'পুশইন-পুশব্যাক' ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়ন চেষ্টা কী ক্ষতির মুখে?

ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে দফায় দফায় লোকজন ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিএসএফ, ছবিটি প্রতীকী
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে গতকাল রোববার গভীর রাতে আরও একটি পুশ ইন চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দিতে টানা কয়েকদিন চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ার পর পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্তে জড়ো করা ব্যক্তিদের ভারতের ভেতরে সরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বিএসএফ।

এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যেই বিএসএফ ও বিজিবি'র মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় পড়েন না এমন ইতিমধ্যেই ৪৮০০ জন কথিত অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আরও ৮৩৬ জন হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছেন যাদের সীমান্তের ওপারে 'পুশ-ব্যাক' করবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে, বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যখন উভয় দেশের সরকারই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ ব্যক্ত করছে তখন হুট করে বাংলাদেশের সাথে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের সীমান্তে এতো পুশ-ইনের চেষ্টা হচ্ছে কেন।

আবার এই প্রশ্নও উঠছে, সরকারের দিক থেকে পুশ-ইন চেষ্টার ইস্যুটিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে কি-না।

সাবেক কূটনীতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তিস্তার পানি বণ্টন ও গঙ্গার পানি চুক্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। তার আগে দরকষাকষির ক্ষেত্রে চাপ তৈরির জন্যই পুশ ইনের ঘটনা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আজ সোমবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, পুশ ইন বন্ধ করার জন্য ভারতকে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

"ভারত সরকার যদি এগুলো সিরিয়াসলি নেয় তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে," পুশ-ইনের ঘটনাগুলোর কারণে দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার চেষ্টা ব্যাহত হবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছেন তিনি।

এর আগে বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, "আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী যে কোনো পুশ-ইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে"।

এটি ফুলবাড়ী সীমান্তের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এটি ফুলবাড়ী সীমান্তের ছবি

পুশ ইন হঠাৎ বাড়লো কেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দৃশ্যত অবনতি ঘটেছিল।

দুই পক্ষেই ভিসা কার্যক্রম স্থগিত ছাড়াও তখন দুই দেশেরই রাজনীতিবিদদের একাংশের বক্তব্য- পাল্টা বক্তব্যে টানাপোড়েন বেড়ে গিয়েছিল। এমনকি তখন দুই দেশেই হাইকমিশনার সামনে বিক্ষোভের ঘটনায় হাইকমিশনারদের পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনাও ঘটেছে ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর উভয় দেশের তরফ থেকেই আবার সম্পর্ক উন্নয়ন বা স্বাভাবিক করার দিকে অগ্রসর হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ পেতে শুরু করে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সফর ও প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে ফোনালাপসহ নানা উদ্যোগও দেখা গেছে গত তিন মাসে।

কিন্তু এর মধ্যেই গত মাসের শুরু থেকে সীমান্তে বিএসএফের একের পর এক পুশ-ইন চেষ্টা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিজিবি গত বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, তারা ২৪ ঘণ্টায় অন্তত দশটি জায়গায় এ ধরনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে।

বিশেষ করে ঝিনাইদহে যাদবপুর সীমান্ত, মহেশপুর সীমান্ত, যশোরের গোগা ও রোদ্রপুর সীমান্ত, জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেব সীমান্ত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত, ঠাকুরগাঁও সীমান্ত, নেত্রকোনা সীমান্ত, পঞ্চগড় সীমান্ত, সিলেটের উৎমাছড়া সীমান্ত এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে বিজিবি জানিয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সীমান্ত নিয়ে সরকারের দিক থেকে বিজিবিকে শক্ত অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এক সঙ্গে সীমান্তের এতগুলো জায়গা দিয়ে বাংলাদেশে লোকজন ঠেলে দেওয়ার চেষ্টার মধ্যে 'বিভিন্ন ধরনের বার্তা' থাকতে পারে।

বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে দুই দেশ যখন আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং উভয় সরকার যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার আগ্রহ প্রকাশ করছে তখন হুট করে সীমান্তের এতগুলো জায়গা দিয়ে পুশ-ইনের চেষ্টা অনেককেই বিস্মিত করছে।

সিলেট সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিজিবি'র সদস্যরা (প্রতীকী ছবি)

ছবির উৎস, Mehedi nur porosh

ছবির ক্যাপশান, সিলেট সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিজিবি'র সদস্যরা (প্রতীকী ছবি)

