ঘোষণার পরেও নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারিতে দেরি হচ্ছে কেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
"এক সপ্তাহের জায়গায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গেজেটের কোনো খবর নাই। সেজন্যই সবার মধ্যে একটা উদ্বেগ কাজ করছে যে, আবার কোথায় আটকালো!," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি একজন কর্মকর্তা।
তিনি যে উদ্বেগের কথা বলছেন, সেটি তৈরি হয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়াকে কেন্দ্রে করে।
কর্মকর্তারা বলছেন, পাঁচ বছর পর পর তাদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করার কথা থাকলেও গত দশ বছর সেটি হয়নি।
সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত পহেলা সেপ্টেম্বর নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করে বাংলাদেশের সরকার। মন্ত্রসভায় অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি জানানোও হয়। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সেটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হতে পারে বলে তখন ইঙ্গিত দিয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেলেও নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
যদিও প্রজ্ঞাপন জারি নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই বলে জানাচ্ছেন সাবেক আমলারা।
"মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পর গেজেট প্রকাশের জন্য যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেখানে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি অনেক সময় মাসও লেগে যেতে পারে। কিন্তু এবার বিষয়টি ঘিরে হতাশা দেখা যাচ্ছে, যেহেতু অনেকদিন পর পে-স্কেলের ঘোষণাটা এসেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, যিনি বিগত অর্ন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর খসড়াটি অর্থমন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মন্ত্রণালয় দু'টির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে যে, খসড়াটি এখনও আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে যায়নি, বরং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছেই আটকে আছে।
কেন গত দুই সপ্তাহ ধরে খসড়াটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে? যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করে নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে কতদিন সময় লাগতে পারে?

ছবির উৎস, BD PMO
অতীতে কেমন সময় লেগেছে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
চলতি বছরের আগে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে।
ওই বছরের সাতই সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপর একই বছরের ১৫ই ডিসেম্বর, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন মাস পর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এত সময় লাগার কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য প্রশাসনিক ও আইনগত বেশকিছু প্রস্তুতি এবং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এর মধ্যে প্রথম ধাপটিই হচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া প্রস্তুত করা। সেই কাজ করে থাকে অর্থ মন্ত্রণালয়।
"নতুন পে-স্কেলের অনুমোদন চেয়ে যে খসড়াটা মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়, সেখানে মূলত মোটাদাগে কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে, সেটার একটা প্রস্তাবনা থাকে। কিন্তু অনুমোদন পাওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাদের ক্ষেত্রে কীভাবে সেটি বাস্তবায়িত হবে, সেটার হিসাবটা কী হবে- এসব বিষয়গুলোর বিস্তারিত বর্ণনা ও নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
এক্ষেত্রে জনপ্রশাসনের বাইরে সেনা-নৌ ও বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর করা হবে, খসড়ায় সেটারও বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়।
"আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে অনেক সময় এসব কাজ করতেই বেশ খানিকটা সময় লেগে যায়," বলেন মি. উল্ল্যাহ।
বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেটি পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় সংবিধান বা চাকরি সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের ব্যত্যয় বা বিরোধ আছে কি-না, সেটি খতিয়ে দেখা হয়।
সেইসঙ্গে, প্রজ্ঞাপনের খসড়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ, বাক্য এবং আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা আছে কি-না, সেটাও খতিয়ে দেখা হয়। এটি করা হয়, যাতে পরবর্তীতে কোনো আইনি জটিলতা বা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ না থাকে।
পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য যেসব বিধিমালা বা সংবিধিবদ্ধ আদেশ জারি করার প্রয়োজন হয়, সেগুলোর খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়।
"এসব প্রক্রিয়া শেষ করে প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো," বলেন সাবেক সচিব মি. উল্ল্যাহ।
প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া হাতে পাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মুদ্রণের জন্য সেটি পাঠান সরকারি মুদ্রণালয়, তথা বিজি প্রেসে। মুদ্রণের পর সেটি সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

ছবির উৎস, Getty Images
খসড়া পায়নি আইন মন্ত্রণালয়
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। কিন্তু নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এখনও আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।
"গত সপ্তাহ আমরা শুনেছিলাম যে, দুই-এক দিনের মধ্যেই অনুমোদিত পে-স্কেলের ড্রাফটটা ভেটিংয়ের জন্য আমাদের কাছে পাঠানো হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা আমাদের হাতে আসেনি," রোববার বিকেলে বিবিসি বাংলাকে বলেন নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা।
খসড়াটি এখন রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার দুই সপ্তাহ পরও সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে কেন?
"এটা আসলে আটকে রাখার বিষয় না। গেজেট আকারে প্রকাশ করার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি এবং প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেগুলো মেনে কাজ করতে একটু সময় লাগছে," বলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।
মূলত এখন সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে বলে জানা যাচ্ছে।
"দ্রুতই ভেটিংয়ের জন্য এটা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, তারপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে," বলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা।

কার কত বেতন বাড়ছে?
এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন যে বেতন কাঠামো পাচ্ছেন, সেখানে তাদের অনেকে বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম থেকে ১১ তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে একশো শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ তাদের বেতন এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ হচ্ছে।
অন্যদিকে, সর্বনিম্ন গ্রেড বা ২০তম গ্রেডে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।
ফলে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর তাদের মূল বেতন দাঁড়িয়েছে সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন নির্ধারিত হয়েছে সর্বোচ্চ এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন এই পে-স্কেল মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন বেতন কাঠামোটি চলতি বছরের পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলেও জানানো হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই মাস হিসাবে ধরেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন।
প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এমন বেতন-ভাতা দিতে সরকারের বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

ছবির উৎস, Getty Images
এর আগে, ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান এর নেতৃত্বে 'জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫' গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এছাড়া বৈশাখি ভাতার হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ এবং যাতায়াত ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ব্যাপক সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি বছরের ২১শে এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
সেই কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর অনুমোদন দেয় তারেক রহমানের সরকার।








