'বিগ-বি' কী এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতকেও কেন এতে রাখতে চায় জাপান?

ছবির উৎস, PMO
জাপান সফরে থাকা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশের যে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে 'বিগ-বি' প্রসঙ্গ।
দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একযোগে প্রকাশ করা যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, দুই প্রধানমন্ত্রী 'অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য' এই উদ্যোগটিকে নতুনভাবে উন্নীত করতে একমত হয়েছেন।
'বিগ-বি'-এর ভিত্তিতে দুই প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও আইসিটি অবকাঠামোর উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে একযোগে কাজ করার বিষয়ে একমত হন বলে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার কিংবা সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই 'বিগ-বি' সামনে আরও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই সাথে এই বিগ-বি'তে জাপানের দিক থেকে ভারতকে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গটিও সামনে আসছে।
ফলে, প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে এই 'বিগ-বি' আসলে কী।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, PMO
বিগ-বি আসলে কী
বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে জাপান। এ কারণে গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও পণ্য সরবরাহের জন্য সেখানকার সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে দেশটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জাপানের এই 'বিগ-বির' মূল ধারণাই হলো বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগস্থলে পরিণত করা।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপান স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, জাপানের বিগ-বি পরিকল্পনার কেন্দ্রে হলো বাংলাদেশ এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ী অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর ঘিরে বড় বিজনেস হাব করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে তারা।
বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে ঘিরে জাপানের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পরিকল্পনাই হলো 'বিগ-বি' বা 'বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ'।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, ব্যবসা বাণিজ্যের পাশাপাশি ভূ রাজনীতি অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর কেন্দ্রিক পরিকল্পনার অংশ হলো এই 'বিগ-বি'। জাপান বঙ্গোপসাগরের এ অঞ্চলকে বড় দেশগুলোর প্রভাবমুক্ত রাখতে চাইছে।
তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে ইতোমধ্যেই একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হয়েছে, যার ধারণা ও বিনিয়োগ জাপানের। ফলে এ অঞ্চল ঘিরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব বা শিল্প ও জ্বালানিতে জাপানি বিনিয়োগ হলে সেটি সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে বিশ্লেষকরা এটাও বলছেন যে, কয়লা ও গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বিষয়গুলোতে সরকারকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং দেখতে হবে কোন ধরনের শিল্প বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে মিলিয়ে একটি বৃহৎ বাজারের ধারণাকে সামনে নিয়ে এই পরিকল্পনা সামনে নিয়ে এসেছিল জাপান।
সেকারণে ২০২৩ সালে জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই শিল্পাঞ্চলের প্রস্তাব উঠে আসে।
যদিও ২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে 'বিগ-বি' ধারণাটি প্রথমে সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
পরে শেখ হাসিনা ঢাকায় মাতারবাড়ীকে নিয়ে বিস্তৃত পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বিশেষ পরিকল্পনা হিসেবেও গৃহীত হয়েছিল।

ছবির উৎস, PMO
'বিগ-বি'তে ভারতকে নেওয়ার বিষয়ে ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, এই উদ্যোগটির পরিকল্পনাটি এসেছিল জাপানের দিক থেকেই। "তাদের পরিকল্পনা হলো বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর বন্দরকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চল একটি আধুনিক বড় বিজনেস হাবে পরিণত হবে, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কানেক্ট করবে। আবার বাজারের দিক বিবেচনায় ভারতকে যুক্ত করার ইস্যুটি সামনে এসেছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
শিনজো আবে বিগ-বি ধারণাটি সামনে আনার পর ২০১৪ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে এই ধারণাটির আনুষ্ঠানিক একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তখনকার জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির বা জাইকা'র প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা।
তিনি বলেছিলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়টি এই ধারণার মূল ভিত্তি। আর এর দ্বিতীয় ভিত্তি হবে জ্বালানি এবং তৃতীয়টি হলো পরিবহন ব্যবস্থা।
অর্থাৎ গভীর সমুদ্র বন্দরটির মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যের একটি বৈশ্বিক হাব হবে মাতারবাড়ী এবং সেখানকার বিদ্যুৎ দিয়েই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। আর পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জাপান, চীন ও ভারত আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। পরে ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ এ নিয়ে জাপানের সাথে চুক্তি সই করে।
প্রকল্পের বৃহত্তর পর্যায়ের অংশ হিসেবে, মাতারবাড়ী বন্দরকে জাতীয় মহাসড়কের সাথে যুক্ত করতে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম থেকে চকরিয়া পর্যন্ত বিদ্যমান মহাসড়কের উন্নয়নে সহায়তা করছে জাইকা।

ছবির উৎস, CPGCBL
যৌথ ঘোষণায় কী বলা হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রকাশ করা দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, তারা উদ্যোগটিকে 'অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি' নামে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
"জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে একান্ত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গৃহীত দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ 'বিগ-বি' এর অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি, সরবরাহব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, দ্রুত প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজ নিজ দেশের সক্ষমতা ও অভিঘাত মোকাবিলার শক্তি বাড়ানো এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন," যৌথ ঘোষণা বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয় যে, দুই প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন যে, 'অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি'-এর লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামোর উন্নয়নকে সমন্বিত করা, শিল্পের মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিকশিত হওয়া এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি অর্জন করা।
এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন যৌথ ঘোষণায়। এগুলো হলো- সংযোগ ব্যবস্থার (কানেক্টিভিটি) উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারত ও ভূরাজনীতি
জাপানের বিগ-বি ধারণায় দেশটি গত কয়েকবছর ধরেই ভারতকেও সম্পৃক্ত করার কথা বলে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠছিল যে, এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলার জন্যই দেশটি ভারতকে একে যুক্ত করতে চাইছে কি-না।
বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জাপানের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে ঘিরে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে অনেকে মনে করেন।
ড. জাহাঙ্গীর আলম অবশ্য বলছেন যে, ভারতকে এতে সম্পৃক্ত করার জাপানি আগ্রহের মূলে আছে দেশটির বিশাল বাজার।
"জাপান বৈশ্বিক রাজনীতিতে খুব একটা জড়িত হতে চায় না। তবে তারা তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাণিজ্যের সুরক্ষা চায়। আমার ধারণা ভারতের বাংলাদেশ ও ভারতের বিশাল বাজারকে লক্ষ্য করে ভারত প্রসঙ্গটি সামনে এনেছে তারা। এতে বাংলাদেশই লাভবান হবে। সিঙ্গাপুর বন্দর দেখুন যেভাবে বৈশ্বিক ব্যবহার হয় অনেকটা তেমন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, জাপান বিগ-বি ধারণায় ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ধাপে ধাপে আঞ্চলিক আরও দেশগুলোর সাথে বিগ-বির বিষয়টি সামনে আসতে পারে। "এখানে ভূ রাজনৈতিক বিষয় আছে। কারণ জাপান পুরো অঞ্চলকে ঘিরেই কাজ করছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলটিকে বড় শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে রেখে জাপানি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।









