মরক্কোর বিপক্ষে কষ্টার্জিত ড্র, কতদূর যাবে ব্রাজিল?

ছবির উৎস, IMAGN IMAGES via Reuters
- Author, সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
সর্বাধিক পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের যাত্রা শুরু করেছে। তবে শুরুটা আশানরুপ হয়নি। নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ সি এর প্রথম ম্যাচটিতে ব্রাজিল ১-১ গোলে ড্র করেছে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন মরক্কোর বিরুদ্ধে।
ব্রাজিল কেবল জয়বঞ্চিত হয়েছে তাই না, দলটির খেলা দেখে মনে হয়েছে, একটি পয়েন্ট পেতেও অনেক কষ্ট হয়েছে। ফলে, সমর্থকদের মধ্যে শংকা দেখা দিয়েছে যে, কিংবদন্তী কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে থাকা ব্রাজিল এই আসরে বেশিদূর যেতে পারবে না। অবশ্য, ফিফার সর্বশেষ র্যাংকিং- এ ছয়ে থাকা ব্রাজিলের জন্য সান্ত্বনা হচ্ছে বিপক্ষ মরক্কো কেবল আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নই নয়, র্যাংকিং এও সাত নম্বর দল। তদুপরি, আর্জেন্টিনা থেকেও অনুপ্রেরণা নিতে পারে দলটি। গত বিশ্বকাপে, ২০২২সালে কাতারে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে ২-১ গোলে হারার পরেও আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়।
রোববার নিউজার্সি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ব্রাজিলকে চাপে রাখে মরক্কো। ম্যাচের প্রথম দশ মিনিটেই মরক্কো ব্রাজিলের গোলপোষ্ট লক্ষ্য করে গোটা পাচেক শট নেয়, কিন্তু গোলরক্ষক আলিসন সহজেই সেগুলো প্রতিহত করেন। তবে, ২১ মিনিটের মাথায় ব্রাজিলের রক্ষণ ভেঙ্গে পড়ে। মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ দুই সেন্টারব্যাকের মাঝে দুর্দান্ত একটি থ্রু বল দেন ইসমাইল সাইবারিকে, যিনি ফাঁকা জায়গা পেয়ে আলিসনের মাথার ওপর দিয়ে গোল করেন।
খেলার ধারার অনেকটা বিপরীতেই ৩২তম মিনিটে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের দারুন দক্ষতায় সমতাসূচক গোল পায় ব্রাজিল। বাম প্রান্তে ব্রুনো গুইমারেসের সঙ্গে ওয়ানটু করে বল নিয়ে দ্রুত পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েন ভিনিসিয়ুস। এরপর জায়গা বের করে নিয়ে বক্সের বাঁ দিক থেকে ডান পায়ের এক জোরালো এবং চমৎকার বাঁকানো শটে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুকে পরাস্ত করে সোজা জালের ওপরের কোণায় বল জড়িয়ে দেন।
সমতা ফেরার পর দুইদলেরই কিছুটা রক্ষনশীল ফুটবল খেলায় বিরতির আগে আর তেমন সুযোগ তৈরী হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে খেলা হয়ে ওঠে আরও শারীরিক ও কৌশলগত। উভয় কোচ একাধিক পরিবর্তন আনেন, এবং জয়ের চেয়ে পরাজয় ঠেকিয়ে দেয়াটাই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে খেলার ধার অনেকটাই কমে যায়। মধ্যমাঠে মরক্কো নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং শেষদিকে ভালো সুযোগ তৈরী করে। তবে গোলরক্ষক আলিসন বেকারের দৃঢ়তায় ব্রাজিল এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারে।

