আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষ বিদায়ে ছয় দিনের আনুষ্ঠানিকতায় কী কী থাকছে

ইরাকে প্রতীকী জানাজা মিছিলে জনতা ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পতাকা ও ছবি বহন করছে।

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

    • Author, মাসউদ আজার
    • Role, বিবিসি নিউজ ফার্সি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় দিনব্যাপি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তেহরানে শুরু হতে যাচ্ছে শনিবার। তার হত্যাকাণ্ডের চার মাসেরও বেশি সময় পর এই আনুষ্ঠানিকতা হবে, যেটিকে ইরানি কর্মকর্তারা 'শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া' বলে অভিহিত করছেন।

ইরানি কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, এই আয়োজনে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি হতে পারে। ইরানে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনও এত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।

প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রয়েছে:

• শোক জানাতে আসা মানুষদের জন্য হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব)

• ১০ লাখের বেশি দর্শনার্থীর থাকার ব্যবস্থা

• জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরানের কেন্দ্রস্থলজুড়ে নির্ধারিত পথ

পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক প্রধান প্রাদেশিক ইউনিট মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর।

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা উপলক্ষে আঁকা একটি দেয়ালচিত্র।

ছবির উৎস, MEHR

ছবির ক্যাপশান, "আমাদের জেগে উঠতেই হবে"- অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য এই স্লোগানটি গ্রহণ করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ

জানাজা, দাফনসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে তেহরানে আসা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি কারা আয়োজন থেকে দূরে থাকবেন- সেটিও একই গুরুত্ব বহন করতে পারে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক ডজন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। প্রায় ৮০০ জন বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠান কভার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও তেহরানে গেছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় যোগ দিতে।

জানাজার জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রতীক হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাত আর স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে, "আমাদের জেগে উঠতেই হবে"।

একটি সংবাদ সম্মেলনে, ইউনিফর্ম পরিহিত মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ বেসামরিক পোশাকে থাকা দুজন ব্যক্তির সাথে কথা বলছেন এবং তৃতীয় একজন বিভিন্ন রঙের মাইক্রোফোন ঠিক করছেন।

ছবির উৎস, HAMSHAHRI

ছবির ক্যাপশান, মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ বলেছেন, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে প্রদর্শন করা হবে

শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ছয়টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় ছয় দিনের এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। রোববার বিকেল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।

মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে। দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে প্রত্যেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করে বের হতে পারেন।

ইরাকের নাজাফে একটি মিছিলে জনতা ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতীকী কফিন বহন করছে। কফিনটি ইরানের পতাকায় মোড়া ও ওপরে সাদা-গোলাপি-হলুদ রংয়ের ফুল। কয়েকজন খামেনির ছবি বহন করছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, খামেনির মরদেহ ইরাকের নাজাফে নিয়ে যাওয়া হবে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মঙ্গলবার তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরে স্থানান্তরিত করা হবে আয়োজন। সেখানে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজে ইমামতি করবেন শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেম।

বুধবার খামেনির মরদেহ ইরাকের নাজাফে নেওয়া হবে। অন্ত্যেষ্টিযাত্রার পর কারবালায় ইসলামের খলিফা আলীর (যাকে শিয়া মুসলিমরা তাদের প্রথম ইমাম হিসেবে মানেন) সমাধিস্থলে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে।

ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনুরোধেই এসব কর্মসূচি রাখা হয়েছে। যদিও শিয়াশাসিত মুসলিম বিশ্বে খামেনির প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তুলে ধরতেই এসব আয়োজন করা হয়েছে বলে মত কয়েকজন বিশ্লেষকের।

অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সমন্বয়ের জন্য বাগদাদ সফর করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই আয়োজনের 'প্রতীকী গুরুত্বের' কথা উল্লেখ করেছেন।

বৃহস্পতিবার খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের সমাধিস্থল এবং ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ইমাম রেজার সমাধিস্থলে তাকে সমাহিত করা হবে, যা প্রতিবছর লাখো মানুষ পরিদর্শন করে।

এরপর সারা দেশে আরও ৪০ দিন শোকানুষ্ঠান চলবে। দাফনের প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণসভা ও কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।

খামেনির শেষকৃত্য এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

হাতে সোনার রত্নখচিত ব্রেসলেট ও ​​একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে এক নারী তার মোবাইল ফোনটি তুলে ধরেছেন যার ফোনের কেসের পেছনে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ছবি রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কেউ কেউ এই অনুষ্ঠানগুলোকে ইরান রাষ্ট্রের ঐক্য প্রদর্শনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন

বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতাদের শেষকৃত্য কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এর রাজনৈতিক গুরুত্বও থাকে।

কারও কারও মতে, এই অনুষ্ঠান ইরানি রাষ্ট্রের জন্য ঐক্যের বার্তা দেওয়া এবং নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। এটি খামেনি-পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামো সুসংহত করা এবং তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জোরদার করার ক্ষেত্রেও প্রতীকী ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে কেউ কেউ সতর্কও করছেন যে এত বড় পরিসরে জনসমাবেশ হলেও সেটা ইরানের গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন দূর করতে পারবে না।

ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—মোজতবা খামেনি ও তার ভাইবোনেরা তাদের বাবার দাফনে উপস্থিত থাকবেন কি না।

কারণ গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে খামেনির ছেলেদের আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এছাড়া, ২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারির এক হামলায় মোজতবা খামেনির স্ত্রীসহ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকে তার শারীরিক অবস্থা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

গত মঙ্গলবার আয়োজক কমিটির সম্পাদক আলী আকবর পুরজামশিদিয়ান বলেন, মোজতবা অনুষ্ঠানে থাকবেন কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের কার্যালয় এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে জানানো হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জবাব না পাওয়া প্রশ্ন হলো—জানাজার নামাজে কে ইমামতি করবেন। শিয়া ঐতিহ্যে এই ভূমিকার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় ধরনের তাৎপর্য রয়েছে।

কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে, মোজতবা যদি জনসমক্ষে উপস্থিত হন, তাহলে তা ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।