চট্টগ্রামে ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর-হেনস্তার অভিযোগ, ফের পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ছবির উৎস, NAYEEM HASAN FACEBOOK
বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে তাকে খুলশী থানায় নিয়ে গিয়েও হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ নাঈমের।
ওই ঘটনার পরদিন বিকেলে চট্টগ্রামের নিজ বাসায় একটি সংবাদ সম্মেলনে নাঈম হাসান পুলিশের তিনজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গায়ে হাত তোলা ও হেনেস্তার অভিযোগ তোলেন।
ক্রিকেটার মি. হাসানের বাবা মাহবুবুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার, তার গায়ে কোনো কারণ ছাড়া হাত তুলেছে, পিটিয়ে গাড়িতে উঠতে বাধ্য করেছে। আমি এই ঘটনার বিচার চাই"।
শুক্রবার রাতে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কিছুটা চাপে পড়ে পুলিশ। পরদিন সকালেই চট্টগ্রামের বদ্দারহাটে নাঈমের বাড়িতে যায় চট্টগ্রামের পুলি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
ওই ঘটনার পরদিন শনিবার তিনজন পুলিশ কর্মকর্তারা নাম উল্লেখ করে নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির হাসান বাদী হয়ে চট্টগ্রামের খুলশী থানায় মামলা দায়ের করেন।
ওই ঘটনায় অভিযুক্ত দুইজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ।
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমল থেকেই বাংলাদেশে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকার পর গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের আচরণে পরিবর্তন আনতে বা পুলিশের ভাবমূর্তি ফেরাতে নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এই ঘটনায় পুলিশের অবস্থান নিয়ে আবারও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক উমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের আচরণে যে ধরনের পরিবর্তন আসা করা হয়েছিল, পোশাকের পরিবর্তন ছাড়া আচরণে কোনো পরিবর্তনই আসেনি।
নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি। শনিবার এক বিবৃতিতে বিসিবি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে।

ছবির উৎস, SCREEN GRAB
'একজন এসে আমার গলা চেপে ধরে'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
নাঈম হাসান গণমাধ্যমকে জানান, ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম পৌঁছার কথা ছিল তার। তবে ফ্লাইট দেরিতে হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছান।
পরে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশা করে বদ্দারহাটের নিজ বাসার উদ্দেশে রওনা দেন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে। সেটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের এক সদস্য থামার সংকেত দেন।
মি. হাসান অভিযোগ করেন, পুলিশ তাকে থামাতেই কয়েকজন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেন। এরপর তাকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়।
তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। তবু তাকে ঘটনাস্থলে থাকা একজন পুলিশ তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন বলে তিনি জানান।
শনিবার বিকেলে নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলনে নাঈম হাসান বলেন, "আপনার কাছে গোপন সংবাদ আসতেই পারে। আপনার রাইট ওয়ে হচ্ছে আপনি তাকে দাঁড় করাবেন, জিজ্ঞেস করবেন। অবশ্যই ব্যাগ চেক করার রাইট পুলিশের আছে। উনারা তো সেটা করেনি"।
"ওনারা চাইলে আমি তো চেক করতে দিতাম। আমি একবার উনি চেক করে নাই, আমি সিএনজি থেকে নামছিলাম, পরে আমারে আবার বলতেছে সিএনজিতে উঠতে। সিএনজিতে ওঠার সাথে সাথেই একজন এসে আমার গলা চেপে ধরে"।
মি. হাসান শুক্রবার রাতে অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে বসে পুলিশ তার ফোনটি নিয়ে নেন। পরবর্তীতে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার আসার পর ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়।
বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "থানায় যাওয়ার পর ওসিকে আমি আমার পরিচয় যখন দিলাম, তখন ওসি আমাকে বলতেছে চোখ নিচে নামায়ে কথা বলতে। তখন ওনার মোবাইলে একটা কল আসে। কল আসার পর পরে যখন কথা হইছে তখন আমারে বলতেছে ভাইয়া আপনি বসেন। তখন আবার পুলিশের সুর চেঞ্জ"।
এই ক্রিকেটারের দাবি থানায় যাওয়ার পর পুলিশ তার ব্যাগে থাকা প্রতিটি জিনিস এক এক করে চেক করে। কিন্তু সেখানে কোনো কিছুই তারা পায়নি।

