'বারবার প্রশ্ন করছিল, আমার সাথে কেউ নেই? আমি বিবাহিত নাকি অবিবাহিত?'

পঁচিশ বছর বয়সী তাহুরা সুলতানা রেখা নিয়মিতই দেশে এবং বিদেশে ভ্রমণ করে থাকেন
ছবির ক্যাপশান, পঁচিশ বছর বয়সী তাহুরা সুলতানা রেখা নিয়মিতই দেশে এবং বিদেশে ভ্রমণ করে থাকেন
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

সম্প্রতি প্রাপ্তবয়স্ক তিনজন নারী বাংলাদেশ থেকে নেপালে যাওয়ার জন্য ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন অফিসারদের নানা ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হন, হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যন্ত নেপাল সফরও করতে পারেননি তারা।

এই ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীরা উচ্চ আদালতের স্মরণাপন্নও হলে আদালত পুলিশ, সরকারকে কারণ দর্শানোর রুল জারি করেছে।

কিন্তু শুধু বিমানবন্দরেই নয়, দেশের ভেতরেও একা কিংবা নারীরা কয়েকজনে মিলে ঘুরতে গিয়ে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।

কেউ কেউ জানান, দেশে একা কোথাও গেলে হোটেল বা থাকার জায়গা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়। কেননা, একা একজন নারীর জন্য হোটেলের রুম পেতে অনেক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।

এমনকি যাত্রাপথেও বিপাকে পড়েন নারীরা। অনেক সময় বাসে চেকিং করার সময় একা বা দুই-তিনজন থাকলে তাদেরই শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়েন তারা।

তবে, নারী ট্রাভেলারদের কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, স্থানীয় অধিবাসী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা পেয়েছেন তারা।

যদিও, বর্তমানে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নারীরা বাংলাদেশের ভেতরে একা কিংবা কয়েকজন মিলে ঘুরতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান এই খাত সংশ্লিষ্টরা।

এই লেখায় এমন কয়েকজন যারা একা কিংবা কখনো কখনো মেয়েদের গ্রুপ নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে ভ্রমণ করে থাকেন তাদের গল্প শুনি চলুন।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে নারী ভ্রমণকারী, প্রতীকী ছবি

'আপনার মেয়ে দশটা ছেলের সাথে ঘুরতে যাচ্ছে'

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পঁচিশ বছর বয়সী তাহুরা সুলতানা রেখা নিয়মিতই দেশে এবং বিদেশে ভ্রমণ করে থাকেন।

বর্তমানে নেপালে ট্যুরে রয়েছেন মিজ রেখা। দেশের ভেতরে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণকেই বেশি গুরুত্ব দেন বলে জানান।

সমতলের চেয়ে পার্বত্য এলাকার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কখনো একা আবার কখনো গ্রুপ নিয়ে ঘোরেন এই নারী।

বান্দরবানের পার্বত্য এলাকায় ভ্রমণ করতে হলে স্থানীয় থানার পুলিশ ও সেনা ক্যাম্পের অনুমতি নিতে হয় বলে জানান মিজ রেখা।

দেশের ভেতরে বান্দরবানে একটি গ্রুপের সাথে ভ্রমণ নিয়ে এই নারী নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, "আমার এইজ ২৫, আমি আইডি কার্ডও সাবমিট করছি অথচ দেখলো না। জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছেন?"

"রিপ্লাই করলাম, এরপর প্রশ্ন করে, আপনার ফ্যামিলি জানে? আমার ফ্যামিলি হয়তো জানে, কিন্তু সবার ফ্যামিলি জানে ব্যাপারটা তা না" বলেন মিজ রেখা।

পরিবারকে ফোন করে বলে, "আপনার মেয়ে দশটা ছেলের সাথে যাচ্ছে সেটা কী আপনি জানেন? ওর উচিত ছিল কী যে, আপনার মেয়ে একটা ভ্রমণে যাচ্ছে, আপনি জানেন কিনা। আমরা সিকিউরিটি পারপাজে ফোন করেছি আপনাকে।"

আলী কদমের লামাতে রিসোর্টে যাওয়ার পথে নারী হিসেবে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি।

মিজ রেখা বলছিলেন, আলী কদমে প্রবেশের প্রথম পয়েন্ট ইয়াংসি ক্যাম্পে এন্ট্রি শেষ করে দ্বিতীয় ক্যাম্প কানামাছি ক্যাম্পে গিয়ে তিনি ওই ক্যাম্পের সেনা সদস্যদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়েন।

"আমি সবার আইডি নিয়ে গেলাম। ওরা বললো, আমরা মেয়েদের এন্ট্রি নিব না, ছেলে কেউ নাই, আপনি ছেলেদের পাঠান" বলেন এই নারী ট্রাভেলার।

