করতে এবং চক্রান্তটি ভণ্ডুল করতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।

এর পর থেকে এই মৌলিক শিক্ষাটি অনেকাংশেই, যদিও পুরোপুরি নয়, গ্রহণ করা হয়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ২০০১ সালের তুলনায় এখন বহুগুণ উন্নত।

একসময় এমআই৫ ও পুলিশ কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তা বিলীন হয়েছে। প্রথমে যুক্তরাজ্যজুড়ে আঞ্চলিক 'ফিউশন সেন্টার' প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে লন্ডনে উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন কাউন্টার টেররিজম অপারেশনস সেন্টার গড়ে তোলা হয়।

এখানে এমআই৫-এর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এমন পুলিশ কর্মকর্তাদের একেবারে পাশে বসে কাজ করতে পারেন, যাদের দায়িত্ব সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র ঠেকাতে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া।

একইভাবে তারা এফবিআই-এর কোনো মার্কিন ফেডারেল এজেন্ট অথবা জিসিএইচকিউ থেকে প্রেষণে আসা কোনো ভাষাবিশেষজ্ঞের পাশেও বসতে পারেন।

৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থায়ও ব্যাপক পুনর্গঠন হয়। ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ১৮টি পৃথক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে প্রয়োজনমতো তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স পদ সৃষ্টি করা হয়।

সিআইএ এবং এর ব্রিটিশ সমকক্ষ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের (যা এমআই৬ নামে বেশি পরিচিত) সম্পর্ক সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর একটি।

এটি আরও শক্তিশালী হয়েছে 'ফাইভ আইজ' জোটের মাধ্যমে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করে।

তবুও টুইন টাওয়ারে বিমান আঘাত হানার পর থেকে গোয়েন্দা তথ্য, মূল্যায়ন ও কৌশলগত পরিকল্পনায় বেশ কয়েকটি বিপর্যয়কর ব্যর্থতা ঘটেছে।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের আগে এমআই৬ অসতর্কভাবে তার গোয়েন্দা তথ্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। এর ফলে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে দ্বৈত এজেন্ট কিম ফিলবি ও অন্যান্য সোভিয়েত গুপ্তচরদের বিশ্বাসঘাতকতার পর সংস্থাটির সবচেয়ে বড় সুনামহানি ঘটে।

যুক্তরাজ্যের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস, যা এমআই৬ নামে পরিচিত, তার সদরদপ্তর

ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গোয়েন্দা কেলেঙ্কারিতে আলোড়িত হয়েছিল এমআই৬

ওয়াশিংটনের প্রবল রাজনৈতিক চাপের মধ্যে, যেখানে দাবি করা হচ্ছিল যে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইরাকের কাছে 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' (ডব্লিউএমডি) তখনো রয়েছে, এমআই৬ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকারকে এমন গোয়েন্দা তথ্য দেয় যা পরে ত্রুটিপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়।

ইরাকের অতীতে এ ধরনের অস্ত্র ছিল ঠিকই, তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল।

২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর মাঠপর্যায়ের এজেন্টদের কাছ থেকে আসা কাঁচা গোয়েন্দা তথ্য, যা সিএক্স নামে পরিচিত, তা মূল্যায়নের পদ্ধতিতে এমআই৬ সম্পূর্ণ পরিবর্তন আনে।

বর্তমানে তথ্য সংগ্রহকারী এজেন্ট-পরিচালক এবং রিপোর্ট মূল্যায়নকারী দলের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। পরবর্তী দলের কাজ হলো তথ্য যাচাই করা, চ্যালেঞ্জ করা এবং প্রয়োজনে আরও প্রমাণের দাবিতে তা ফেরত পাঠানো।

পরিবর্তন সত্ত্বেও ৯/১১-এর বহু বছর পর পর্যন্ত কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা হয়নি।

"(২০০৩ সালের) ইরাক যুদ্ধ গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল," বলেন জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফ, যিনি ইরাকে ডিভিশনাল কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

"আমরা কি সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছি? না, আমার মনে হয় আমরা শিক্ষা গ্রহণে দুর্বল... একজন কমান্ডার হিসেবে আমাদের কৌশলগত ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যাওয়া খুবই স্পষ্ট ছিল।"

ইরাক আক্রমণের পর আবারও একটি তদন্ত পরিচালিত হয়, যার পরিণতি ছিল বাটলার রিভিউ।

এতে বলা হয়, ইরাকের কথিত ডব্লিউএমডি কর্মসূচি সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা তথ্য "গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং অযাচাইকৃত উৎসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।"

নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫-ও অসংখ্য সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে।

"৯/১১-এর পর," বলেন লর্ড জোনাথন ইভানস, যিনি ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এমআই৫-এর প্রধান ছিলেন, "মূল্যায়ন ছিল যে যুক্তরাজ্যের জন্য সবচেয়ে জরুরি নিরাপত্তা হুমকি হলো আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী হুমকি।"

