হলুদ খাওয়ার উপকার নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো কতটা সত্য

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সারাহ বেল
- Role, বিবিসি গ্লোবাল হেলথ
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
বাংলাদেশের মাছের ঝোল, ভারতীয় চিকেন কারি, সুদানের উটের বিরিয়ানি, কিংবা মালয়েশিয়ার লাকসা - এই রান্নাগুলোয় একটা উপাদান থাকেই, আর সেটা হলো হলুদ।
খাবারকে সুস্বাদু করার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় এই মসলা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও কি অলৌকিক কিছু করতে পারে?
"আমার পরিবারের শিকড় পাঞ্জাবে, আর হলুদ ছাড়া কোনো খাবারের কথা আমি ভাবতেই পারি না," বিবিসির ফুড চেইন অনুষ্ঠানে বলছিলেন দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা খাদ্যবিষয়ক গবেষক ও পডকাস্টার রাগিনি কাশ্যপ।
হলুদের প্রায় ৩০টি জাত রয়েছে, যা এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার রান্নায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের সঙ্গে করে এর ব্যবহার পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের বালি ও ফিজি দ্বীপপুঞ্জ থেকে পশ্চিমে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
'জোরালো বার্তা'
কাশ্যপ জানান, আড়াই হাজার বছর আগের বিভিন্ন লেখাতেও হলুদের উল্লেখ পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এই মসলার জীবাণুনাশক ও প্রদাহনাশক গুণ রয়েছে বলে বদ্ধমূল বিশ্বাস অঞ্চলগুলোর বাসিন্দাদের।
"আমি অসুস্থ হলে প্রথমেই মনে হওয়া জিনিসগুলোর একটি এই হলুদ। এটা আমাকে খুব স্বস্তি দেয়। এর সাথে মিশে আছে কিছুটা আরাম, কিছুটা ওষুধ, আর কিছুটা নস্টালজিয়া," বলছিলেন বর্তমানে দুবাইয়ে বসবাস করা কাশ্যপ।
ভারতে এটি বিয়ের একটি অনুষ্ঠানেরও অংশ, যেখানে বিয়ের আগে সৌন্দর্য বাড়ানো জন্য বর ও কনের মুখে হলুদের প্রলেপ লাগানোর রীতি রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
পশ্চিমা বিশ্বের ভোক্তারা হলুদের নানা উপকারিতার বিষয়ে শোনার পর থেকে বিক্রি রকেটের গতিতে বাড়ছে।
হলুদের সাপ্লিমেন্টও বাজারজাত করা হচ্ছে। সাধারণত হলুদে কারকিউমিন নামের একটি যৌগ থাকে এবং স্বাস্থ্যের জন্য এটি উপকারী বলেই মনে করা হয়। হাড় ও জয়েন্ট ভালো রাখা থেকে শুরু করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো পর্যন্ত নানা উপকারের কথা বলে হলুদের সাপ্লিমেন্ট বিক্রির চেষ্টা করা হয়।
মানুষের হলুদ সেবনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নেওয়ার কারণেও আংশিকভাবে এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে মনে করেন কাশ্যপ।
"এক বিলিয়ন মানুষের বড় একটি অংশই যদি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে হলুদ অনেক ধরনের সমস্যা ঠিক করতে পারে, তাহলে সারা বিশ্বেই তা এক জোরালো বার্তা," বলেন তিনি।
"এর সঙ্গে যদি লবিং, সাপ্লিমেন্ট কোম্পানির মতো বিষয়গুলো যুক্ত করেন, তাহলে সেই বার্তা খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।"
'সবচেয়ে খারাপ রাসায়নিক গঠন'
তবে এর উপকারিতা নিয়ে সন্দেহও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
কারকিউমিন নিয়ে ১০০টিরও বেশি গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় কর্মরত রসায়নবিদ ড. ক্যাথরিন নেলসন।
"আমরা দেখেছি, দাবিগুলো এমন যে, এটি সবকিছুই করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, সম্ভবত তেমন কিছুই করে না," বলেন তিনি।
ড. নেলসন ব্যাখ্যা করেন, হলুদের সমস্যা এর রাসায়নিক গঠনের মধ্যেই থাকতে পারে, যার কারণে এটি নিয়ে গবেষণা করা সহজ নয়। এটি অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল এবং পরীক্ষায় হস্তক্ষেপকারী যৌগ হিসেবেও কাজ করতে পারে; যার অর্থ হলো, আদতে কাজ না করলেও পরীক্ষার ফলাফলে এমন মনে হতে পারে যে এটি কাজ করছে।
