আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিশ্ববাজারে কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সেভাবে কমে না কেন?
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও সেটার দাম বাড়তে দেখা যায়। কিন্তু দাম যখন কমে, তখন সেটির প্রভাব খুব একটা দেখা যায় না বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন ক্রেতারা।
তাদের এই অভিযোগ যে একেবারে অমূলক নয়, সেটির পক্ষে বিভিন্ন সময় নানান তথ্যপ্রমাণও সামনে আসতে দেখা গেছে।
ক্ষমতাগ্রহণের পর গত সাত মাসে তিন দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বিএনপি সরকার। এর মধ্যে সবশেষ দাম বাড়ানো হয়েছে গত ২০শে সেপ্টেম্বর, যা পরদিন থেকে কার্যকর হয়েছে।
এ দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে একলাফে ২০ টাকা বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলে দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কিন্তু এমন একটি সময় এই বাড়ানো হয়েছে, যখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম আগের চেয়ে আট মার্কিন ডলার কমে ১০১ ডলারে নেমে এসেছে।
কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার পরও বাংলাদেশ সেটির প্রভাব সেভাবে দেখা যায় না কেন? কোন বিবেচনায়, কীভাবে এখানে তেলের দাম নির্ধারিত হয়?
দাম নির্ধারণের যত প্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়মিতভাবেই ওঠা-নামা করে।
কেনার পর আমদানিকারক দেশগুলো বেশকিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিজেদের বাজারে ওই তেলের একটি সরবরাহ মূল্য বা খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।
খুচরা পর্যায়ে তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রধানত তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সেগুলো হলো: মূল্য সমন্বয়, সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ এবং একদর পদ্ধতি।
এর মধ্যে বেশিরভাগ দেশেই 'মার্কেট ডিটারমাইন্ড' বা বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করে তেলের প্রতি লিটারের বিক্রি মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
এর বাইরে, কিছু দেশে একটি 'প্রাইস সিলিং' বা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়।
এছাড়া কোথায়ও কোথাও ফিক্সড প্রাইস বা একদর পদ্ধতি অনুসরণ করেও তেলের দাম নির্ধারিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তেলের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যা হুট করে পরিবর্তনের সুযোগ সেভাবে থাকে না।
বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত একদর পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম ঠিক করে আসছিল দেশটির সরকার। দাম নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে।
আইন অনুযায়ী, প্রতিবার দাম বাড়ানোর আগে তাদেরকে প্রায় তিনমাস সময় নিয়ে গণশুনানি করতে হতো। সেখানে যুক্তি-তর্ক শেষে একটি দাম নির্ধারিত হতো।
তবে তেলের দামের ওঠা-নামা বরাবরই নির্ভর করে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম বাড়লে বাংলাদেশেও যেমন বাড়ানো হয়, তেমনি মূল্য কমলে এখানেও দাম কমাতে দেখা গেছে।
তবে বিভিন্ন সময় দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, পরবর্তীতে সেভাবে কমতে দেখা যায়নি।
যেমন: বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে ২০২২ সালের পাঁচই অগাস্ট রাতে সারাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল তৎকালীর আওয়ামী লীগ সরকার।
তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা, অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা আর পেট্রলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়।
সেই সময় বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম নেমে এসেছিল ৯৫ ডলারে। তার কয়েক সপ্তাহ আগে অবশ্য ব্যারেল প্রতি তেলের দাম উঠেছিল ১২৯ ডলার পর্যন্ত।
মূল্যবৃদ্ধির সপ্তাহ তিনেক পর সব ধরনের তেলের দাম লিটারে কমানো হয়েছিল মাত্র পাঁচ টাকা।
কিন্তু পরবর্তীতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি অনেক কমে এলেও দেশের বাজারে দাম সেভাবে কখনোই কমানো হয়নি।
এখন নির্ধারিত হচ্ছে কীভাবে?
