গুইসাপ ধরা ও হত্যায় কী সাজা হতে পারে?

ছবির উৎস, Shahriar Younus
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি সদর থেকে পাঁচটি বস্তায় ভরা অবস্থায় ২৪টি গুইসাপ উদ্ধার করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা, যার মধ্যে ১৪টি মৃত অবস্থায় ছিল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার রাত সাড়ে নয়টায় সদরের চেঙ্গিস স্কয়ারে অভিযান চালিয়ে একজন নারীর কাছ থেকে গুইসাপগুলো উদ্ধার করা হয়।
খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা জানান, জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে গুইসাপগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। ওই নারী বিক্রির জন্য গুইসাপগুলো সংগ্রহ করেছিলেন এবং ফেনী জেলা থেকে এগুলো আনা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ওই নারী পানছড়ি উপজেলার কুরাদিয়া ছড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাকে বুধবার রাতে খাগড়াছড়ি সদর থানার হেফাজতে রাখা হয় এবং বৃহস্পতিবার সকালে তার বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ এর অধীনে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে গুইসাপ কি বিরল কোনো প্রাণী? পরিবেশ-প্রকৃতিতে এর কী ভূমিকা আছে? এটি ধরা ও হত্যায় কী সাজা রয়েছে বাংলাদেশের আইনে?
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, Shahriar Younus
কেন ধরা হয়েছিল গুইসাপ
সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, গুইসাপগুলোকে বস্তার ভেতরে লেজ-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়েছিল। বন বিভাগের কর্মকর্তারা সেগুলো বের করে দড়িগুলো কেটে বনে ছেড়ে দিচ্ছেন।
বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জীবিত ১০টি গুইসাপকে আলুটিলার প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে। আর যে ১৪টা গুইসাপ মারা গেছে সেগুলোকে ওইখানে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে যাতে পরিবেশ নষ্ট না হয়।"
ওই নারী গুইসাপগুলো কেন ধরেছিলেন- জানতে চাইলে মি. মিঞা জানান, বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছিল।
"এখানে লোকাল পিপল তো গুইসাপের মাংস খায়। মূলত খাওয়ার জন্যই সেগুলো সংগ্রহ করেছে," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Shahriar Younus
গুইসাপ কি বিরল প্রাণী
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের বনজঙ্গল, ঝোপঝাড় ও কৃষি জমিতে গুইসাপ অহরহই দেখা যায়। যেখানেই একটু ঝোপঝাড়, পুকুর বা নদী রয়েছে সেখানেই এর দেখা মেলে। এটি বিরল কোনো প্রাণী নয়। আর নামের সঙ্গে সাপ থাকলেও এটি আসলে সাপ নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নিয়ামুল নাসের বিবিসি বাংলাকে বলেন, এটি টিকটিকি জাতীয় প্রাণী, অর্থাৎ সরীসৃপ দলের চতুষ্পদী প্রাণী। ইংরেজিতে এর নাম মনিটর লিজার্ড।
বাংলাদেশে তিন প্রজাতির গুইসাপ পাওয়া যায় বলে জানান অধ্যাপক নাসের।
"বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড এক্সক্লুসিভলি বাংলাদেশের একটা প্রজাতি। এই গুইসাপটাই দেশের পার্বত্য অঞ্চলে বেশি পাওয়া যায়। তিন প্রজাতির মধ্যে এই প্রজাতিই সবচেয়ে বড়," বলেন তিনি।
প্রাপ্তবয়স্ক বেঙ্গল গুইসাপ প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
এই প্রজাতি সাধারণত মুরগীর বাচ্চা, মাছ, পাখি, ছোট ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
অধ্যাপক নাসের বলেন, "মুরগীর বাচ্চা খেয়ে ফেলে বলেই অনেক সময়ই গ্রামে-গঞ্জে এদের মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে বলে শোনা যায়।"
সমতলভূমি, জলাভূমি অর্থাৎ দেশের প্রায় সর্বত্রই দেখে মেলে আরেক প্রজাতির ইয়েলো মনিটর লিজার্ড বা সোনাগুইসাপের, বলেন অধ্যাপক নাসের। এই গুইসাপ দেখতে হলুদাভ বাদামি রঙের। একটি প্রাপ্তবয়স্ক সোনাগুই প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে থাকে।
"এর মধ্যে তৃতীয় প্রজাতির ভারানাস সালভাটর খুবই ইন্টারেস্টিং। সাধারণত সুন্দরবন বা লবণাক্ত এলাকায় এবং কাপ্তাই লেক এলাকায় এদের বেশি দেখা যায়। এই প্রজাতির গুইসাপ গাছে উঠতে পারে, অন্যগুলো আবার গাছে উঠতে পারে না," বলেন মো. নিয়ামুল নাসের।
