বৈষম্যের অভিযোগে কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসালেন ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, নাদাইন ইউসিফ
- Role, টরোন্টো
- Author, ফ্রান্সিসকো ভেলাসকেজ ও পিটার হসকিন্স, ব্যবসাবিষয়ক সংবাদদাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
কানাডা থেকে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য ও অ্যালকোহলের প্রতি কানাডা "অসম আচরণ" করায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ওয়াইন, হকি স্টিক, সিমেন্টসহ বিভিন্ন ভোগ্য ও শিল্পপণ্যের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবে জ্বালানি, পটাশ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও মাছসহ কয়েকটি প্রধান রপ্তানি পণ্য এ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
এর জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা "আরও জোরদার" করতে কানাডা প্রস্তুত।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, আগামী ৩০ দিনের মাঝে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে।
যেসব পণ্য নতুন শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ'র আওতায় থাকুক বা না থাকুক, নতুন শুল্কের তালিকায় থাকা সকল পণ্যের ওপরই এই শুল্ক কার্যকর হবে।
এর ফলে উত্তর আমেরিকার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা আরও বেড়ে যাবে।

ছবির উৎস, Getty Images
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে কার্নি বলেন, "কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো চুক্তি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক শুল্ক আরোপের যে একতরফা বাণিজ্য পদক্ষেপ শুরু করেছিল, শুল্ক আরোপের নতুন এই সিদ্ধান্ত তারই ধারাবাহিকতা।"
মার্ক কার্নি আরও বলেন, "কানাডার সার্বভৌমত্বের প্রতিও হুমকি" দেওয়া হচ্ছে।
এর মাধ্যমে তিনি সম্ভবত ট্রাম্পের সেই বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে ট্রাম্প প্রকাশ্যে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছিলেন।
দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্কসহ বেশ কিছু বাণিজ্যিক বাধা ছিল। সোমবার ঘোষিত নতুন আমদানি শুল্ক সেই বাধা আরও বাড়িয়ে দিল।
বর্তমানে কানাডার স্টিল (ইস্পাত), অ্যালুমিনিয়াম ও কপারের (তামা) ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এছাড়া, কানাডার সফটউডের ওপর ৩৫ শতাংশ এবং গাড়িতে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তৈরি যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কও আরোপ করা হয়েছে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কিছু ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও যানবাহনের ওপর কানাডাও ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।
এর আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ায় কানাডার পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবেন। সেই হুমকির পরপরই সোমবার নতুন এই শুল্কের ঘোষণা দেওয়া হলো।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তবে সোমবার ট্রাম্প যে নির্বাহী আদেশগুলোতে সই করেছেন, সেখানে কানাডার দাবানলের কোনো উল্লেখ নেই।
বরং তিনটি ঘোষণায় গাড়ি, দুগ্ধপণ্য ও মদ নিয়ে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক বিরোধগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দুই দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
গাড়ির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অভিযোগ, ইউএসএমসিএ চুক্তির আওতার বাইরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর কানাডা কর আরোপ করে।
তার বক্তব্য, এটি "অযৌক্তিক" এবং কানাডা অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের কর আরোপ না করে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে।
উত্তর আমেরিকায় গাড়ি তৈরির শিল্পে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
তবে ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক অতীতে বলেছিলেন, তিনি মনে করেন যে এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই আগে দেখা উচিত, আর কানাডার স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের পরে।
ট্রাম্পও এর আগে একাধিকবার বলেছেন, গাড়ি শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে, দুগ্ধপণ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কানাডার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নীতির বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ কানাডা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি বিদেশি দুগ্ধপণ্য আমদানি করতে দেয় না। সেই সীমা ছাড়িয়ে আমদানি করলে ৩০০ শতাংশেরও বেশি শুল্ক দিতে হয়।
সবশেষে, গত বছর থেকে কানাডার বেশিরভাগ প্রদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রির ওপর যে বয়কট চলছে, সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠেছে।
কানাডার প্রাদেশিক প্রধানরা বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ধাতু ও গাড়িশিল্পসহ কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ওপর আরোপিত শুল্ক তুলে নেয়, তাহলে তারা এই বয়কট তুলে নেবেন।
এদিকে, কানাডার বাণিজ্য আলোচকরা এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা কিছু শুল্ক কমানো যায়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি হোয়াইট হাউজ ও কানাডা সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, বর্তমান শর্তে ইউএসএমসিএ চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।
কানাডা ও মেক্সিকো চুক্তিটি নবায়নের পক্ষে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এতে পরিবর্তন আনতে চায়। অথচ এই চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছিলো ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য আগামী আরও এক দশক ধরে এই চুক্তির আওতায় চলবে। তবে প্রতি বছর এটি পর্যালোচনা করা হবে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) ব্যবহার করে ট্রাম্পের আরোপ করা ব্যাপক আন্তর্জাতিক শুল্ক বাতিল করে দেয়।
আদালত রায়ে জানায়, জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত ওই আইনের আওতায় শুল্ক আরোপ করে প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিলেন।
তখন হোয়াইট হাউজ জানিয়েছিল, আমদানি শুল্ক আরোপের জন্য তারা অন্য আইনি পথ ব্যবহার করবে।
সোমবারের শুল্ক ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ ধারার আওতায় আরোপ করা হচ্ছে। এই ধারা জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য নয়, বরং বাণিজ্যে বৈষম্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের প্রধান ক্যান্ডেস লেইং এই শুল্ক আরোপকে "দুঃখজনক সিদ্ধান্ত" বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে, অর্থাৎ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে, আলোচনায় অর্থবহ অগ্রগতি অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্টিলড স্পিরিটস কাউন্সিলের প্রধান ক্রিস সোয়ঙ্গারও দুই পক্ষকে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তার সতর্কবার্তা, এই সিদ্ধান্তের জেরে পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।








