টিকা সংকট- বিবিসি বাংলাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টিকার স্বল্পতা নিয়ে কথা বলায় একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ক্লোজ করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এছাড়া, বরখাস্ত করার কথা বলেছেন জেলার সিভিল সার্জনকেও।

শুক্রবার ঢাকার কাছে মুন্সীগঞ্জে গিয়ে হাসপাতালে 'টিকা সংকটের দায়ে' সিভিল সার্জন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মন্ত্রীর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এই ঘোষণা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

যদিও প্রত্যাহার বা বরখাস্তের চিঠি এখনো পাননি বলে শনিবার জানিয়েছেন মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শনিবার বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, টিকা সরবরাহের দায়িত্ব যাদের, তাদের ব্যর্থতা সিভিল সার্জন বা কর্মকর্তাদের ওপর চাপানোর এই ঘটনা একটি বাজে দৃষ্টান্ত এবং এটি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মুন্সীগঞ্জের ওই হাসপাতালে জলাতঙ্ক টিকা সংকট নিয়ে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন সেখানে সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরাও। যে টিকা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, সেটা টাকা দিয়ে বাইরে থেকে কিনে আনার কথাও জানিয়েছেন তারা।

এদিকে, 'টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার' অভিযোগ তুলে মন্ত্রী একজন সিভিল সার্জনকে প্রকাশ্যে প্রত্যাহার বা বরখাস্ত করার কথা বললেও জানা গেছে, জেলাজুড়ে টিকার স্বল্পতার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আগেই জেলা পর্যায় থেকে জানানো হয়েছিল।

এরপর পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ না করে বরং স্বাস্থ্য বিভাগ নিজেই কয়েক মাস আগে তাদের জেলা অফিসগুলোকে অন্য মালামাল কেনার টেন্ডারের টাকা থেকে কিছু নিয়ে টিকা কেনার পরামর্শ দিয়েছিল।

যদিও ওই টাকার বড় অংশ ডিসেম্বরেই নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়ে গেছে।

মুন্সীগঞ্জের এই ঘটনা জলাতঙ্ক রোগের টিকার সংকটকে কেন্দ্র করে হলেও বাংলাদেশে কার্যত সব ধরনের টিকার সংকটের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সারাদেশে ব্যাপকভাবে শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার মধ্যেই সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকা অন্যান্য টিকার মজুত কতটা আছে তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এমনকি রাজধানী ঢাকার কোনো কোনো টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে পোলিও টিকা না পাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, অন্তত ছয় মাসের সব ধরনের টিকাই তাদের হাতে আছে।

"আমাদের স্টকে আছে। টিকার কোনো সংকট নেই। একটা টিকারও সংকট নেই। জলাতঙ্ক টিকার সংকট হয়েছিল। সেটা আমরা মোকাবিলা করেছি," গণমাধ্যমের সামনে বলেছেন তিনি।

জলাতঙ্কের টিকা ও মন্ত্রীর পরিদর্শন

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বাংলাদেশে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি চালু হয়েছিল ২০১১ সালে এবং ওই বছরেই বিনামূল্যে এই টিকা দেওয়া শুরু হয়েছিল।

কিন্তু ২০২৫ সালের শুরু থেকেই জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধের সরকারি টিকার (র‍্যাবিক্স-ভিসি) সংকট দেখা দেয়। তখন থেকেই দেশের অনেক জায়গায় কুকুর, বিড়াল কিংবা এমন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের শিকার ব্যক্তিদের নিজের টাকায় টিকা কিনতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা আলোচনায় আসছিল।

স্বাস্থ্যের কৌশলগত পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) না থাকায় এ সংকট তৈরি হয়েছিল।

অপারেশন প্ল্যান মূলত স্বাস্থ্যখাতে টিকা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কর্মর্সূচির পাঁচবছর মেয়াদি পরিকল্পনা। যেখানে পাঁচ বছরের কেনা-কাটাসহ সকল কার্যক্রমের পরিকল্পনা এবং এর জন্য কত টাকা লাগবে সেটি পাশ করা থাকে।

এই অপারেশন প্ল্যান নিয়ে অতীতে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ ছিল। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ওপি থেকে বেরিয়ে আসে। ফলে ওপি-তে যতগুলো কর্মসূচি ছিল, সবগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

পরে সরকার কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) এর মাধ্যমে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে টিকা কিনে আসছিল। কিন্তু গত বছরের শুরু থেকেই জলাতঙ্ক রোগের টিকার স্বল্পতা সামনে আসতে থাকে। জলাতঙ্ক একটি মরণব্যাধি যেখানে মৃত্যুর হার শতভাগ।

পাশাপাশি শিশুদের জন্য ইপিআইয়ের অধীনে যে ৯টি টিকা দেওয়া হয় তার মধ্যে বেশ কয়েকটি টিকার মজুত সাম্প্রতিককালে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমে আসে বলে জানান কর্মকর্তারাই।

যদিও গত বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিবিসি বাংলার এ সংক্রান্ত প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, "টিকার কোনো সংকট নেই"।