তিনি জানান, এই প্রজাতির বাংলা নাম কালো গুইসাপ। এদের দেহের উপরিভাগ গাঢ় বাদামী অথবা কালচে রঙের। এগুলো সাধারণত দেশের পূর্ব, দক্ষিণ এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে পাওয়া যায়। ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলাতেও এদের দেখা গেছে।
এরা দক্ষ সাঁতারু। নদী ও খালের ধারের বন ও ঝোপের মধ্যে এই প্রজাতির গুইসাপকে দেখা যায়।কীটপতঙ্গ, মাছ, পাখি এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে কালো গুইসাপ।একটি প্রাপ্তবয়স্ক কালোগুইসাপ প্রায় দুই মিটার লম্বা হয়।
সরীসৃপ জাতীয় চতুষ্পদী এই প্রাণীকে রক্ষা করা খুবই জরুরি উল্লেখ করে অধ্যাপক নাসের বলেন, "গুইসাপ বাস্তুতন্ত্র এবং কনজারভেশনের জন্য খুবই জরুরি। ইকো-সিস্টেম তো আছেই, তবে সংরক্ষণ বেশি জরুরি। কারণ যদি খেয়ে ফেলে, পৃথিবী থেকে এই স্পেসিফিক প্রজাতি নাই হয়ে যাবে।"
প্রাণীবিদরা বলছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই নিরীহ প্রাণীটির অবদান অনেক বেশি।
গুইসাপ বিষধর সাপ ও ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসলের ফলন বৃদ্ধি করে।
এরা খাদ্যশৃঙ্খলে বিশেষ ভূমিকা রাখে। গুইসাপের সংখ্যা কমে গেলে এদের প্রধান খাদ্য পোকা-মাকড়ের সংখ্যা বেড়ে যাবে, ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যাবে এবং বিষাক্ত সাপের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে বলে জানান প্রাণীবিদরা।
অর্থাৎ ইকো-সিস্টেম রক্ষায় গুইসাপের ভূমিকা অনেক বলেন ঢাবির অধ্যাপক নাসের।
বর্তমানে ফসলের জমিতে পোকামাকড় দমনের জন্য উচ্চমাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, ফলে অনেক উপকারী অণুজীব ধ্বংস হয়ে যায় এবং মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। ফসলে সৃষ্টি হয় নিম্নমাত্রার বিষক্রিয়া যা মানুষকে ধীরে ধীরে ক্ষতি করে।
কিন্তু গুইসাপ কোনো ক্ষতি ছাড়াই এসব কীটনাশকের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করে। এরা মৃত জীব-জন্তু খেয়ে পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে বলে জানান প্রাণীবিদরা।

ছবির উৎস, Getty Images
বন্যপ্রাণী নিয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলে?
প্রকৃতি থেকে বন্যপ্রাণী ধরা বাংলাদেশের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে জানান খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা।
মি. মিঞা বলেন, "এটার ম্যাসেজ একটাই। বন্যপ্রাণী প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থায় থাকবে এবং এদের কেউ বিরক্ত করবে না।"
"বন্যপ্রাণী ধরা, মারা, হত্যা করা সম্পূর্ণ নিষেধ। বন্যপ্রাণী প্রকৃতিতে থাকবে। এদেরকে ধরলে বন্যপ্রাণী আইন ২০২৬ অনুযায়ী এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জেল হবে এবং অর্থদণ্ডও হতে পারে" বলেন এই বিভাগীয় বন কর্মকর্তা।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ এ বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত বেশ কিছু কাজে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাঘ ও হাতি শিকারে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে এই আইনে।
কোনো ব্যক্তি বন্যপ্রাণীর প্রতি কোনো নিষ্ঠুর আচরণ করিলে সেটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, "নিষ্ঠুর আচরণ" বলতে বন্যপ্রাণীকে আঘাত করা, উত্ত্যক্ত করা, চোখ বেঁধে রাখা, অপ্রয়োজনে আটক রাখা, ভয়-ভীতি দেখানোকে বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বোঝানো হয়েছে।
এছাড়াও, পরিবহনের ক্ষেত্রে কষ্ট দেওয়া মাত্রাতিরিক্ত ভার বহন করানো, বৈদ্যুতিক তারের বেষ্টনী দিয়ে হত্যা করা এবং এগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করলেও সেটি বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ বলে এই আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসাথে, একেক ধরনের অপরাধে একেক ধরনের শাস্তিও নির্ধারিত রয়েছে এই আইনে।
অপরাধভেদে শাস্তি ছয় মাস থেকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
আবার, একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ডও শাস্তি রয়েছে এই আইনে।
এছাড়া সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা জরিমানার বিধানও রয়েছে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ এ।








