আইফোন ১৭ থেকে ২০ কিলো বিরিয়ানি: পার্সেলের হিড়িকে হয়রান দক্ষিণ ভারতের ইনফ্লুয়েন্সার

ছবির উৎস, Shanmuganathan Veeramani/ Instagram
- Author, সিরাজ
- Role, বিবিসি তামিল
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
"দিনে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ বার ক্যাশ অন ডেলিভারি পার্সেল পাচ্ছি। বাড়িওয়ালা, প্রতিবেশী- সবাই ক্ষুব্ধ। এখন আমাদের ঘর ছাড়তে হবে। দয়া করে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে প্রকাশ করবেন না," কথাগুলো বলছিলেন সুমঙ্গলী ভীরামণি।
তিনি দক্ষিণ ভারতের মাদুরাইয়ের সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার শান্মুগানাথন ভীরামণির স্ত্রী।
মাদুরাইয়ের এই ইনফ্লুয়েন্সার গত কয়েকদিন ধরে 'অ্যামাজন', 'সুইগি' এবং অন্যান্য অনলাইন অ্যাপ মারফত একের পর এক পার্সেল পাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে খাবার, টিভি, ফ্রিজ, আইফোন এমনকি ২০ কেজি বিরিয়ানিও।
এইসব পার্সেলই এখন তার পরিবারের কাছে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে গিয়েছে।
কারণ এই সব কিছুই 'ক্যাশ অন ডেলিভারি' (সিওডি) পদ্ধতির মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। অর্থাৎ এই জিনিসগুলো নিতে হলে দাম দিতে হবে ভীরামণি পরিবারকে।
আর পার্সেলে থাকা জিনিসের ধার্য দাম না দিতে পারলে সেই পার্সেল ফেরত পাঠাতে হবে তাদের।
এখানেই থেমে থাকেনি বিষয়টা।
কেউ একজন এই ইনফ্লুইয়েন্সারের নাম-ফোন নম্বর কিডনি দান করার জন্যও তালিকাভুক্ত করে দিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও শেয়ার করে কাউকে কিছু না পাঠাতে অনুরোধ করেছেন মি. ভীরামণি।
"ডেলিভারির জন্য সব সময়ে কেউ না কেউ কলিং বেল বাজাচ্ছে। এখন দরজা খুলতে ভয় পাচ্ছি। এমনকি তাদের (পার্সেল ডেলিভারি দিতে আসেন যারা) যদি বলি যে কিছু অর্ডার দেওয়া হয়নি, তাহলেও অনেক কিছুই শুনতে চান না।"
"এই কারণে আমার স্বামী শহর ছেড়েছেন। আমাদের আয়ের উপরেও এর প্রভাব পড়েছে," বলেছিলেন সুমঙ্গলী ভীরামণি।
সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞরা বাড়ির ঠিকানা এবং ফোন নম্বরের মতো ব্যক্তিগত তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

ছবির উৎস, Shanmuganathan Veeramani/ Instagram
কীভাবে শুরু হলো এই বিপত্তি?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তামিলনাড়ুর বাসিন্দা শান্মুগানাথন ভীরামণি নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও পোস্ট করেন।
ইনস্টাগ্রামে লক্ষাধিক ফলোয়ার রয়েছেন তার।
গত মাসে পোস্ট করা এক ভিডিওতে নিজের ফোন নম্বর শেয়ার করেছিলেন তিনি। আসলে কেরালা ভ্রমণের জন্য সামাজিক মাধ্যমে তার ফলোয়ারদের কাছ আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন এই ইনফ্লুইয়েন্সার।
পরে অন্য এক ভিডিওতে অবশ্য দাবি করেছেন এইভাবে ছয় হাজার টাকাও নাকি পেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু ঘটনা দ্রুত অন্যদিকে মোড় নেয়।
একজন ফলোয়ার উপহার পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে তার ঠিকানা চেয়ে বসেন। মি. ভীরামণি সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বাড়ির ঠিকানা শেয়ারও করেন।
বিবিসি তামিলকে তার স্ত্রী বলেছেন, "সেই দিন থেকে আমাদের বাড়িতে নানা রকম জিনিসপত্র আসতে শুরু করে। কিন্তু সবকিছু ক্যাশ অন ডেলিভারি-তে হওয়ায় আমরা সমস্যায় পড়ি।"
"লোকে লাখ লাখ টাকার জিনিসপত্র পাঠাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে আইফোন ১৭, টেলিভিশন, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, আসবাবপত্র, জামাকাপড় এবং এমনকি মুদিখানার জিনিসপত্রও।কিছুদিন আগে একজন ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে ২০ কেজি বিরিয়ানিও পাঠিয়েছিলেন।"
এহেন 'উপহারে' বিপর্যস্ত এই ইনফ্লুয়েন্সার শেষ পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে একটা ভিডিও পোস্ট করে জিনিসপত্র না পাঠাতে অনুরোধ করেন।
ইনস্টাগ্রামে ভিডিও পোস্ট করে তিনি অনুরোধ করেছেন, "আমি ক্রমাগত পার্সেল পাচ্ছি। ডেলিভারি এজেন্টদের বোঝানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। দয়া করে আমার নামে কোনো জিনিস পাঠাবেন না।"
পরে অন্য এক ভিডিওতে তিনি বলেছেন, "লোকেরা ক্রমাগত আমার বাড়িতে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে জিনিসপত্র পাঠাচ্ছে। একজন কিডনি দান করার জন্য আমার ফোন নম্বরও দিয়েছে।"
"আমি অন্যত্র চলে যাচ্ছি। দয়া করে আমার নামে কোনো জিনিসপত্র পাঠাবেন না।"

