আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
আন্দোলন শেষ, এরপরে ককরোচ জনতা পার্টির ভবিষ্যৎ কী?
- Author, চন্দন কুমার জাজওয়াড়ে
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর নিজেদের প্রতিবাদ শেষ করেছে ককরোচ জনতা পার্টি। এখন দিল্লির যন্তর মন্তরের ছবি আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
নিউ দিল্লি মিউনিসিপাল কাউন্সিল বা এনডিএমসি কর্মীরা যন্তর মন্তরে গত এক মাস ধরে চলা বিক্ষোভের প্রতিটি চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করছেন।
একদিকে যেমন দেওয়ালের ওপর লেখা স্লোগানগুলো মুছে ফেলা হচ্ছে, অন্যদিকে এখানকার রাস্তাঘাটও পরিষ্কার করা হয়েছে।
সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে এবং তার সমর্থকেরা আগেই যন্তর মন্তর ছেড়ে চলে গেছেন। অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন যে তিনি শীঘ্রই তাদের ভবিষ্যৎ কৌশল ঘোষণা করবেন।
এখন প্রশ্ন, ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির যে লক্ষ্য ছিল তা কি পূরণ হয়েছে? এক মাস ধরে ভারতীয় রাজনীতির শিরোনামে থাকা সিজেপি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে হারিয়ে যাবে, নাকি তাদের কোনও ভবিষ্যৎ আছে?
এই প্রতিবেদনে, কিছু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে যে সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গ করে তৈরি হওয়া 'জেন-জি'দের এই মঞ্চটি আগামী দিনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে?
সিজেপি-র ভবিষ্যৎ কী?
প্রাথমিক ভাবে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি'র আন্দোলনটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক বলে মনে হলেও কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস (মমতা ব্যানার্জী গোষ্ঠী), শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী) এবং এনসিপি (শরদ পাওয়ার গোষ্ঠী)-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের মঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি, চলচ্চিত্র ও ক্রীড়া জগতের অনেক তারকাকেও সিজেপি-র পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।
জেএনইউ-এর সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজের অধ্যাপক ডঃ সুধীর কুমার বলেন, "সিজেপি এখনও তাদের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিছু বলেনি, তাদের কার্যকলাপ দেখে মনে হয় না যে তাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে।"
ডঃ কুমারের মতে, "গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত দশ বছরে দিল্লিতে শিক্ষা নিয়ে অনেক ছাত্র আন্দোলন হয়েছে, তারা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, তখন এই আন্দোলন তাদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
ডঃ সুধীর কুমার বলেন, "এই আন্দোলনের ফলে কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের দাবিগুলোকে দ্রুত তাদের নিজস্ব কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে। পুলিশের কার্যকলাপ, লোকজনকে আটক এবং এফআইআর দায়েরের বিষয়ে বিরোধী দলগুলোও খুব দ্রুত সক্রিয় হয়েছে।"
তাহলে ককরোচ জনতা পার্টির মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়ায় এই আন্দোলন এবং সিজেপি কি এখনই ফুরিয়ে গেল?
প্রবীণ সাংবাদিক এবং আম আদমি পার্টির প্রাক্তন সদস্য আশুতোষ বলেন, "আমি মনে করি সিজেপি একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে এবং এমন একটি পথ দেখিয়ে দিয়েছে যে নরেন্দ্র মোদীর মতো একজন শক্তিশালী নেতারও মাথা নত করানো যায় এবং একজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা যায়।"
"তবে এর ফলে যদি কেউ মনে করেন যে সিজেপি আবারও কোন ইস্যুতে রাস্তায় নামবে, সেটা হবে না, আবার এটি রাজনৈতিক দলও হয়ে উঠবে না। বরং এটা ভালোই হবে, কারণ এতে আন্দোলনের গরিমা নষ্ট হয়। আম আদমি পার্টির কী হয়েছিল তা সকলেই জানেন।"
যুব সম্প্রদায়ের আন্দোলন থেকে যে বার্তা উঠে এল
পাটনার এ এন সিনহা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল স্টাডিজের প্রাক্তন পরিচালক ডিএম দিওয়াকর বলেন, "আন্দোলন থেকেই রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। আপনি দেখবেন যে ১৯৭৪ সালের আন্দোলনও 'ছাত্র সংঘর্ষ বাহিনী'র নেতৃত্বেই হয়েছিল। পরে, এই আন্দোলন থেকেই জনতা পার্টির জন্ম হয় এবং তারা কেন্দ্রে ইন্দিরা গান্ধীকে পরাজিত করে। এরপর, ছাত্র আন্দোলনের নেতারাই অনেক রাজ্যে কংগ্রেস সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।"
ডিএম দিওয়াকর আরও বলেন, "সিজেপি কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু তাদের কর্মসূচি রাজনৈতিক। আপনি যদি তাদের বিবৃতিগুলো দেখেন, তারা সরকারি ব্যবস্থার উন্নতি এবং বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার কথা বলে। আমার মনে হয়, জেন জি প্রজন্মের সমর্থন নিয়ে সিজেপি ভবিষ্যতে একটি রাজনৈতিক দল হয়ে উঠবে।"
মি. দিওয়াকরের মতে, "যদিও ১৯৭৪ সালে ছাত্ররা নিজেরাই জয়প্রকাশ নারায়ণকে তাদের নেতা হতে বলেছিল, কিন্তু আপনি যদি লক্ষ্য করেন, আম আদমি পার্টিতে এমন কোনো নেতা ছিলেন না যার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল। তারাও কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সফল হয়েছিল।"