২১শে ডিসেম্বর ২০০৪, ইরাকের বসরার কাছে একটি ব্রিটিশ সেনাঘাঁটিতে সেনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর একটি ট্যাংক থেকে লাফিয়ে নামছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, টনি ব্লেয়ার 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে' জর্জ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন

কিন্তু তখন ২০ হাজারের বেশি 'সাবজেক্টস অব ইন্টারেস্ট' সমন্বিত ডেটাবেস এবং একযোগে পরিচালিত বহু তদন্তের কারণে এমআই৫-এর সামনে কোন সূত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে নিয়ে প্রতিদিনই চ্যালেঞ্জ ছিল, যা এখনো রয়েছে।

তারা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

২০০৫ সালে তারা ৭/৭ লন্ডন আত্মঘাতী বোমা হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, যাতে ৫২ জন নিহত হন।

নিরাপত্তা সংস্থাটি মোহাম্মদ সিদিক খান সম্পর্কে অবগত ছিল, যিনি পরে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত হন। কিন্তু তিনি কী করতে যাচ্ছেন, তা তারা জানত না।

২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা বোমা হামলাও ছিল আরও সাম্প্রতিক একটি ব্যর্থতা।

আজও সন্ত্রাসবাদের হুমকি বিদ্যমান, কিন্তু লর্ড ইভানসের ভাষায়, "চিত্রটি পরিবর্তিত হয়েছে। রাষ্ট্রবহির্ভূত সন্ত্রাসবাদ এখনো গুরুতর উদ্বেগের বিষয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় হুমকি... ক্রমেই আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অন্তত সমান মাত্রায় উদ্বেগের কারণ। এই হুমকিগুলো বিভিন্ন রূপে আসে রাশিয়া, ইরান, তাদের মিত্রগোষ্ঠী এবং চীন থেকে।"

তেহরানের আজাদি স্কোয়ারে প্রদর্শিত একটি ইরানি তৈরি ড্রোন

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে কৌশলগত ভুল হিসেবেও দেখা হয়েছে

এমন যুক্তিও দেওয়া যেতে পারে যে এ বছর ইরানের ওপর হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ছিল গোয়েন্দা কল্পনাশক্তির ব্যর্থতা।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব মিত্রই জানত যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সব সতর্কবার্তা ছিল, তবু ইরান যখন ঠিক সেটাই করল যার হুমকি সে দিয়েছিল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করল, তখন ট্রাম্পের কোনো পাল্টা কৌশল ছিল বলে মনে হয়নি।

নৈতিক হিসাব-নিকাশ

৯/১১ হামলার পরপরই ব্যাপক আশঙ্কা ছিল যে দ্বিতীয় দফা হামলা আসছে।

আসলে আল-কায়েদা নিজেই আরও ভবনে হামলার জন্য 'বিমানের ঝাঁক' পাঠানোর হুমকি দিয়েছিল।

এমন হামলা ঠেকানোর তাড়াহুড়োতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বহু মানবাধিকার লঙ্ঘন করে।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করা হয়, অনেক সময় অত্যন্ত দুর্বল সূত্রের ভিত্তিতে।

শত শত ব্যক্তিকে হাত-পা বেঁধে, চোখ বেঁধে এবং ডায়াপার পরিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কিউবার গুয়ান্তানামো উপসাগরে মার্কিন নৌঘাঁটির অস্থায়ী খাঁচা-কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে আমেরিকার নৈতিক বিবেকের ওপর কলঙ্ক বলে আখ্যা দেয়।

ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হেফাজতে বন্দি নির্যাতনের কেলেঙ্কারিও পরে প্রকাশ্যে আসে এবং জড়িত কিছু ব্যক্তিকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, আরও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা পরিণতি এড়িয়ে গেছেন।

তবুও যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুয়ান্তানামো উপসাগরে বিচার ছাড়া আটক রাখার নীতি অনুসরণ করে এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০ জনের বেশি পুরুষকে এল সালভাদরের বিতর্কিত টেররিজম কনফাইনমেন্ট সেন্টারে পাঠিয়েছে।

৯/১১-এর পরপর সময়টি মানবাধিকার প্রশ্নে ব্রিটেনের জন্যও কলঙ্কমুক্ত ছিল না।

২০০৪ সালে এমআই৬ থাইল্যান্ড থেকে লিবীয় ইসলামপন্থি আবদেলহাকিম বেলহাজ এবং তার স্ত্রীকে অপহরণ করে লিবিয়ায় পাঠানোর ঘটনায় জড়িত ছিল।

সেখানে তিনি বহু বছর কারাগারে কাটান এবং কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনের হাতে নির্যাতিত হন।

ঘটনাটি পরে প্রকাশ্যে আসে এবং ২০১৮ সালে অ্যাটর্নি জেনারেল পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

আজ সংস্থাগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ আইনজীবী বিভাগ সবচেয়ে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া বিভাগগুলোর একটি বলে জানা যায়।

রাশিয়া ও চীনের উত্থান

"আমরা এই শতাব্দীর প্রথম ২০ বছর প্রায় সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং বিদ্রোহ দমনে ব্যয় করেছি," বলেন স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গার, যিনি ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান ছিলেন।

