আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ম্যালেরিয়ার মতো জটিল রোগ কি শিশুদের মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে?
- Author, ইসাবেল শ
- Role, গ্লোবাল ডিজিটাল হেলথ
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
জোসেফ নাটেম্বো তখন মাত্র শিশু যখন সে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পরও বেঁচে যায়। ওই সময় তার ৫৪ বছর বয়সী মা মারিয়া স্বস্তি পেয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন সবচেয়ে খারাপ সময় সম্ভবত শেষ।
কিন্তু আরও অনেক বছর পরে, উগান্ডার সেই জোসেফের বয়স যখন ১৮ বছর, এখন কোনো কিছু শেখার ক্ষেত্রে সে নানান সমস্যায় মুখোমুখি হচ্ছে।
চিকিৎসকদের ধারণা, এটি শৈশবে তার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
জোসেফ গণিতে বিশেষভাবে দুর্বল এবং সংখ্যাকে সে 'বিভ্রান্তিকর' বলে মনে করে। এ কারণে তাকে এক বছর একই ক্লাসে আটকে থাকতে হয়েছে। তার মায়ের আশঙ্কা পড়াশোনায় এই দুর্বলতা ভবিষ্যতে সন্তানের চাকরির সুযোগ সীমিত করে দিতে পারে।
উগান্ডায় ১৪০০ শিশুর মস্তিস্কের কাজের ওপর ম্যালেরিয়ার প্রভাব জানতে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার একজন ছিল জোসেফ।
গবেষণাটির নাম- ম্যালেরিয়া ইমপ্যাক্ট অন নিউরোবিহ্যাভিওরাল ডেভেলপমেন্ট বা সংক্ষেপে মাইন্ড। এই গবেষণায় গুরুতর ম্যালেরিয়ার প্রভাব পরীক্ষা করা হয়।
জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (জেএএমএ)-এ প্রকাশিত এই নতুন গবেষণায় বলা হচ্ছে, জোসেফের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে গণিতে দুর্বলতা থাকা অস্বাভাবিক নয়; বরং এটি মারাত্মক রোগ থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের একটি প্রবণতা তুলে ধরছে।
একটি 'অদৃশ্য ক্ষত'
ম্যালেরিয়া হয় পরজীবীর কারণে, যা মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এখন পর্যন্ত যারা ম্যালেরিয়া থেকে বেঁচে গিয়েছেন, তাদের শেখার ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি।
কিন্তু গবেষণাটি দেখিয়েছে গুরুতর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মস্তিষ্কে এমন ক্ষতি হতে পারে যা বহু বছর পরে শেখার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ক্ষতকে "অদৃশ্য দাগ" বলে উল্লেখ করেছেন গবেষণার প্রধান লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. চ্যান্ডি জন।
তিনি বলেন, "প্রথম দেখায় হয়তো মনে হতে পারে শিশুটি ভালোই আছে। তবে পরীক্ষা করলে মস্তিষ্কজনিত ক্ষতি ধরা পড়তে পারে যা পরবর্তীতে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে স্পষ্ট হয়।"
কাম্পালার মেকেরেরে ইউনিভার্সিটির মনোরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক পল ব্যাঙ্গিরানার নেতৃত্বে উগান্ডায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এটি এমন শিশুদের ওপর পরীক্ষা চালায় যারা গুরুতর দুই ধরনের ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা নিয়েছিল।
২০০৮ সাল থেকে গবেষকরা এই শিশুদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যাচ্ছিলো– ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই শিশুদের চিন্তাশক্তি ও শেখার সক্ষমতায় দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
কিন্তু সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে, এই প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
গবেষণায় মোট ৯৩৯ শিশুকে আবার মূল্যায়ন করা হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া বা ম্যালেরিয়ার কারণে সৃষ্ট গুরুত্বর রক্তস্বল্পতায় ভোগার ১৫ বছর পরও রোগের প্রভাব রয়ে গেছে মস্তিষ্কে।
সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া হলো রোগটির সবচেয়ে ভয়াবহ একটি রূপ। এটি তখন ঘটে যখন সংক্রমিত রক্তকণিকা মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র রক্তনালিতে আটকে যায়, ফলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং মস্তিষ্ক ফুলে যায়।