ছবির উৎস, IMAGN IMAGES via Reuters
ব্রাজিলের পারফরম্যান্স: কে ভালো, কে খারাপ
ভিনিসিয়ুস জুনিয়: পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে উজ্জ্বল খেলোয়াড় ছিলেন ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদে খেলা ভিনিসিয়ুস। হাকিমির কড়া মার্কিংয়ের মধ্যেও বল পায়ে এলেই তিনি ছিলেন বিদ্যুৎগতি সম্পন্ন, এবং তার গোলটিই ব্রাজিলকে ম্যাচে ফেরায়। এই পারফরম্যান্সের জন্য তিনি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন।
ব্রুনো গুইমারে: ব্রুনো গুইমারায়েস সমতাসূচক গোলের জন্য ভিনিসিয়ুসকে বল সরবরাহ করেন, এবং সামনে এগিয়ে খেলার সময় তিনি সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করেন। তবে গুইমারেস বারবার উপরে উঠে যাওয়ার ফলে মাঝমাঠে যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল, মরক্কো তা সহজেই কাজে লাগায়।
রাফিনি: বার্সালোনার সুপারস্টার রাফিনিয়া এদিন ব্রাজিলের হয়ে ছিলেন নিষ্প্রভ। তাকে মাঠের ডানপ্রান্তে একেবারেই ছন্নছাড়া দেখাচ্ছিলো। বক্সের মধ্যে একটা ভালো সুযোগ পেয়েও তিনি সরাসরি গোলকিপারের দিকে দুর্বল একটি শট নেন।
কাসেমি: মধ্যমাঠের এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় খুবই নিষ্প্রভ ছিলেন এবং ম্যাচের প্রথমার্ধে তিনি হলুদ কার্ড দেখেন। বিরতির সময় তাকে উঠিয়ে নেয়া হয়। বদলি নামা ফাবিনহো কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন।
অ্যালিসন বেকার: ম্যাচের একদম শেষ দিকে (স্টপেজ টাইমে) মরক্কোর একটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তিনি ডাবল সেভের মাধ্যমে রুখে দেন, যা ব্রাজিলকে হারের হাত থেকে বাঁচায়।
আক্রমণভাগের একমাত্র স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগোও হতাশ করেছেন। প্রথমার্ধে একটি সহজ হেড সম্পূর্ণভাবে মিস করেন, যা ব্রাজিলকে এগিয়ে দিতে পারত, এবং পরে তিনি নিজেকে প্রমাণের তেমন সুযোগ পাননি। রক্ষণে রজার ইবানিয়েজও ভুগেছেন। মরক্কোর গোলের সময় তিনি পজিশনের বাইরে ছিলেন এবং সারাক্ষণই কিছুটা অস্থিরতা দেখিয়েছেন।
ব্রাজিলের সুপারস্টার নেইমার এই ম্যাচে অনুপস্থিত ছিলেন। কাফ ইনজুরি থেকে এখনো পুরোপুরি সেরে না ওঠায় তাকে খেলানো হয়নি, এবং আনচেলোত্তি জানিয়েছেন, হাইতির ম্যাচের আগে তাকে পাওয়া যাবে না।

ছবির উৎস, IMAGN IMAGES via Reuters Connect
মরক্কোর পারফরম্যান্স
মরক্কো এই ম্যাচে শুধু প্রতিরোধই করেনি, বরং দাপটও দেখিয়েছে। তারা শুরু থেকেই সতর্ক ও আক্রমণাত্মক খেলে, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং সুযোগ তৈরী করে। মরক্কোর শক্তিশালী পারফরম্যান্স আবার প্রমাণ করে যে, ২০২২ বিশ্বকাপে দলটির সেমিফাইনালে খেলা কোনো আকস্মিক ব্যাপার ছিলো না।
গত বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক বোনো এবারও ভালো ফর্মে। মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমিও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের রক্ষণভাগ খুবই দৃঢ় এবং ডিসিপ্লিন্ড। ব্রাজিলের দুইজন হলুদ কার্ড দেখলেও মরক্কোর কেউ ম্যাচটিতে হলুদ কার্ড দেখেনি। এইবারের আসরেও দলটি অনেকদূর যাবে বলে মনে হচ্ছে।
ম্যাচের পর মরক্কোর কোচ মোহামেদ ওয়াহবি বলেন, আনচেলোত্তির ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলা সহজ ছিল না এবং তারা তাদের কৌশলগত পরিকল্পনার অনেকটাই বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন।