যদিও বৃহস্পতিবার রাতে বিবিসি বাংলার প্রবাহ অনুষ্ঠানে প্রচারিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জের একটি হাসপাতালে জলাতঙ্কের কোনো ভ্যাকসিন না থাকায় রোগীর স্বজনরা সেটি বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীর তখন বলেছিলেন যে, সংকটের কারণে টিকা সবাইকে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিবিসি সংবাদদাতা দেখেছেন যে, মুন্সীগঞ্জ শহরে কিছু হলেও টিকা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শহরের বাইরে উপজেলাগুলোতে কোনো টিকাই নেই।

এরপর শুক্রবার মুন্সীগঞ্জ হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। পরে তিনি অভিযোগ করেন যে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক 'অ্যান্টি স্টেট অ্যাক্টিভিটিতে পা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে"।

"সুপার সাহেব যেই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে- ইটস আ টোটাল ড্যামেজ টু দ্য গভর্নমেন্ট। টিকা নাই বলেছে, এটা একটা সাবোট্যাজ। শর্টেজ থাকলে আমাদের জানাবে, ডিজিকে জানাবে, ডিসিকে জানাবে। এমএসআর ফান্ড (ওষুধসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ফান্ড) আছে। এমপিগণ আছেন। উনি এমন ইন্টারভিউ দিতে পারেন না। আমরা সুপারিটেন্ডেন্টকে ক্লোজ করেছি," সাংবাদিকদের বলেছেন তিনি।

পরে পরিদর্শন শেষে এক সভায় তিনি জেলার সিভির সার্জন ও আরও একজন কর্মচারীকে বরখাস্ত করার কথা জানান।

একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, মন্ত্রী সিভিল সার্জনকে উদ্দেশ করে বলেছেন যে, তিনি ঘোষণা দিয়েছি যে ভ্যাকসিন আছে, এরপরও কর্মকর্তারা "সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন"।

তিনি আরও জানান, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকা কিনতে বলে চিঠি দেওয়ার পরও কেন কেনা হয়নি তা মন্ত্রী জানতে চেয়েছেন।

'মন্ত্রী বলেছেন আপনি ব্যর্থ'

সিভিল সার্জন কামরুল জমাদ্দার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে তিনি বরখাস্তের কোনো আদেশ পাননি, তবে মন্ত্রী তাকে সরাসরি টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছেন।

"টেন্ডারের টাকা থেকে টিকা কিনতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেইসব টেন্ডার ডিসেম্বরে হয়ে গেছে। তারপরেও জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলো চেষ্টা করেছে। মন্ত্রী বলেছেন জলাতঙ্কের টিকার অভাব নেই। অথচ সদর হাসপাতালে ২৬ ভায়েল (প্রতি ভায়েলে চারটি টিকা থাকে) টিকা আছে। অন্য জায়গায় নেই। আমরা আগেই ডিজি অফিসকে জানিয়েছিলাম সব। প্রতিমাসে পুরো জেলায় ২৬০০ ভায়েল টিকা দরকার হয়," বলছিলেন মি. জমাদ্দার।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জলাতঙ্কের টিকার সংকট থাকলেও জেলায় হামসহ শিশুদের অন্য টিকা এখন প্রয়োজন অনুযায়ী সবাই পাচ্ছে।

এদিকে সংকটের কথা সংবাদমাধ্যমে বলায় হাসপাতালের সুপারকে ক্লোজ করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং টিকা সংকটের দায়ে সিভিল সার্জনকে প্রত্যাহার কিংবা বরখাস্তের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে।

কয়েকটি জেলার সিভিল সার্জনের সাথে কথা বলে এমন ধারনা পাওয়া গেছে।

একজন সিভিল সার্জন বলেছেন, টিকার মতো জরুরি বিষয় সিভিল সার্জনরা জেলায় জেলায় কিনতে পারবে না। বরং কেন্দ্রীয়ভাবে এগুলো সারাদেশে বিতরণ নিশ্চিত করা উচিত কর্তৃপক্ষের।

"আমাদের কাজ হবে হাসপাতালগুলোতে মানুষ এসে যেন ঠিকমতো টিকা পায় সেটি নিশ্চিত করা। কেনার কাজ তো আমার হতে পারে না," বলছিলেন ঢাকার কাছেই একটি জেলার সিভিল সার্জন। তিনি তার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমদ বলছেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত।

"এমনিতে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা লোকবল, যন্ত্রপাতি, ঔষধ ও চিকিৎসা উপকরণের সংকটে থাকেন। টিকা কিনে পাঠানোর দায়িত্ব কেন্দ্রের। সেখানে ক্রয় বিষয়ে অভিজ্ঞ লোক থাকে। সিভিল সার্জন অফিস এটা করবে কেন?"

"নিজের ব্যর্থতার দায় কর্মকর্তাদের ওপর চাপানোর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ও কর্মকর্তারা জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে কাজ করতে অনুৎসাহিত বোধ করবেন," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।