এর ফলে রোগী কোমায় চলে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
অন্যদিকে তীব্র রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রে শরীর লোহিত রক্ত কণিকা উৎপন্ন করতে পারে না। ধারণা করা হয় প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ শিশু এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হয়, যাদের বেশিরভাগই সাব-সাহারান আফ্রিকায়।
কম আইকিউ
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের পরীক্ষা করে দেখা হয় তারা গণিত, কোনো কিছু দেখে দেখে পড়া, মনোযোগ ধরে রাখা এবং সর্বোপরি চিন্তা করার ক্ষেত্রে কেমন করছে।
দেখা গেছে, যারা গুরুতর ম্যালেরিয়া থেকে বেঁচে গেছে তাদের স্কোর যারা কখনোই এই রোগে আক্রান্ত হয়নি তাদের চেয়ে প্রায় তিন থেকে সাত আইকিউ পয়েন্ট কম।
ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেনস হসপিটালের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান ডা. অড্রে জন বলেন, "একটি শিশুর ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা পরিবর্তনের বিষয়টি খুব বড় করে নাও দেখা হতে পারে। কিন্তু যখন এটি লাখ লাখ শিশুর ক্ষেত্রে ঘটে তখন এটি একটি বড় আঘাত।"
শেখার ক্ষেত্রে ছোট পরিবর্তনও ভবিষ্যতের চাকরির সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। আর বৃহত্তর পর্যায়ে এটি একটি পরিবার, এমনকি পুরো দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, "বিশ্বের অর্ধেক শিশু এমন এলাকায় বাস করে যেখানে ম্যালেরিয়া আছে। অর্থাৎ বিশ্বের অর্ধেক শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে।"
গবেষকরা আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েছিলেন। তারপরও দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুরা গণিতে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে ছিল। তবে দেখে দেখে পড়ার দক্ষতা মোটামুটি অক্ষত ছিল।
চ্যান্ডি জন বলেন, "গণিতের দক্ষতা হলো এমন কিছু যা শিক্ষার্থীদের পরের ধাপে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন। তাই ম্যালেরিয়া তাদের মাধ্যমিক পর্যায় বা কলেজে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।"
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
স্কুলে সংগ্রাম
চার সন্তানের মা মারিয়া বলেন, জোসেফ অসুস্থ হওয়ার আগে আর দশটা শিশুর মতোই সে তার ভাইবোনদের সঙ্গে খেলতে ভালোবাসত।
২০০৯ সালে দুই বছর বয়সে একদিন জোসেফের তীব্র জ্বর হয়, সঙ্গে বমি শুরু হয়। পরে তার সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে।
এমন অসুস্থ হওয়া অনেক শিশুই মারা যায় বলে জোসেফের মা মারিয়া ভয় পেয়েছিলেন যে তার সন্তানও হয়তো বাঁচবে না।
হাসপাতালে কয়েক সপ্তাহ যাওয়া-আসার পর জোসেফ সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু সাত বছর বয়সে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় সমস্যাগুলো ধরা পড়তে শুরু করে।
জোসেফ মনে করে, গণিতে ভালো করতে না পারার কারণেই রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের মতো সংখ্যাভিত্তিক বিষয়গুলোও তার কঠিন লাগে।
মারিয়া বলেন, "তার ভাইবোনেরা সব বিষয়েই খুব ভালো করে, তাদের তুলনায় সে অতটা পারে না।"
জোসেফের পড়াশোনার মান নিয়ে চিন্তিত শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে মারিয়াকে বেশ কয়েকবার স্কুলে ডেকে পাঠিয়েছেন। এমনকি তিনি বাড়িতে অতিরিক্ত শিক্ষকের সাহায্য নেওয়ার পরেও, তার মনোযোগ কমে যাওয়ায় সে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তেই থাকল।
মারিয়া বলেন, "সে স্থির হতে পারত না… তার মনোযোগ থাকত না।"
ভাইবোনেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আশা করলেও জোসেফের জন্য তা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন তার মা।
