সই জাল মামলায় অভিষেক ব্যানার্জীকে জেরায় সন্তুষ্ট নয় সিআইডি

১১ই জুন সিআইডির দফতরে হাজিরা দিতে আসেন অভিষেক ব্যানার্জী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, ১১ই জুন সিআইডির দফতরে হাজিরা দিতে আসেন অভিষেক ব্যানার্জী
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের সই জাল করার অভিযোগের তদন্তে দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীকে একদিন জেরা করে সন্তুষ্ট না হওয়ায় আবারও তাকে তদন্তকারীদের মুখোমুখি হতে হবে। রোববার তাকে দ্বিতীয় দফায় জেরার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে রাজ্য পুলিশের সিআইডি।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা তাকে জেরা করেন সিআইডির তদন্তকারীরা। রাত প্রায় সাড়ে ১১টা নাগাদ অভিষেক বেরিয়ে আসেন সিআইডির দফতর থেকে।

তবে প্রথম দিনের জেরায় সন্তুষ্ট হননি কর্মকর্তারা, তাই রোববার তাকে আবারও হাজির হতে হবে তদন্তকারীদের সামনে।

দলীয় বিধায়কদের সই জাল করে পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেওয়া হয়েছে- এরকম একটি অভিযোগ বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা পড়ার পরে ওই ঘটনার তদন্তভার যায় সিআইডির হাতে।

মি. ব্যানার্জীকে জেরার জন্য একাধিকবার তলব করার পর, অবশেষে তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতায় সিআইডির প্রধান কার্যালয় ভবানী ভবনে হাজিরা দেন।

তবে নিজে থেকে জেরার মুখোমুখি হননি মি. ব্যানার্জী। গ্রেফতার হতে পারেন এই আশঙ্কায় আগাম রক্ষাকবচ চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন তিনি।

তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যেই তাকে জেরার মুখোমুখি হতে হবে বলে আদালতই নির্দেশ দেয়।

মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জির বাড়িতে সিআইডি

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জির বাড়িতে সিআইডি

রোববার অভিষেক ব্যানার্জীকে ফের তলব সিআইডির

বৃহস্পতিবার সিআইডির জেরায় অভিষেকের হাজিরা নিয়ে রীতিমতো নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশের পর বিকেল ৪টা ২০ নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছান তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। বিমানবন্দরের বাইরে বেরিয়ে আসতেই তাকে ঘিরে "চোর চোর" স্লোগান ওঠে।

অভিষেক নিজের গাড়িতে করে প্রথমে নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। তারপর সেখান থেকে যান ভবানী ভবনে।

পথে তার কনভয়ের সঙ্গে একটি বাসের ধাক্কা লাগে, যদিও তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেই জানা গেছে। নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট আগে বিকাল ৫টা ৫০ নাগাদ তিনি সিআইডির প্রধান কার্যালয় ভবানী ভবন পৌঁছান।

ডায়মন্ডহারবারের সংসদ সদস্যের হাজিরাকে কেন্দ্র করে কড়া নিরাপত্তা ছিল এদিন ভবানী ভবনে। প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

এদিন কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া দিতে দেখা যায়নি অভিষেক ব্যানার্জীকে। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ সেখান থেকে বেরিয়ে কালীঘাটে সোজা মমতা ব্যানার্জী বাড়ি যান তিনি।

মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে অভিষেক ব্যানার্জী - ফাইল

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে অভিষেক ব্যানার্জী - ফাইল

তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ কলকাতা হাইকোর্টের

বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি কৌশিক চন্দের বেঞ্চে সই জাল সংক্রান্ত মামলাটির শুনানি হয়।

বিচারপতি মি. ব্যানার্জীকে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়ে ভবানী ভবনে হাজিরার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন।

আদালত জানায়, বৃহস্পতিবারই মি. ব্যানার্জীকে তদন্তকারীদের মুখোমুখি হতে হবে। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ভবানী ভবন পৌঁছাতে হবে বলে জানায় আদালত।

পাশাপাশি আদালত আরও জানায়, অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে কোনো কড়া পদক্ষেপ এখনই নিতে পারবে না সিআইডি।

দুই সপ্তাহ পরে এই মামলার ফের শুনানি হবে। তার আগে অভিষেক ব্যানার্জীকে গ্রেফতার করা যাবে না বলে জানিয়ে দেয় আদালত। তারপরেই দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরেন মি. ব্যানার্জী।

দিল্লিতে ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠকে অভিষেক ব্যানার্জী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠকে অভিষেক ব্যানার্জী

কেন বারবার তলবে সাড়া দেননি অভিষেক ব্যানার্জী?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিধানসভায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে মনোনীত করার জন্য জমা দেওয়া একটি সরকারি নথিতে বেশ কয়েকজন তৃণমূল বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

নির্বাচনের পরে প্রধান বিরোধী দল হওয়ার ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলনেতাই বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার মর্যাদা পাওয়ার কথা ছিল।

সই জাল করার অভিযোগ জমা হওয়ার পরে হেয়ার স্ট্রিট থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। পরে সেই ঘটনার তদন্তভার যায় সিআইডির হাতে।

তারপর থেকে একাধিকবার মি. ব্যানার্জীর ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস ও তার কালীঘাটের বাড়িতে গিয়ে সমন দিয়ে আসেন তদন্তকারী অফিসাররা।