ছবির উৎস, Shanmuganathan Veeramani/ Instagram
১০০-রও বেশি পার্সেল পড়ে আছে
তবে, তাতে খুব একটা লাভ হয়নি বলেই জানিয়েছেন সুমঙ্গলী ভীরামণি। এখনো একইভাবে বাড়িতে পার্সেল এসে যাচ্ছে বলেই জানিয়েছেন তিনি।
তার কথায়, "আমার স্বামী এখনো মাদুরাই ফেরেননি। তিনি বাড়ি আসতেও ভয় পাচ্ছেন। ডেলিভারি এজেন্টরা আমার কাছে ওটিপি চায়। কে জিনিসগুলো পাঠিয়েছে, সেটা তারাও জানে না।"
"কেউ কেউ আমাদের কথা বোঝে, আবার কেউ রেগে গিয়ে তর্ক করে। তাই আমারও বাড়ির বাইরে যেতে ভয় লাগছে।"
সুমঙ্গলী ভীরামণি জানিয়েছেন এর আগে তার স্বামী মাদুরাইয়ের একটা বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতেন। কিন্তু এখন তিনি বেকার।
"ও এখন বেকার। ইনস্টাগ্রামে নিয়মিত ভিডিও পোস্ট করত। কিন্তু আমরা কখনো ভাবিনি এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে। বাড়ির মালিক আর প্রতিবেশীরা বেশ বিরক্ত। এই বাড়ি ছেড়ে আমরা শিগগিরই চলে যাব।"
বেসরকারি একটা ক্যুরিয়ার কোম্পানির কর্মচারী অরুণ (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) জানিয়েছেন মি. ভীরামণির নামে ১০০-রও বেশি পার্সেল আছে যা এখনো ডেলিভারি করা হয়নি।
অরুণ বলেছেন, "সিওডি অর্ডার ফেরত গেলে সেটা আমাদের কাজের ওপর প্রভাব ফেলে। এতে সময়, শ্রম এবং গাড়ির তেল - সব অপচয় হয়। যদি আমাদের দিনে একটা নির্দিষ্ট ঠিকানায় ৩০-৪০টা করে জিনিস পৌঁছে দিতে হয়, তাহলে অনেক কর্মচারী সেখানে যাওয়াটাই এড়িয়ে চলেন।"

ছবির উৎস, Getty Images
'বিখ্যাত' হতে গিয়ে নেওয়া ভুল পদক্ষেপ
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী মি. বালুর সঙ্গে এই প্রসঙ্গে কথা বলেছিলাম আমরা।
তিনি বলেছেন, "সোশ্যাল মিডিয়ায় বিখ্যাত হওয়ার জন্য মানুষ না ভেবেই এমন কাজ করে থাকে। আজকের অনলাইন-নির্ভর দুনিয়ায়, আমরা অজান্তেই যে সামান্যতম তথ্যও প্রকাশ করে ফেলি সেটাই বড় ধরনের অপরাধের কারণ হতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "তথ্য গোপনীয়তা কী এবং এর গোপনীয়তা ভঙ্গ হলে তার পরিণতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাবের কারণেই এই ধরনের ঘটনা ঘটে।"
"বারবার লক্ষ লক্ষ টাকার জিনিস ক্যাশ অন ডেলিভারিতে পাঠানো এক ধরনের মানসিক হয়রানি। এর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে এই ধরনের অর্ডার দেওয়ার বিষয়টা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু কারা এগুলো পাঠিয়েছে তা খুঁজে বের করা যাবে।"
অনলাইনে তথ্য যাচাই করেন এমন এক বিশেষজ্ঞ মুরলিকৃষ্ণন চিন্নাদুরাই বলেন, "এভাবে আপনার বাড়ির ঠিকানা এবং ফোন নম্বর প্রকাশ করলে তা আর্থিক প্রতারণার কারণ হতে পারে। শুধু তাই নয়, এর উপর ভিত্তি করে জাল পরিচয়পত্রও তৈরি করা যেতে পারে।"
"আমরা কার সঙ্গে কোন তথ্য ভাগ করে নিচ্ছি, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই তথ্য কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, সেটাও আমাদের যাচাই করে দেখা উচিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করলে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। তাই, কী বলবেন আর কী বলবেন না, সে ব্যাপারে আত্মসংযম রাখাটা করা জরুরি।"









