কোন পশু কোরবানি দেওয়া যাবে, আর কোনগুলো বৈধ হবে না

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN/AFP via Getty Images
ইসলাম ধর্ম বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদুল আযহায় কোরবানি দেওয়ার জন্য সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য তাজা ও সুস্থ পশু বেছে নেওয়ার বিধান আছে।
"হাদিসে বলা আছে আমাদের প্রিয় নবী এ ধরনের পশু কোরবানি দিয়েছেন," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফাসসির এবং হালাল সনদ বিভাগের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আবু ছালেহ পাটোয়ারি।
ঈদুল আযহা হলো মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব এবং এটি বাংলাদেশের মুসলিমদের কাছে কোরবানির ঈদ হিসেবেই বিশেষভাবে পরিচিত।
প্রতি বছর আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জিলহজ্জ্ব মাসের ১০ তারিখ ঈদুল আযহা পালন করা হয়। এ সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মুসলমানরা পশু কোরবানি করে থাকেন।
তবে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমের মধ্যে এই ঈদে কোরবানি দেওয়ার জন্য পশু বাছাইয়ে ভিন্নতা রয়েছে।
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, নবী আদম বা নবী ইব্রাহিমের সময় থেকেই পশু কোরবানি দেয়ার রীতি থাকলেও ইসলাম প্রচারের পর ঠিক কবে আর কীভাবে প্রথম কোরবানি দেয়া শুরু হয়েছে সেই সম্পর্কে নানা ধরনের মতামত রয়েছে।
তবে বিভিন্ন হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের অনেকে বলে থাকেন যে, হিজরতের পরে ইসলামের নবী মোহাম্মদ যে দশ বছর মদিনায় ছিলেন, সেই দশ বছরেই তিনি কোরবানি করেছেন।
ইসলাম ধর্মে কোরবানি পালনকে অবশ্য ফরজ বা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাভাবিক একজন মুসলমান যার সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা ও ব্যবসার পণ্য বা সম্পদ আছে তার জন্য ওয়াজিব ।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফতি আনিসুর রহমান শিকদার বলছেন, ''হযরত ইব্রাহীম (আঃ) জিলহজ্জ্ব মাসের দশ তারিখে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে তার প্রিয় সন্তানকে কোরবানি দিয়েছিলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তানের পরিবর্তে দুম্বা কোরবানি হয়েছিল।''
"এর প্রেক্ষিতেই হজের সময় হাজিদের কোরবানি তো দিতেই হবে। পাশাপাশি সারাবিশ্বের মুসলিমদের যার ওপর যাকাত প্রযোজ্য তার জন্য আল্লাহ কোরবানি ওয়াজিব করেছেন," বলছিলেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
কোন পশু কোরবানি দেওয়া যায়
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ঈদুল আযহায়, যা বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ বলেও বর্ণনা করা হয়, তাতে প্রতি বছর লাখ লাখ গরু কোরবানি হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার মতো পশু কোরবানি দেওয়া হলেও বাংলাদেশে গরু কোরবানি একটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু মুসলিম অবশ্য ছাগলও কোরবানি দিয়ে থাকেন।
অন্যদিকে আরব বিশ্বে উট, মহিষ ও দুম্বা কোরবানি দেয়ার প্রচলন বেশি। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোরবানির ঈদের দিন থেকে শুরু করে তিনদিন পর্যন্ত পশু জবাই করা যায়।
মুফতি আনিসুর রহমান শিকদার বলছেন কোরবানির কথা পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে এবং হাদিসের মাধ্যমে এর বিস্তারিত অন্য বিধি বিধানগুলো উঠে এসেছে।
তার মতে, "হাদিস অনুযায়ী এমন পশু কোরবানি দিতে হবে যা দেখলে মন জুড়িয়ে যায়"।