মিজ রেখা জানান, পরে তার গ্রুপের একজন ছেলে সেখানে যাওয়ার পর আবার তাকে ডেকে পাঠান ওই সেনা সদস্যরা।

ওই সময় তার সাথে ব্যাপক বাক-বিতণ্ডা হয় বলে উল্লেখ করেন মিজ রেখা। যদিও পরে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়।

মিজ রেখা বলছিলেন, বান্দরবানে আলিকদমের মত প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর (সেনা ক্যাম্প) যে কয়টি ক্যাম্প থাকে প্রায় সবগুলোতেই এন্ট্রি করে যেতে হয়।

প্রত্যেকটি স্থানেই তিনি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বলে জানান মিজ রেখা।

রুংরাং ত্রিসতং এ যাওয়ার সময় একবার ওই থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা একজন মেয়ে কিভাবে একটি গ্রুপ লিড করছে এবং এর আগে একজন মেয়েকে সেখানে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেন বলে জানান এই নারী ট্রাভেলার।

তবে, দেশের ভেতরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও দেশের বাইরে খুব একটা এমন পরিস্থিতির শিকার হন না বলে জানান তাহুরা সুলতানা রেখা।

"তুলনা করতে গেলে, আসলে অন্য কোনো দেশের ইমিগ্রেশন আসলে অতটা বাজে না। একজন প্যাসেঞ্জার হিসেবে আমার এক্সপেরিয়েন্স, আমি যদি কনফিডেন্টলি রিপ্লাই করতে পারি তবে এই প্রবলেমগুলো অনেকাংশে কমে আসে" বলছিলেন মিজ রেখা।

নেপালে হিমালয়ের সামনে মিজ রেখা
ছবির ক্যাপশান, বর্তমানে নেপালে ট্যুরে রয়েছেন মিজ রেখা

'বারবার প্রশ্ন করছিল, আমার সাথে কেউ নেই? আমি বিবাহিত নাকি অবিবাহিত?'

বাংলাদেশে একাকী একজন নারীর ভ্রমণ যে বেশ চ্যালেঞ্জের সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকের পোস্টে চোখে পড়ে।

"বাংলাদেশে একা ভ্রমণ করতে গেলে বিশেষ করে মেয়েদের জন্য নিরাপত্তা এখনো সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। কোথায় থাকবেন নিরাপদ? কোন রুটে গেলে ঝুঁকি কম? রাতে কোথায় যাওয়া উচিত নয়?" এমন নানা প্রশ্ন উল্লেখ করে ভ্রমণ গ্রুপগুলোতে প্রায়ই শুধুমাত্র নারীদের জন্য গ্রুপ ট্যুরের স্ট্যাটাস দিতে দেখা যায়।

নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নে ভ্রমণ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকায় একটি বায়িং হাউজে চাকরি করেন সুবর্ণা ওয়াহিদ। এটি তার ছদ্মনাম।

তিনি বলছিলেন, বছর দুয়েক আগে একা কক্সবাজারে গিয়ে হোটেলে রুম পেতে বেশ বিপাকে পড়েছিলেন।

"আমাকে বারবার প্রশ্ন করছিল, আমার সাথে কেউ নেই? আমি বিবাহিত নাকি অবিবাহিত? আরো নানান কথা" বলেন মিজ ওয়াহিদ।

"তাদেরকে আমার এনআইডিও দিলাম। তাও তারা বলে, একলা মেয়েকে রুম ভাড়া দিলে পরে ঝামেলায় পড়তে হয়। পরে অবশ্য আমার সরকারি কর্মকর্তা ভাইয়া ফোন করলে তারা রুম দিয়েছিল আমাকে" বলে জানান তিনি।

ডিসেম্বরে দশদিনের ছুটি নিয়ে প্রথমে কক্সবাজার ও পরে সিলেট বিভাগে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানান মিজ ওয়াহিদ।

কিন্তু কক্সবাজারেই হোটেল পেতে ঝামেলা হওয়ায় পরে সিলেট যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছিলেন তিনি।

ভ্রমণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে পর্যটন খাত এখনো পরিপূর্ণভাবে গড়ে না ওঠায় এমন ঘটনাগুলো ঘটে।

কেবল সলো ট্রাভেলিংই নয় বরং গ্রুপ নিয়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন জান্নাতুল ফেরদৌসি মানু।

মিজ মানু বলছিলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় মানুষজন অত্যন্ত আন্তরিক। কোথাও ঘুরতে গেলে সেই এলাকার মানুষ খুবই সাহায্য করে।

"আমি রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি থেকে শুরু করে দেশের সব আনাচে-কানাচে একাই ঘুরেছি। রাতে ট্রাভেল করে পরদিন থেকে আবার একা ফিরেও এসেছি" বলেন মিজ মানু।

তবে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে এখন একা ভ্রমণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন বলে জানান তিনি।