ছবির উৎস, CMP
থানায় মামলা, দুইজন পুলিশ বরখাস্ত
নাঈম হাসান ও তার পরিবারের দাবি, প্রথমেই পুলিশকে তার পরিচয় দেওয়া হয়েছে, থানায় নেওয়ার পরও পরিচয় দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুলিশের দায়িত্বরতরা সে সব আমলেই নেয়নি।
নাঈম হাসান যখন শনিবার বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলনে আসেন তখন শুরুতেই তিনি বলেন, "আমি এখানে এসেছি মূলত ওই ভাইদের ধন্যবাদ জানানোর জন্য। প্রায় ১০০-১২০ জন মানুষ সেখানে ছিল। তারা আমার সঙ্গে থানায় গেছে। তারা না থাকলে ঘটনাটা অন্যরকম হতে পারত।"
তার দাবি, ওই ঘটনাটির সময় সাধারণ মানুষ যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারা তাকে চিনতে পেরে তার সাথে সাথে থানায় গিয়েছে। যে কারণে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়নি। ওই ঘটনার পরদিন খুব অল্প সময়ের জন্য সংবাদ সম্মেলন করেন নাঈম।
বিকেলে নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলম বিবিসি বাংলার কাছে অভিযোগ করেন, সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার অভিযোগে পুলিশ তার ছেলেকে হেনস্তা করেছে।
তিনি বলেন, "গোয়েন্দা সংস্থা পুলিশকে ইনফরমেশন দিয়েছে যে সোনা চোরাচালান আসতেছে এত নম্বর গাড়িতে। একজন ক্রিকেট খেলোয়াড়কে সোনা চোরাচালানকারী বানাতে চাচ্ছিল গোয়েন্দা সংস্থা। তারা কোথা থেকে ইনফরমেশন পেলো যে সোনা চোরাচালান হচ্ছে? ওনাদেরও তলব করা দরকার"।
তিনি জানান, সেই সময় ঘটনাস্থলে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন।
মি. আলম বলছিলেন, "আমার ছেলেটার ভুল থাকলে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কেন তাকে পেটানো হলো, গায়ে হাত তোলা হলো কেন?"
নাঈম হাসানের পরিবারের পক্ষ থেকে তিনজন পুলিশের নাম উল্লেখ করে মামলার আবেদন করা হয়। এর মধ্যে খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া ও তার সাথে থাকা কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সিএমপির পক্ষ থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার কথাও জানায় পুলিশ।
ওই ঘটনার পরদিন দুপুরে সকালে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার নাঈম হাসানের পরিবারের সাথে দেখা করেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের ডিসি উত্তর আমিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের কোথাও না কোথাও ভুল ছিল। পুলিশের যারা ওখানে গিয়েছিল তাদের প্রক্রিয়াগত কিংবা উদ্দেশ্যগত ভুল থাকতে পারে। সেই অনুযায়ী সবাইকে আইনের আওতায় আমরা নিয়ে আসবো"।

ছবির উৎস, Getty Images
পুলিশের আচরণ নিয়ে সেই অতীত প্রশ্ন
ক্রিকেটার নাঈম হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিচিত মুখ। তার সাথে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি নিয়েই শনিবার দিনভর নানা আলোচনা হয়েছে।
বিসিবির বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন অশোভন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বোর্ড বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। একই সাথে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তও দাবি করেছে বিসিবি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, কোনো ধরনের অপরাধ ছাড়াও যেখানে জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটারের সাথে এই ধরনের এই ধরনের আচরণ হলে সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের আচরণ কেমন হবে।
এই প্রশ্ন করা হয়েছিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের ডিসি উত্তর আমিরুল ইসলামের কাছেও। তিনি বলেছেন, "আইন প্রয়োগের পুলিশ কোনো ব্যক্তি ভেদ করে না। পুলিশ সদস্য অন্যায় করলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে"।
বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ছিল। অনেকের ধারণা ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোতেও পরিবর্তন আসবে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার সব সময় রাষ্ট্র ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে থাকে, যে কারণে পুলিশের আচরণ চাইলেও সেভাবে পরিবর্তন আনা যায় না।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক উমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পুলিশের আচরণে যে ধরনের পরিবর্তন আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, এটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যায়নি। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমাদের সরকার কখনোই পুলিশের গুণগত পরিবর্তন চায়নি"।
তার শঙ্কা, একজন জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়ারের বেলায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় যে সংকট আগে ছিলে সেটি এখনো কাটবে না।
মি. ফারুক বলছিলেন, "শুধু এটা খেলোয়ারের ক্ষেত্রে ঘটেনি। প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিদেরও হেনেস্তার শিকার হতে হয়েছে। এখন জাতীয় একজন ক্রিকেটারের নিরাপত্তার বিষয়টি যদি এমন হয়, তাহলে আমরা যারা সাধারণ মানুষের পরিস্থিতি কেমন হবে?"