পদ ছাড়ার কিছুদিন পর একটি সাহিত্য উৎসবে আমাকে তিনি বলেন, "সামরিক শক্তি এবং কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চীনের উত্থান আমরা দেখতেই পারিনি।"

একইভাবে জেনারেল শিরেফ ২০১৬ সালে 'ওয়ার উইথ রাশিয়া' নামের রাজনৈতিক থ্রিলার লেখেন, যেখানে তিনি রাশিয়ার ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

৯/১১ ও পরবর্তী 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের' সময় পশ্চিমা দেশগুলো যখন তালেবান, আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়াই কিংবা ইরাকে জটিল দখলদার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত ছিল, তখন রাশিয়া ও চীন ব্যাপক পুনরায় অস্ত্রসজ্জা কর্মসূচি গ্রহণ করে।

উদাহরণস্বরূপ, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উদ্ভাবন নেটোর একসময়ের সামরিক সুবিধাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় করেছে।

নিরাপত্তা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান সিবিলাইনের প্রধান বিশ্লেষক স্যাম অলসেন বলেন, "৯/১১-এর পর সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পশ্চিমা বিশ্ব মনোযোগ হারিয়েছিল, এটাই একমাত্র ভুল নয়।"

"তারা চীনের উত্থানের প্রকৃতিও সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি। তারা ধরে নিয়েছিল যে অর্থনৈতিক একীভবন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমমুখিতা তৈরি করবে।"

চীন, ইরান, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতোই, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে 'কঠিন লক্ষ্য' হিসেবে বিবেচিত।

২০০১ সালে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ প্রযুক্তি তখনও বিকাশের পর্যায়ে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মুখমণ্ডল, চোখের আইরিস এবং চলাফেরার ধরন শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে এজেন্ট ও তাদের পরিচালকদের চলাচলকে অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে রেড স্কয়ারে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে পদযাত্রা করছে চীনা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা

ছবির উৎস, Host Photo Agency via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গত দুই দশকে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে

তাহলে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চীনকে কতটা ভালোভাবে বোঝে?

রাশিয়ার পাশাপাশি আজ চীনও এমআই৬-এর শীর্ষ গোয়েন্দা লক্ষ্যগুলোর একটি।

সিবিলাইনের স্যাম অলসেন বলেন, "পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চীন সম্পর্কে অনেক কিছুই বোঝে।"

"বড় বিপদ হলো তারা পৃথক অংশগুলো দেখতে পায়, কিন্তু সবগুলো মিলে কী চিত্র তৈরি করছে তা সবসময় বুঝতে পারে না। চীনের শক্তি এখন আর শুধু জাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও সেনাবাহিনীতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ক্রমবর্ধমানভাবে সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, বন্দর, টেলিযোগাযোগ এবং শিল্প সক্ষমতার মধ্যে নিহিত... ফলে সমস্যা প্রায়শই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা নয়, বরং কৌশলগত ব্যাখ্যার ব্যর্থতা।"

পঁচিশ বছর আগে, ৯/১১-এর দিন, মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে ধাঁধার কিছু অংশ ছিল, যে উপমাটি গুপ্তচররা প্রায়ই ব্যবহার করে।

কিন্তু সম্মিলিতভাবে তারা সেগুলো একত্র করে সামনে কী আসছে, তা স্পষ্টভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছিল।

চমৎকার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে কোনো লাভ নেই, যদি তা কৌশলগত সুবিধার জন্য কাজে লাগানো না যায়।

সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া এক বিশ্ব

নিঃসন্দেহে নিউইয়র্কের সেই নির্মেঘ নীল সেপ্টেম্বর সকালের পর গত ২৫ বছরে গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সন্ত্রাসবিরোধী বিশ্বের চেহারা প্রায় আমূল বদলে গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের আবির্ভাবের ফলে এই পরিবর্তন আরও চলতে থাকবে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা হবে সূচকীয় গতিতে।

তবে পরস্পরবিরোধী বর্ণনা ও স্বার্থে পূর্ণ এই বিশ্বে গোয়েন্দা ব্যর্থতা, ভুল মূল্যায়ন বা কৌশলগত ভুল হিসাবের একচেটিয়া অধিকার পশ্চিমা দেশগুলোর নেই।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার বিপর্যয়কর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এবং ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর গাজা থেকে হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হামলা, যাকে কেউ কেউ ইসরায়েলের 'নিজস্ব ৯/১১' বলে বর্ণনা করেছেন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন রয়ে গেছে বড় কৌশলগত ও জাতীয় অনেক সিদ্ধান্তকে ঘিরে।

প্রেসিডেন্ট বুশের ইরাক আক্রমণে ব্রিটেনের যোগ দেওয়া কি সঠিক ছিল?

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডমে যোগ দেওয়া এবং তারপর দুই দশক পর তড়িঘড়ি করে দেশটি তালেবানের হাতে ছেড়ে দেওয়া কি সঠিক ছিল?

এসব প্রশ্ন, এবং আরও অনেক প্রশ্ন, এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।