তবে জোসেফ স্কুল ছাড়ার পর গাড়ির যন্ত্রাংশের ছোট ব্যবসা করতে চায়।
বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেননি কীভাবে সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া বা তীব্র রক্তস্বল্পতা চিন্তাশক্তির ক্ষতি ঘটায়।
এই গবেষণা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি যে গুরুতর ম্যালেরিয়াই মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণ। তবে রোগটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ও শেখার সমস্যার শক্তিশালী সম্পর্ক দেখিয়েছে।
গবেষণার পরবর্তী ধাপে এমআরআই ব্রেইন স্ক্যান ব্যবহার করে দেখা হবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ মস্তিষ্কের কোন অংশে কী প্রভাব ফেলে।
আগের গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর ম্যালেরিয়া পক্ষাঘাত, শরীরের বিভিন্ন অংশ নাড়ানো সংক্রান্ত সমস্যা এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এটি খিঁচুনি, দৃষ্টিশক্তি হারানো, আচরণগত সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশজনিত ব্যাধি বা এএইচডিএইচের সঙ্গেও যুক্ত।
একটি বৈশ্বিক সমস্যা
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২৮২ মিলিয়ন বা ২৮ কোটি ২০ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এবং ছয় লাখ ১০ হাজার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আগের বছর এই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৯৮ হাজার। মৃতদের বেশিরভাগই আফ্রিকার শিশু।
শতাব্দীর শুরু থেকে এ রোগে মৃত্যুহার কমানোর অগ্রগতি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অনেকটাই থেমে গেছে।
৪৭টি দেশ ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা পেলেও, ইথিওপিয়া, মাদাগাস্কার, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনসহ কিছু দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গরম ও আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে মশা বেশি বংশবিস্তার করে। ফলে রোগবাহী মশা আগে যেখানে ছিল না, সেখানেও ছড়িয়ে পড়ছে।
সাধারণ ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, পরজীবী ধ্বংসকারী ওষুধে প্রতিরোধ এবং তহবিল কমে যাওয়াও এর জন্য দায়ী।
ম্যালেরিয়া নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যেসব মানুষের আগে রোগটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি, তারা বেশি গুরুতরভাবে আক্রান্ত হতে পারে।
চ্যান্ডি জন বলেন, "দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে আমরা কিশোর ও তরুণদের মধ্যে বেশি গুরুতর ম্যালেরিয়া দেখছি।"
"তাদের শরীরে একই মাত্রার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি।"
প্রসঙ্গত, ম্যালেরিয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা এবং কাঁপুনি।
মারাত্মক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অবসাদ, খিঁচুনি, জ্ঞান হারানো, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ দেয় যে, এর মধ্যে কোনো একটি উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা সেবা নিতে হবে।
এরপর কী হবে?
দুটি ম্যালেরিয়া টিকা, যার মধ্যে আরটিএস,এস টিকাও আছে, যা শিশুদের গুরুতর ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সাব-সাহারান আফ্রিকায় চালু করা হয়েছে।
ইউনিসেফের মতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২৪টি আফ্রিকান দেশে চার কোটির বেশি ডোজ দেওয়া হয়েছে।
ডা. অড্রে জন বলেন, "এটা দারুন বিষয় যে আমাদের নতুন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আছে এবং আমরা শিশুদের জীবন বাঁচাচ্ছি।"
"কিন্তু এটুকু যথেষ্ট নয়। যে লাখো মানুষ ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের সুরক্ষা ও চিকিৎসার জন্যও আমাদের আরও ভালো করতে হবে।"