যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের প্রতি ইরানের জবাব 'পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য', বললেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডোনাল্ড ট্রাম্প
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিষয়ে ইরান যে জবাব দিয়েছে, সেটিকে বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি 'সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য'।

ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি বলছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পাঠানো তেহরানের প্রস্তাবে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না করার নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে যে যুদ্ধ শুরু করে, তা বন্ধে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। মাঝে মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে যুদ্ধবিরতি বজায় রয়েছে।

এর আগে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের যুদ্ধ 'খুব দ্রুত শেষ হবে'। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণ সরিয়ে না ফেলা পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলা যাবে না।

মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠান সিক্সটি মিনিটস-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "এখনও এমন কিছু সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো ভেঙে ফেলতে হবে।"

অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তেহরানের প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেছেন, "আমরা কখনও শত্রুর সামনে মাথা নত করব না। আলোচনা বা সংলাপের কথা উঠলেই তা আত্মসমর্পণ বা পিছু হটা বোঝায় না।"

ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, "আমি ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের জবাব পড়েছি। এটি আমার পছন্দ হয়নি-সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।"

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এক পাতার ১৪ দফা প্রস্তাবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত আছে।

তবে এসব শর্ত চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভরশীল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি তেল গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালি তেল গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এদিকে ইরান এখনও হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। অপরদিকে, তেহরানকে চাপ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ জারি রেখেছে, যা ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। এরপর গত মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু আরও বলেছেন, ইসরায়েলের সামরিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা ধীরে ধীরে শূন্যে নামিয়ে আনতে চান তিনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়।

নেতানিয়াহু বলেন, "এখনই শুরু করা উচিত এবং আগামী এক দশকে আমরা এই সহায়তা থেকে নিজেদের মুক্ত করব।"

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় না করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে 'কঠোর পরিণতির' মুখোমুখি হতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এ তথ্য জানিয়েছে।

আকরামিনিয়া আরও বলেন, "আমেরিকানদের তাদের নৌবহর দিয়ে উত্তর ভারত মহাসাগরের এই বিশাল অঞ্চল প্রকৃত অবরোধে আমরা পরিণত হতে দিতে পারব না"।

তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে চলমান যুদ্ধে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে।

বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ সাধারণত এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

হরমুজ প্রণালীর চিত্রসম্বলিত একটি বিলবোর্ড, যার ওপর ফারসি ভাষায় লেখা রয়েছে—"চিরকাল ইরানের হাতে"।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালীর চিত্রসম্বলিত একটি বিলবোর্ড, যার ওপর ফারসি ভাষায় লেখা রয়েছে—"চিরকাল ইরানের হাতে"

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতে ইরান প্রণালিটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইরান এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে হামলাও চালিয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

শনিবার নৌবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল সুরক্ষার মিশনে অংশ নিতে পারে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাঁক্র এই নৌ-নিরাপত্তা উদ্যোগের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। স্টারমার বলেছেন, ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পরই কেবল এ মিশন বাস্তবায়ন করা হবে।

এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান রোববার সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ফ্রান্স বা ব্রিটেন কোনো বাহিনী মোতায়েন করলে 'তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব' দেওয়া হবে।

তবে ম্যাঁক্র পরে বলেন, ফ্রান্স কখনও সরাসরি নৌ মোতায়েনের কথা ভাবেনি, বরং ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নিরাপত্তা মিশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের বিরুদ্ধেও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান।

 হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালি

যুক্তরাজ্যের ম্যারিটাইম ট্রেড অপারেশন্স জানিয়েছে, কাতারের দোহার উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ছোট আকারের আগুন লাগলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

পরে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছে যে, জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী ছিল এবং সেটি মার্কিন মালিকানাধীন।

রোববার কুয়েতও জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশ করেছিল এবং সেনাবাহিনী তা প্রতিহত করেছে। কয়েক ঘণ্টা পর সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, ইরান থেকে আসা দুটি ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল সুরক্ষায় যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে সোমবার ৪০টির বেশি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠকে বসছেন।

বৈঠকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এবং ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথেরিন ভট্রিন যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন। যুদ্ধ বন্ধ হলে কীভাবে সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে জোটভুক্ত দেশগুলো সেখানে পরিকল্পনা তুলে ধরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে গত ৬ই মে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, "ইরান যদি চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে বোমা হামলা শুরু হবে এবং তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বড় ও ভয়াবহ হবে"।