তিনি জানান, এটি শরীরে খুব ভালোভাবে শোষিত হয় না, আর মুখে খাওয়ার পরও এর খুব সামান্য অংশই রক্তসঞ্চালনে প্রবেশ করে। একে আরও ভালো করার চেষ্টায় অনেকেই কালো মরিচের সঙ্গে হলুদ খান।
"কোনো কিছুকে কার্যকর ওষুধে পরিণত করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের জন্য এটি সত্যিই অন্যতম বাজে রাসায়নিক কাঠামোগুলোর একটি", বলেন ড. নেলসন।

ছবির উৎস, Getty Images
'আমরা হতাশ হয়েছিলাম'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কয়েক দশক ধরে হলুদ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ফলাফল প্রায়ই পরস্পরবিরোধী এবং গবেষণাগুলোর মানও একরকম নয়।
যেসব গবেষণায় হলুদের উপকারিতার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়েছে তার অনেকগুলোই মানুষের ওপর পরিচালিত হয়নি বলে জানান অধ্যাপক অমিত গার্গ, তিনি কানাডার অন্টারিওতে অবস্থিত লন্ডন হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ।
এই চিকিৎসক ও তার সহকর্মীরা হলুদ নিয়ে এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় দুটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন।
প্রথম গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজমের অস্ত্রোপচার করা রোগীদের ক্ষেত্রে কারকিউমিন কিডনির ক্ষতি ও প্রদাহ প্রতিরোধ করতে পারে কি না, তা নির্ধারণ করা।
অ্যাওর্টা হলো শরীরের বৃহত্তম রক্তনালী, যা হৃৎপিণ্ড থেকে শরীরের বাকি অংশে রক্ত বহন করে। অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম হলো অ্যাওর্টার প্রাচীরে একটি অস্বাভাবিক স্ফীতি বা বেলুনের মতো ফুলে ওঠা।
কিন্তু ৬০০ রোগীকে নিয়ে করা ওই পরীক্ষায় তারা উপকারী প্রভাবের কোনো প্রমাণ পাননি।
এরপর তারা আরেকটি পরীক্ষা করেন। এটি কিডনির স্বাস্থ্যের উন্নতি করে কি না বা কিডনি রোগের অগ্রগতি ঠেকাতে পারে কি না তা দেখার জন্য কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কারকিউমিনের আরও ছোট একটি মাইক্রোপার্টিকল দিয়ে পরীক্ষা করেন। কিন্তু সেটারও কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারেননি।
"আমরা হতাশ হয়েছিলাম," বলছিলেন অধ্যাপক অমিত গার্গ।
"কারণ খোলা মন নিয়েই আমরা এই গবেষণা শুরু করেছিলাম; এটা যে কাজ করে না তা প্রমাণ করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না।"
কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে, বিশেষ করে ভারতে, ঔষধি উপাদান হিসেবে এটিকে ব্যবহারের ইতিহাসকে তাহলে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
ড. গার্গ বলেন, কোনো জৈব উপাদান থেকে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া একটি যৌগ আলাদা করে সেটিকে ওষুধে পরিণত করার চেষ্টা এবং পুরো জৈব উপাদানটি দিয়ে রান্না করা কিংবা তা ত্বকে ব্যবহার করার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে।
তাহলে কি বিশেষজ্ঞরা দামি সাপ্লিমেন্টগুলো কেনা সার্থক মনে করেন?
খরচের বিষয়টি ছাড়াও এগুলো কার্যকারিতার যথেষ্ট প্রমাণ নেই, বলেন অধ্যাপক গার্গ। তার ব্যাখ্যায়, অন্যান্য ওষুধজাত পণ্যের মতো প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যপণ্য একই ধরনের নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে না।
"আমি মনে করি, আমরা অবশ্যই খোলা মন রাখতে পারি। কিন্তু কোনো কিছুর নির্দিষ্ট প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করলে সেটি উচ্চমানের প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত - এটুকু মানদণ্ড আমাদের থাকা উচিত," বলেন তিনি।
তবে খাবারের অংশ হিসেবে মানুষ হলুদ খেলে তিনি কোনো সমস্যা দেখেন না।
"মানুষ যদি হলুদ দিয়ে তৈরি খাবার উপভোগ করেন, তাহলে আমি তা চালিয়ে যেতেই উৎসাহিত করব।"