সিআইডি সূত্রে খবর, তৃণমূলের কিছু বিধায়ক দাবি করেছেন যে, তাদের অনুপস্থিতিতে দলীয় কার্যালয় থেকে তদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিধানসভার স্পিকারকে লেখা চিঠিতে অভিষেক ব্যানার্জীর স্বাক্ষর থাকায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়েছিল তদন্তকারী সংস্থা।

তলব করা হলেও তিনি তলব এড়িয়ে গেছেন বলে দাবি গোয়েন্দা সংস্থার। তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সময় চেয়েছেন বলে দাবি তাদের।

এর মাঝেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দিল্লি উড়ে যান তিনি। দেখা করেন রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও। রাজনৈতিক কারণে দিল্লি সফরের জন্য তিনি হাজিরা এড়িয়ে যান।

তার খোঁজে কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করে সিআইডি। তারপরেই গ্রেফতারির আশঙ্কায় হাইকোর্টে দ্বারস্থ হন অভিষেক ব্যানার্জী।

মমতা ব্যানার্জীর বাড়িতে সিআইডি তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলছেন কল্যাণ ব্যানার্জী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জীর বাড়িতে সিআইডি তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলছেন কল্যাণ ব্যানার্জী

মামলা থেকে সরে দাঁড়ালেন কল্যাণ ব্যানার্জী

অভিষেক ব্যানার্জীর হাজিরার টালবাহানার মাঝেই তৃণমূলের ভেতরে অভিষেক-বিরোধী সুর আরও প্রকট হয়। একাধিক সংসদ সদস্য ও বিধায়ক দলে তার ক্ষমতা চর্চা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

তা আরও স্পষ্ট করে দিলেন মমতা ব্যানার্জীর দীর্ঘ দিনের সতীর্থ ও লোকসভার সংসদ সদস্য আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জী।

বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে অভিষেক ব্যানার্জীর হয়ে হাজির হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু শুনানির আগেই তিনি মামলা থেকে সরে দাঁড়ান।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে কল্যাণ ব্যানার্জী জানান, অয়ন ভট্টাচার্য নামে এক আইনজীবী এই মামলা লড়ছেন বলে তাকে অভিষেক ব্যানার্জীর অফিস থেকে জানানো হয়েছে। তাকে আইনজীবী হিসাবে অসম্মান করা হয়েছে। তাই তিনি ভবিষ্যতে অভিষেক ব্যানার্জীর আর কোনো মামলা লড়বেন না।

তিনি অভিষেক ব্যানার্জীর ঔদ্ধত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তৃণমূল কংগ্রেসের হেরে যাওয়ার জন্য সরাসরি মি. ব্যানার্জীকেই দায়ী করেন।

পাশাপাশি তিনি মমতা ব্যানার্জী উদ্দেশে এও জানিয়ে দেন যে অভিষেক ব্যানার্জীকে যদি মিজ ব্যানার্জী দলে রাখেন তবে তিনি থাকবেন না।

দলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এনডিএকে সর্মথন করার কথা ঘোষণা করলেও মমতা ব্যানার্জীর পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন কল্যাণ ব্যানার্জী।

এবার তিনিও সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন।

'বিদ্রোহী' বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, 'বিদ্রোহী' বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী

সই জাল মামলাটি ঠিক কী?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কে পরিষদীয় দলনেতা হবেন, তা ঠিক করতে গত ছয়ই মে মমতা ব্যানার্জীর বাড়িতে বিধায়কদের একটা বৈঠক হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভায় এই সংক্রান্ত প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার কথা।

বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর নিয়ম মেনে সই করেন সমস্ত বিধায়কেরা। স্পিকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার নাম নিয়ে প্রস্তাবনাপত্র চাওয়া হয়।

এরপর ১৯শে মে আবার কালীঘাটে বৈঠক ডাকেন মমতা ব্যানার্জী। কিন্তু ওই দিন অনেকে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। সেদিন উপস্থিত সবার সই নেওয়া হয় দলের তরফে।

সমস্যার সূত্রপাত ওই প্রস্তাবনাকে ঘিরেই। বিধায়কদের সইতে অসংগতি আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এরপর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দেন যে তৃণমূলের টিকিটে বিধানসভা ভোটে জিতে আসা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকারের কাছে ওই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন।

তারপরই তৃণমূল কংগ্রেস ওই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করে।

এই দুই নেতাই বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় ৬০ জন নেতাকে নিয়ে আলাদা ব্লক তৈরি করেছেন। এবং মমতা ব্যানার্জীর মনোনীত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চ্যাটার্জিকে অস্বীকার করেছেন।

সই জাল অভিযোগ খতিয়ে দেখে মুখ্যমন্ত্রী মামলার তদন্তের ভার রাজ্য পুলিশের সিআইডিকে দেন। এই মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী।

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপ-দলনেতা এবং মুখ্য সচেতকের নাম প্রস্তাবনাপত্রে বিধায়কদের যে স্বাক্ষর রয়েছে তার মধ্যে বেশ কয়েকটা ইংরেজির ব্লক লেটারে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, তদন্তের সময় বিধায়কদের অনেকে জানিয়েছেন, তারা না কি ওই প্রস্তাবনায় সই-ই করেননি।