ডাকাতি, রোড অ্যাক্সিডেন্ট ও নিরাপত্তাহীনতায় এখন রাতে আর ট্রাভেল করেন না বলে উল্লেখ করেন মিজ মানু।

তিনি বলেন, "এখন খুব অস্বস্তি লাগে, কোনদিন বিপদে পড়িনি কিন্তু রাতে একলা ট্রাভেল করতে খুব অস্বস্তি লাগে। গাইড থাকতো পাহাড়ে একাও ঘুরছি, অফিস করে রাতে রওনা দিয়ে গেছি। কিন্তু এখন করি না সেটা।"

এই নারী জানান, "এখন সলো ট্রাভেলিং এর সংখ্যা অনেক কমে এসেছে এবং বেশিরভাগ মেয়েরা এখন কমন গ্রুপে না গিয়ে বরং শুধুমাত্র মেয়েদের গ্রুপে ঘুরতে চায়।"

ভ্রমণকারীরা জানান, একা কিংবা দুই-তিনজন মিলে দেশের কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার সময় যানবাহনে চেকিং এর সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়।

সলো ট্রাভেলার এলিজা বিনতে এলাহী বলছিলেন, একবার কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে একটি চেক পয়েন্টে ডাবল ডেকার বাসের কাউকে কোন প্রশ্ন না করলেও তিনি ও তার ছোট ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়ারিতে একাকী হাঁটছেন নারী ভ্রমণকারী

ইমিগ্রেশনে কেন ঝামেলায় পড়তে হয়?

নারী ভ্রমণকারীরা বলছিলেন, বিশ্বের অনেক দেশের ইমিগ্রেশনে ভ্রমণকারীরা কিছুটা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লেও ভ্রমণের চারটি মূল বিষয় সম্পর্কে উত্তর দিতে পারলেই তারা ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দেয়।

এগুলোর মধ্যে ভ্রমণকালীন সময়ে কোথায় থাকবেন, টিকেট, আইটেনারি এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট সাধারণত ইমিগ্রেশন অফিসার চেক করে থাকেন।

বাংলাদেশের একজন ভ্রমণকারী এলিজা বিনতে এলাহী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণ সংক্রান্ত বই, আর্টিকেল, ভিডিও ব্লগও রয়েছে তার।

মিজ এলিজা বলছিলেন, ইমিগ্রেশনে কিছু কিছু অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন থাকলেও কখনো সফরে বাধা পাননি।

"জর্ডান, আফ্রিকার কিছু দেশ, ই-ভিসা থাকে যে দেশগুলোতে সেসব দেশে যাওয়ার সময় দেখা গেছে, কিছু প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন থাকে, এটা সত্যি কথা। কিন্তু আমি কখনো আটকে যাইনি, কিন্তু ইমিগ্রেশন অতিক্রম করতে কিছুটা সময় লেগেছে" বলেন মিজ এলিজা।

বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপনা নিয়ে কাজ করতে বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘোরেন তিনি।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করার সময় ৬৪ জেলাই ভ্রমণ করেছেন বলে জানান মিজ এলিজা।

"দেশের ভেতরে ঐতিহাসিক যেসব স্থানগুলোতে কাজ করি সেখানে এমন ঘটনা ঘটে না তা না। ঐতিহাসিক স্থানগুলোর কিছু কিছু পরিত্যক্ত থাকে, কিছু কিছু দখলে থাকে। ওখানে স্থানীয়রা ইনফরমেশন দিতে চান না" বলেন মিজ এলিজা।

তবে, দুই-একটি জায়গায় বাধার সম্মুখীন হলেও এই ভ্রমণকারী বলছিলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে সেই ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই ভ্রমণে বের হন।

জিনজিরা প্রাসাদে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুঘল আমলের একটি পুল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়েছিলেন বলে জানান মিজ এলিজা।

তিনি জানান, "আমি আসলে প্রস্তুত থাকি, আমাকে বিভিন্ন ধরনের ঝামেলায় পড়তে হবে। ওইটা মেনে নিয়েই আমি কাজটা করি। আমার কাজটা শেষ করে আনতে কম্প্রোমাইজ করেই শেষ করি।"

রাষ্ট্রীয় এবং পারিবারিকভাবে নারীকে ভ্রমণে উৎসাহ না দেয়া, পরিবেশ তৈরি না করা এবং পর্যটন কাঠামো গড়ে না ওঠায় একাকী নারীর ভ্রমণ এখনো বেশ কঠিন বলে মনে করছেন এই নারী ট্রাভেলার।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে গেলে সেখানকার নিজস্ব সেখানকার নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী ভ্রমণকারীকে আচরণ করা এবং শ্রদ্ধাশীল হতে হবে বলেও উল্লেখ করেন নারী ট্রাভেলাররা।