ইরাক থেকে ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ

স্যটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে তেলের পাইপলাইন দেখা যাচ্ছে (বায়ে)

ছবির উৎস, Planet Labs PBC

ছবির ক্যাপশান, স্যটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে তেলের পাইপলাইন দেখা যাচ্ছে (বায়ে)
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যেই ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে।

ইরাক জানিয়েছে, তারা এ ঘটনায় একজন সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছে এবং তদন্ত শুরু করেছে।

দেশটি স্বীকার করেছে যে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে চালানো ড্রোন হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী তাদের একটি প্রদেশ থেকে পরিচালিত হয়েছিল।

সৌদি আরব এর আগে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে দেশটির তেল স্থাপনায় হামলার অভিযোগ করেছিল।

বারশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দিয়েছে। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক।

এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে।

ফলে বৈশ্বিক তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে।

শুক্রবার ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা কৌশলগত উপকূলীয় শহর মোকায় হুথি যোদ্ধাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর এক দিন আগে হুথিরা লোহিত সাগরের পুরো উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছিল।

সৌদি আরব শুক্রবার জানিয়েছে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে। একই সময়ে ওই স্থানের কাছে পোড়া মাটি ও ধোঁয়ার স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশিত হয়েছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলে গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল নেওয়ার দাবি করেছে

ছবির উৎস, EPA/Shutterstock

ছবির ক্যাপশান, হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলে গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল নেওয়ার দাবি করেছে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

রয়টার্স জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, সৌদি পাইপলাইনটি বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন করে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের পর সৌদি আরব আপাতত পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

সৌদি আরব বলেছে, তারা 'প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হামলা প্রতিরোধে' ইরাকি সরকারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে।

এক বিবৃতিতে সৌদি সরকার আরও বলেছে, "সৌদি আরব তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা, স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখা এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে"।

ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পৃথক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশের অপারেশনস কমান্ডারকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার পরই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয় যে, ড্রোন হামলাটি ওই অঞ্চল থেকেই পরিচালিত হয়েছিল।

এর আগে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরব তখন অভিযোগ করেছিল, এসব গোষ্ঠী ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, কাতার ও কুয়েতকে নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসিও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

বৈশ্বিক তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে
ছবির ক্যাপশান, বৈশ্বিক তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে

সংস্থাটির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই বলেন, "এই হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জন্য একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা এবং অগ্রহণযোগ্য হুমকি। এটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালারও স্পষ্ট লঙ্ঘন"।

এদিকে এই সপ্তাহে ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত অগ্রগতির ফলে তারা দেশটির উপকূলের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

হুথিরা দাবি করেছে যে তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের প্রবেশপথ।

তবে তারা জানিয়েছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া সব কোম্পানির জন্য সমুদ্রপথে নৌ চলাচল 'নিরাপদ'।

এরপর ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী পাল্টা হামলা চালায়। শুক্রবার মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, তারা মোকা শহর ও এর আশপাশে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, হামলায় বেশ কিছু যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস এবং বেশ কয়েকজন হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছে।

লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত কৌশলগত শহর মোকা বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। বৃহস্পতিবার হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। তাদের হামলার কারণে বহু মানুষ পালিয়ে এডেনে চলে যায়।

এডেনেই ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশীপ কাউন্সিল ও সরকার অবস্থিত।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূলীয় তাইজ গভর্নরেট এবং এর নিকটবর্তী ইব্ব গভর্নরেটে হুথি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে।

সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে

শনিবার জাতিসংঘ জানিয়েছে, জুলাই থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গত এক সপ্তাহেই এই সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ইয়েমেনে 'প্রতি ঘণ্টায় দ্রুত অবনতিশীল বাস্তুচ্যুতি সংকট' তৈরি হচ্ছে।

জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "পুরো পরিবারগুলো রাতের বেলায় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। যাওয়ার মতো তাদের কোনো নিরাপদ জায়গা নেই... তারা ক্লান্ত। তাদের সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ শুধু পরনের কাপড়টুকু নিয়েই পালিয়েছে"।

আরব উপদ্বীপের দুই দিকের এই পরিস্থিতি তেলের বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম গত জুলাই মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। এর ফলে সরকারি ঋণের খরচ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এনার্জি অ্যাসপেক্টসের রিচার্ড ব্রোঞ্জ বিবিসিকে বলেছেন, সর্বশেষ উত্তেজনা শুরুর আগেই সৌদি তেল সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে এবং পরে আফ্রিকা ঘুরিয়ে পরিবহন করতে গিয়ে জাহাজ চলাচলের সময় প্রায় ৩০ দিন বেড়ে গিয়েছিল। এতে পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত যে মজুত ও অতিরিক্ত সক্ষমতা তেলের বাজারকে এই সংকট সামাল দিতে সাহায্য করেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই শেষ হয়ে গেছে। তাই দুই সংকটই চলতে থাকলে তেলের দাম আরও বাড়বে।"

তার মতে, ডিজেলের বাজারে পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। ডিজেলের দাম ইতোমধ্যে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়বে, কারণ উৎপাদন ও পরিবহনে ডিজেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

তিনি আরও বলেছেন, "মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে ফিরে যেতে পারে, যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে দাম উঠেছিল। এবং এর চেয়েও বেশি হতে পারে"।