নারী টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আজ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা কতটা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
নারী টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মানেই আগে আলোচনায় থাকত অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা ভারতের মতো প্রতিষ্ঠিত দলগুলো। বাংলাদেশ সেখানে অনেক সময়ই ছিল অংশগ্রহণকারী দলের তালিকায় থাকা একটি নাম।
কিন্তু সময় বদলাচ্ছে।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু বিশ্বকাপে খেলা নয়, ম্যাচ জেতা এবং প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কথাও আলোচনায় আসছে। আর ঠিক এমন সময়েই শুরু হচ্ছে নারী টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নতুন অধ্যায়।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অনুষ্ঠিত এবারের আসরে দল বেড়ে হয়েছে ১২টি। একই সঙ্গে বেড়েছে মোট পুরস্কারের অর্থও। মোট পুরস্কার তহবিল এখন প্রায় ৮৮ লাখ ডলারের বেশি। যদিও চ্যাম্পিয়নের অর্থ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, টুর্নামেন্টের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামো আগের চেয়ে বড় হয়েছে।
চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ২৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২৮ থেকে ৩০ কোটির কাছাকাছি। রানার্সআপ দল পাবে ১১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সেমিফাইনালে উঠলে প্রতিটি দল পাবে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ডলার।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও প্রতিটি দল নিশ্চিতভাবে পাবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ ডলার। আর প্রতিটি ম্যাচ জিতলে যোগ হবে আরও ৩১ হাজার ১৫৪ ডলার।
এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সামনে আছে নেদারল্যান্ডস যাদের বিপক্ষে রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় মাঠে নামবে বাংলাদেশ।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ।
এই সমীকরণ সামনে রেখে বাংলাদেশের লক্ষ্য কি শুধু অংশগ্রহণ, নাকি এবার আরও বড় কিছু।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
প্রশ্নটা খুব অযৌক্তিক নয়।
কারণ বাংলাদেশের নারী দল আগের বিশ্বকাপে দেখিয়েছে, তারা অন্তত একটি ম্যাচ জয়ের সক্ষমতা রাখে।
২০২৪ নারী টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ একটি ম্যাচ জিতেছিল। স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেয় দলটি। যদিও পরে নকআউট পর্বে যেতে পারেনি, সেই জয় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল অন্য কারণে। কারণ এটি দেখিয়েছে, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মেয়েরা শুধু লড়াই করতেই যায় না, সুযোগ পেলে জিততেও পারে।
এবার সেই প্রশ্ন আরও বড় হয়ে এসেছে।
একটি জয় নয়, বাংলাদেশ কি দুই কিংবা তারও বেশি ম্যাচ জিততে পারবে।
এখানেই আলোচনায় চলে আসে দলের ব্যাটিং।
বাংলাদেশ নারী দলের সবচেয়ে বড় সমালোচনা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল রান তোলার গতি নিয়ে। পাওয়ারপ্লে কাজে লাগানো, শেষের ওভারে দ্রুত রান তোলা কিংবা চাপের সময় বড় ইনিংস খেলা খুব নিয়মিত দেখা যায়নি।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে।
আর সেই পরিবর্তনের মুখগুলোর একটি স্বর্ণা আক্তার।
জামালপুরের এক গ্রামের মেয়ে থেকে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটি এখন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের পরিচিত অধ্যায়।
শৈশবে ভাইদের সঙ্গে খেলতে চাইতেন। কিন্তু মেয়ে বলে সুযোগ পেতেন না। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা, বল কুড়িয়ে দেওয়া কিংবা অন্যদের খেলা দেখা ছিল বাস্তবতা।
তবু থেমে যাননি।
পরিবারের সমর্থন আর এক আত্মীয়ের অনুপ্রেরণায় ক্রিকেট চালিয়ে যান। পরে স্পিনার খোঁজার একটি কার্যক্রমে সুযোগ পান। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়ে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে।
প্রথম দিকে তাকে বেশি দেখা হতো লেগস্পিনার হিসেবে।
কিন্তু এখন তার পরিচয়ের সঙ্গে আরও একটি শব্দ যুক্ত হয়েছে- বিগ হিটার।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাম্প্রতিক সিরিজে বাংলাদেশ যখন বিপর্যয়ে, তখন মিডল অর্ডারে নেমে ৬০ রানের ইনিংস খেলেন স্বর্ণা। বাংলাদেশের নারী টি টোয়েন্টি ইতিহাসে ছয় নম্বর বা তার নিচে নেমে এটিই প্রথম অর্ধশতক।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে শেষের ওভারে দ্রুত রান তোলার মতো ব্যাটার খুব বেশি নেই। সেই জায়গায় স্বর্ণাকে এখন আলাদা করে দেখা হচ্ছে।
দলের ব্যাটিং কোচ নাসিরউদ্দিন ফারুকও মনে করেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটারদের একজন তিনি।
তবে শুধু স্বর্ণা একা নন।
অধিনায়ক নিগার সুলতানা, অভিজ্ঞ ফাহিমা খাতুন, ফের দলে সুযোগ পাওয়া তাজ নেহারদের নিয়েও এবার পরিকল্পনা করছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
নির্বাচকদের ধারণা, ব্যাটিং অর্ডারে নমনীয়তা বাড়ানো গেলে শেষ পাঁচ ওভারে রান তোলার সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
অবশ্য বাস্তবতাও আছে।
ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সীমিত। সেখানে নতুন বল বেশি নড়বে, ব্যাটারদের পরীক্ষা দিতে হবে। উপমহাদেশের তুলনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর বিপক্ষে সুযোগ কম আসে। তাই ছোট মুহূর্তগুলো কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য হয়তো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য এখনই শিরোপা নয়।
কিন্তু গ্রুপ পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, অন্তত দুইটি জয় খোঁজা, কিংবা প্রথমবারের মতো শেষ চারের লড়াইয়ে নিজেদের আলোচনা তৈরি করা খুব বেশি দূরের স্বপ্নও নয়। কারণ নারী ক্রিকেটে ব্যবধান কমছে।
আর বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই পরিবর্তনের অংশ হচ্ছে।
প্রশ্নটা হলো বাংলাদেশ নারী দল কি অবশেষে এমন একটি বিশ্বকাপ খেলতে পারবে, যার পর আর কেউ তাদের শুধু অংশগ্রহণকারী দল বলে পরিচয় না দেয়।
গত কয়েক বছরে নারী দলের আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। প্রস্তুতির ঘাটতি, বড় দলের বিপক্ষে কম খেলার সুযোগ এবং দীর্ঘ বিরতি অনেক সময় দলকে পিছিয়ে দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় বাছাইপর্ব হয়ে বিশ্বকাপে পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিক ধাপ নয়, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলারও সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপের মূল পর্বে এরই মধ্যে জায়গা নিশ্চিত করেছিল স্বাগতিক ইংল্যান্ড। এছাড়া ২০২৪ আসরের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে জায়গা পায় অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সুযোগ পায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা।
এই তালিকায় জায়গা করে নেওয়া বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ খেলা নয়, বরং প্রমাণ করা যে দলটি এখন নিয়মিতভাবে বড় আসরে থাকার দাবি রাখে।
২০২৪ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয় দিয়ে যে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, এবার লক্ষ্য সেটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া।
একটি জয় নয়, বিশ্বকাপে নিজেদের উপস্থিতিকে আরও জোরালো করে তোলাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।