ছবির উৎস, IMAGN IMAGES via Reuters Connect
গরম এবং আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ
ম্যাচের আগে থেকেই আলোচনায় ছিল আবহাওয়া। নিউ জার্সির গ্রীষ্মের তীব্র গরম এই ম্যাচে শারীরিক সক্ষমতাকে বড় ভূমিকায় ফেলেছিল বলে মরক্কোর কোচ স্বীকার করেছেন। তবে মরক্কো এই গরমের মধ্যেও শুরুতে দুর্দান্ত গতি ও তীক্ষ্ণতা দেখিয়েছে, যা প্রমাণ করে তাদের প্রস্তুতি ছিল যথাযথ।
ব্রাজিলের জন্য এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা। গরম আবহাওয়ায় উচ্চ-তীব্রতার খেলা ধরে রাখা কঠিন হবে। কাসেমিরোর মত অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের জন্য এই গরম ভোগান্তির কারন হয়েছে।
ম্যাচ শেষে আনচেলোত্তি নিজেই বলেছেন, "দলটি শেষ মিনিট পর্যন্ত প্রাণপণ লড়াই করেছে। আমাদের যে আরও ভালো করতে হবে তা স্পষ্ট... আমি হতাশ নই, তবে সন্তুষ্টও নই। কাজ করতে হবে। মরক্কো ভালো খেলেছে, এটি কঠিন ম্যাচ ছিল"।

ছবির উৎস, IMAGN IMAGES via Reuters
ব্রাজিলের সামনের পথ: কতদূর যেতে পারে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এই ম্যাচ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
প্রথমত, নেইমারের প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি ফিট হয়ে ফিরলে ব্রাজিলের সৃজনশীলতা ও আক্রমণের বৈচিত্র্য বাড়বে, যা মরক্কোর বিরুদ্ধে অনুপস্থিত ছিল।
দ্বিতীয়ত, মাঝমাঠের সমস্যা সমাধান জরুরি। কাসেমিরোর বয়স ও ফর্মহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্রুনো গুইমারায়েস ও ফাবিনহোর কম্বিনেশন বা অন্য বিকল্প খুঁজতে হবে আনচেলোত্তিকে। মরক্কো প্রথম ম্যাচে মাঝমাঠই শুধু নিয়ন্ত্রণ করেনি, এর প্রভাবে রক্ষণের উপরও দারুন চাপ পড়েছে।
তৃতীয়ত, ভিনিসিয়ুস একক ভরসা হতে পারবেন না। তার ব্যক্তিগত মানের ওপর নির্ভর করে দুই একটি ম্যাচ জেতা বা পয়েন্ট বাঁচানো সম্ভব, কিন্তু তা টুর্নামেন্ট জয়ের জন্য মোটেই যথেষ্ঠ নয়। রাফিনিয়া, পাকেতা ও কুনিয়াকে আরও কার্যকর হতে হবে।
চতুর্থত, গ্রুপ পর্বের পথ তুলনামূলক সহজ। পরের ম্যাচ ২০ জুন হাইতির বিরুদ্ধে ফিলাডেলফিয়ায়, যা ব্রাজিলের জন্য তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ এবং পয়েন্ট কুড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ। গ্রুপ সি থেকে নকআউটে যাওয়া কঠিন হবে না, যদি দল মাঝমাঠের সমস্যা ও গরমের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। তবে, এরজন্য দলটির খেলা আরো উন্নত করতে হবে এবং দলীয় সমন্বয় বাড়াতে হবে।
ব্রাজিল যদি প্রথম ম্যাচের ঘাটতিগুলো পোষাতে না পারে, তবে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগালের মতো দলগুলোর সাথে নকআউট পর্বে মুখোমুখি হলে আশাব্যাঞ্জক ফল করতে পারবে না।