কারও কারও মতে, পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে বাংলাদেশের সাথে একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সেখানে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে বিএসএফকে ব্যবহার করে লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা 'স্বাভাবিক বিষয়' নয় বলেও অনেকে মনে করেন।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশি কেউ অবৈধভাবে সেখানে থাকলে ভারত সরকারের উচিত হবে প্রমাণসহ তাদের তালিকা দেওয়া।

যদিও একের পর এক পুশ-ইন চেষ্টা হলে সরকারের দিক থেকে সেটার শক্ত প্রতিবাদ হচ্ছে কি-না সেই আলোচনাও আছে রাজনৈতিক মহলে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারত সরকারকে চিঠি দেওয়া পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চলছে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন যে, দরকষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরির জন্য বিএসএফকে ব্যবহার করে পুশ ইন করার এসব চেষ্টা হতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, "অন্য কোনো কারণে বাংলাদেশের ওপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তার কাছে মনে হচ্ছে, কারণ ঘটনাগুলো এমন সময়ে হচ্ছে যখন উভয় সরকারই সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

"তিস্তা, গঙ্গার পানি, দুই দেশের সম্পর্ক- সবকিছু ঝুলে আছে। এখন সব বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। এ অবস্থায় এগুলো একটা বার্তাও হতে পারে। আমি মনে করি জাতীয় স্বার্থেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

আরেকজন বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন বলছেন, পুশ ইনের এই ঘটনাগুলো কিছুটা বিস্ময়কর কারণ এখন উভয় সরকারই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলছে।

"পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে কি-না সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। পুশ ইন হুট করে বেড়ে যাওয়ার পেছনের মূল কারণ কি সেগুলো বুঝতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। হয়তো তখনি দেখা যাবে যে এটা ছিল আসলে বাংলাদেশকে চাপে রাখার কৌশল," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

সীমান্তের অনেকগুলো জায়গা দিয়ে একই সময়ে পুশ ইনের চেষ্টা ব্যর্থ করার দাবি করেছে বিজিবি
ছবির ক্যাপশান, সীমান্তের অনেকগুলো জায়গা দিয়ে একই সময়ে পুশ ইনের চেষ্টা ব্যর্থ করার দাবি করেছে বিজিবি

পুশ ইন কী সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা হবে?

পুশ ইনের ঘটনাগুলো দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টাকে কোনোভাবে ব্যাহত করতে পারে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, "প্রতিটি ঘটনা আলাদা। কিন্তু এ ঘটনা যদি সীমান্তে ঘটে এবং ভারত সরকার যদি সিরিয়াসলি নেয় তাহলে আমাদের জন্য সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে"।

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় তিনি আরও জানান যে, পুশ-ইন বিষয়ে ভারতকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং বিজিবি সজাগ আছে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে চেন্নাই থেকে বাংলাদেশ ৩৪ জনকে ফেরত আনা হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, "বাংলাদেশে যদি ভারতীয় কোনো ইল্লিগ্যাল সিটিজেন থাকে বা ভারতে যদি বাংলাদেশের কোনো ইল্লিগ্যাল সিটিজেন থাকে, তাদেরকে ফেরত আনা এবং আমাদের ভারতীয়দের ফেরত দেওয়ার একটি মেকানিজম বিদ্যমান আছে।"

"সেই বিদ্যমান মেকানিজমটা, ডিপ্লোমেসিটা অবলম্বন করেই ভারতকে আমাদের সাথে কাজ করতে হবে এবং কথা বলতে হবে এবং বাংলাদেশও সেটা করবে" বলেন মিজ ওবায়েদ।

তিনি বলেন, "যত রকম ডিপ্লোম্যাটিক নর্ম আছে তা ফলো করছি। যখনি পুশ ইনের ঘটনা দেখছি আমরা তাদের চিঠি দিচ্ছি। আশা করবো ভারত সরকার এটা সিরিয়াসলি নিবে এবং যথাযথ ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে তারা সমাধান করবে"।

"পুশ ইনের মাধ্যমে যদি তারা করে তাহলে সেটা ভালো হবে না। ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্ক যে নতুন উচ্চতায় ওঠার চেষ্টা হচ্ছে বা তারাও যে প্যারাডাইম শিফটের সেটা করতে হলে এই কাজগুলোর জন্য যে বিদ্যমান প্রক্রিয়া আছে সেটাই দুই দেশকে অবলম্বন করা উচিত," বলছিলেন শামা ওবায়েদ।