মুহাম্মদ আবু ছালেহ পাটোয়ারি বলছেন, হাদিসে বলা আছে রাসুল (সাঃ) সবসময়ে দুটা দুম্বা কোরবানি দিতেন।
"তিনি দুইটা শিং ওয়ালা নাদুস-নুদুস দুম্বা জবাই করেছেন আর বলেছেন একটি আমার উম্মতের পক্ষ থেকে একটা আমার পক্ষ থেকে," বলেছেন তিনি।
তারা উভয়েই বলছেন যে, ধর্মের বিধান অনুযায়ী, উট, গরু, দুম্বা, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ- এই ছয় ধরনের পশু দিয়েই কোরবানি দিতে হবে। এর বাইরে অন্য কোনো ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি করা বৈধ হবে না।
"পশুগুলো হতে হবে স্বাস্থ্যবান, নিখুঁত ও নিপুণ। অসুস্থ, ল্যাংড়া, খোঁড়া টাইপের পশু দিয়ে কোরবানি বৈধ হবে না। এছাড়া পশুগুলোর বয়স কেমন হতে হবে সেটিও সঠিকভাবে জেনে নেওয়া জরুরি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. পাটোয়ারি।
বিভিন্ন হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মুফতি মাওলানা আনিসুর রহমান শিকদার এবং মাওলানা মুহাম্মদ আবু ছালেহ পাটোয়ারি বলেছেন যে , ছাগল, ভেড়া, দুম্বা কমপক্ষে পূর্ণ এক বছর বয়সের হতে হবে।
অবশ্য এক বছর বয়সীদের মধ্যে ছেড়ে দিলে ছোটো মনে হবে না এমন হলেও কোরবানি দেওয়া যাবে।
তবে কমপক্ষে ছয় মাস বয়স হতেই হবে। এছাড়া উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর আর গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে।
বিভিন্ন হাদিসে কোরবানির জন্য যে উত্তম পশুর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তাতে মোটা ও মাংসল অর্থাৎ পশুটি মোটা, স্বাস্থ্যবান এবং মাংসে পরিপূর্ণ হওয়া উচিত বলে বলা হয়েছে।
পশুটি শারীরিকভাবে সুস্থ ও অক্ষত হতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
কোন পশু দিয়ে কোরবানি হবে না
মাওলানা আনিসুর রহমান শিকদার বলছেন, "যে পশুর একটিও দাঁত নেই, কান নেই ও শিং ভাঙ্গা সেই পশু দিয়ে কোরবানি হবে না"।
এছাড়া যে যে পশু দুই চোখ অন্ধ কিংবা একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি এক-তৃতীয়াংশ বা এর চেয়ে বেশি নষ্ট তা সেই পশু দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। আবার যে পশুর একটি কান বা লেজের এক-তৃতীয়াংশ কিংবা এর চেয়ে বেশি নেই সেটি কোরবানির উপযুক্ত হবে না।
"মনে রাখতে হবে যে পশু জবেহ করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তেমন পশু দিয়ে কোরবানি হবে না। তবে ভালো পশু কেনার পর এমন কোনো দোষত্রুটি দেখা দিলে সেটি দিয়ে কোরবানি দেওয়া যাবে," বলছিলেন মি. পাটোয়ারি।
সব মিলিয়ে চার ধরনের পশু কোরবানির জন্য এড়ানো উচিত বলে বিভিন্ন হাদিসে বলা হয়েছে। এগুলো হলোঃ খোঁড়া পশু, এক চোখ বিশিষ্ট পশু, রোগাক্রান্ত পশু এবং এমন কৃশকায় পশু যা কেউ পছন্দ করবে না।
ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, কোনো ব্যক্তির জন্য কোরবানির জন্য সবচেয়ে উত্তম পশু হলো উট। এরপর গরু বা ষাঁড়। উট ও গরুর ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির সাত ভাগের এক ভাগ কোরবানি দিতে পারে। একাধিক ব্যক্তি মিলেও উট, গরু বা মহিষ কোরবানি দিতে পারে।
এছাড়া না তাড়ালে যে যে পশু পালের সঙ্গে চলে না, জননাঙ্গ কাটা (জন্মগত না হলে) এবং দাঁত হারানো (জন্মগত না হলে) বা স্তনবৃন্ত কাটা বা দুধ বন্ধ হয়ে গেছে এমন পশু কোরবানি দেওয়া মাকরুহ বলে কিছু হাদিসে উঠে এসেছে।
মুফতি মাওলানা আনিসুর রহমান শিকদার বলছেন, কোরবানির পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় রীতির গুরুত্ব ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে বিবেচনা করতে হবে।