২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে নির্বাহী আদেশে ২০২২ সালের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেক বাড়িয়ে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
বিষয়টি তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। একপর্যায়ে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে বিইআরসি আইন সংশোধন করা হয় এবং 'বিশেষ পরিস্থিতি' উল্লেখ করে নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকার নিজের হাতে নিয়ে নেয়।
এ দফায় দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণশুনানির বদলে সমন্বিত মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু করা হয়। মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে তখন এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছিল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে ওই পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরু হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর দাম নির্ধারণের ক্ষমতা আবারও বিইআরসি'র কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সেইসঙ্গে, এটাও বলা হয় যে, বিইআরসি'র প্রবিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে।
"প্রবিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ২০২৫ সালে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনও অনুমোদন পায়নি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
ফলে বাস্তবে ফার্নেস ওয়েল এবং জেট ফুয়েল ছাড়া অন্য জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ এখনও সরকারের নির্বাহী আদেশেই হতে দেখা যাচ্ছে।
গত দুই বছর এক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও সর্বশেষ দাম বাড়ানোর সময় সেটিও মানা হয়নি।
দাম বেড়ে যায় যেভাবে
বাংলাদেশের সরকার বিদেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। কেনা থেকে শুরু করে দেশে আনা, সেটি পরিশোধনাগারে পাঠানো এবং পরিশোধন শেষে বাজারজাত করা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে নানান ধরনের ব্যয় হয়।
"এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো খাত আছে, যেগুলো খুবই অযৌক্তিক ব্যয়। অথচ সেই খরচের ভার পুরোটাই এসে পড়ে ক্রেতা সাধারণের ঘাড়ে," বলছিলেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোকে সরকারের তরফে 'মূল্য সমন্বয়' বলে অভিহিত করা হয়। সেই মূল্য সমন্বয়ের জন্য ২০২৪ সালে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা গাইডলাইন তৈরি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, যা সংশোধনের পর ২০২৫ সালের মে মাসে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়।
'জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা' নামের ওই গাইডলাইন অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের পর জাহাজে করে দেশে আনাসহ বিভিন্ন পরিবহন ব্যয়, পরিশোধনসহ অন্যান্য পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মুনাফা, পাম্প মালিক ও ডিলারদের কমিশন সহ বিভিন্ন ধরনের খরচ যুক্ত হয়।
এছাড়া অকটেন ও পেট্রল ব্যক্তিগত যানবাহনে অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হওয়ায় সেগুলো বিলাস দ্রব্য বিবেচনা করে ডিজেলের চেয়ে কিছুটা বেশি দাম রাখা হয়।
মূলত এসব কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রয়মূল্যের চেয়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেশি দেখা যায়।
"কিন্তু তেল আমদানির পর থেকে বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবে ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপ করা হয়, সেটি তুলে নিয়ে এবং সরবরাহ পর্যায়ে জ্বালানির চুরি ও অপচয় ঠেকানো সম্ভব হলে তেলের দাম অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব," বলেন অধ্যাপক আলম।
এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন যে মুনাফা নিচ্ছে, সেটির সমালোচনা করেন ক্যাবের এই জ্বালানি উপদেষ্টা।
"সরকার বলছে, জ্বালানি তেলে তারা ভর্তুকি দিচ্ছে। আবার অন্যদিকে, ভ্যাট-ট্যাক্স বসাচ্ছে, বিপিসিকে মুনাফা নিতে দেওয়া হচ্ছে- এমন দ্বৈত নীতি কেন? এটা বন্ধ করা উচিৎ," বলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
আবার বিপিসি মুনাফার অর্থের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে।
"যেমন-করোনা মহামারির আগে পাঁচ বছরে বিপিসি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছিল। পরে যখন সেটার হিসাব চাওয়া হলো, তখন তারা বললো যে, করোনা মহামারির ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য সরকারকে দেওয়া হয়েছে," বলছিলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন।
"কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জ্বালানিখাতের টাকা তারা অন্য কাজে ব্যয় করবে কেন? ওই টাকা দিয়ে যদি তখন তেল কিনে রাখা হতো বা জমানোও থাকতো, তাহলে তো এখন সেটা কাজে আসতো। বিপিসিকে অর্থের জন্য হাহাকার করতে হতো না," যোগ করেন অধ্যাপক হোসেন।
এছাড়া অনেক সময় সরকার নিজের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার জন্যও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে থাকেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকার কী বলছে?
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হাতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হলেও প্রবিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় তারা সেই ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না।
ফলে কার্যত জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করছে এখন মন্ত্রণালয়। বিইআরসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রবিধিমালার খসড়াও সেখানে আটকে রয়েছে।
"তারা এটার অনুমোদন দিয়ে দিলেই তখন আইন অনুযায়ী আমরা জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে ব্যবস্থা নিতে পারবো," বলেন বিইআরসি'র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, গত দুই বছর ধরে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে আসছিল বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু এ দফায় সেটি ঘটেনি।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করতে গেলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেত। সেজন্যই তারা এবার পদ্ধতিটি অনুসরণ করেননি।
কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরেও গত পাঁচ মাস দেশে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর ফলে গত মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
বিপুল পরিমাণ এই লোকসান কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি তেলের চোরাচালানের ঝুঁকি হ্রাসের কথা মাথায় রেখে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
"এমতাবস্থায় সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার স্বার্থে এবং প্রবাসী ভাইদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়কৃত জ্বালানি তেল যেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে যেন পাচার হয়ে যেতে না পারে সে কারণে সরকারকে এই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে" বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।