তিনি বলেন, "সোনম ওয়াংচুক শিক্ষিত। তিনি একজন ভালো সমাজ সংগঠক এবং দূরদর্শী, কিন্তু তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণ নন, এবং এই ঘাটতিটাই 'জেন জি'র আন্দোলনে আমার চোখে পড়েছে। সিজেপি-র কোনো সদস্য নেতা হয়ে উঠতে পারেন এমনটা হতেই পারে।"
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে নতুন গড়ে ওঠা ও সফলতম রাজনৈতিক দল হলো আম আদমি পার্টি। দুর্নীতি নির্মূলের একটি আন্দোলন থেকেই একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়েছে।
যদিও তাদের নেতারাও প্রাথমিকভাবে তাদের আন্দোলনের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা অস্বীকার করেছিলেন, যদিও তাদের আন্দোলন বেশ কয়েক মাস ধরে চলেছিল।
এমন পরিস্থিতিতে, মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সী সিজেপি আন্দোলনের ভবিষ্যতবাণী করা সহজ হবে না।
প্রতীক 'ককরোচ'
ডঃ সুধীর কুমার মনে করেন যে সিজেপির থেকেও বড় হয়ে গিয়ে ভবিষ্যৎ, অর্থাৎ, বৃহত্তর ছাত্র সমাজের আন্দোলন হয়ে উঠেছিল।
তিনি বলেন, "এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরশোলা প্রতীকটি, কারণ আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে এই প্রতীকটি একেবারেই অন্যরকম। আমাদের সমাজে আরশোলাকে অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়।"
"ধর্ণা-বিক্ষোভ শেষ করার সময়ে অভিজিৎ দীপকে বলেছিলেন, 'আরশোলারা কী করতে পারে তা আপনারা বুঝতে পারছেন।' এটি একটি শক্তিশালী বার্তা। এটি সমাজে নিপীড়িত ও প্রান্তিক বলে বিবেচিত মানুষদের কণ্ঠস্বরেরই প্রতিধ্বনি।"
ডঃ সুধীর কুমার মনে করেন যে যুবকদের শুধু ভোটাধিকার থাকাই শেষ কথা নয়, তারা জানিয়ে দিয়েছে যে সমাজে, দৈনন্দিন জীবনেও তাদের ভূমিকা থাকা উচিত এবং যখনই তাদের মনে হবে যে তাদের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে, তখনই তারা রাস্তায় নেমে এসে সেই দাবি আদায়ের চেষ্টা করবে।
ডঃ সুধীর কুমারের এই বক্তব্যের সঙ্গে আশুতোষও একমত।
আশুতোষ বলেন, "সিজেপি আন্দোলন জেন জি-এর মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা জাগিয়ে তুলেছে। লোকে বলত আজকের যুবসমাজ মিম বানানো আর সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিতি ছাড়া আর কিছুই করে না। এই ধারণা ভেঙে গেছে এবং জেন জি দেখিয়ে দিয়েছে যে প্রয়োজনে তারাও রাস্তায়ও নামতে পারে।"
তিনি বলেন, "যুব সমাজ একটি স্বৈরাচারী সরকারকে গণতান্ত্রিক পথে ফিরতে বাধ্য করেছে। কে আর ভেবেছিল যে আমেরিকা থেকে এসে একটি ছেলে এমনই এক আন্দোলন শুরু করে দেবে, যার জেরে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে রাত ১২টায় রিল বানাতে হবে।"
সামাজিক মাধ্যমে প্রভাব
সিজেপিকে সম্পূর্ণ ভাবেই সামাজিক মাধ্য়মের প্রভাবে জন্ম নেওয়া একটি আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর উৎপত্তিও হয়েছিল সামাজিক মাধ্য়মেই।
গত ১৫ই মে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একজন আইনজীবীর সিনিয়র অ্যাডভোকেট তকমা চেয়ে করা একটি আবেদনের শুনানি করছিলেন।
এই সময়ে তিনি বিচার বিভাগের উপর ক্রমবর্ধমান 'অন্যায় আক্রমণ' নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন।
বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ বলেছেন, "কিছু যুবক রয়েছে যারা চাকরি না পেয়ে আর নিজেদের পেশায় জায়গা করে নিতে না পারার কারণে আরশোলার মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে কেউ মিডিয়ার লোক হয়, কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হয়, কেউ আরটিআই কর্মী হয়, তারপর এরাই সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।"
তবে, ১৬ই মে অবশ্য তিনি বলেন যে মিডিয়ার একটি অংশ তার বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে।
ভারতের আইন আদালতের খবর সংক্রান্ত বিশ্বাসভাজন পোর্টাল 'লাইভ ল' এবং 'বার অ্যান্ড বেঞ্চে'র তথ্য অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন যে তার মন্তব্য শুধুমাত্র তাদের উদ্দেশ্যে ছিল, যারা জাল বা ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে আইনের মতো পেশায় প্রবেশ করেছে, সাধারণভাবে যুবসম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়।
কিন্তু ততক্ষণে, তার মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং 'আরশোলা' শব্দটি নিয়ে একটি বিতর্কের জন্ম হয়, সেখান থেকেই তৈরি হয় 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)।
ইন্টারনেটে তাদের নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয় এবং ইনস্টাগ্রামে তাদের লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার্স তৈরি হয়ে যায়।
তারপর এই সিজেপি নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলে। তারা প্রথমে ছয়ই জুন যন্তর মন্তরে এই দাবি নিয়ে বিক্ষোভ দেখায়, ভারতের আরও নানা শহরেও বিক্ষোভ হয়।
অবশেষে, তারা ২০শে জুন থেকে যন্তর মন্তরে একটি অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করে, যার ফলে ২৫শে জুলাই, শনিবার, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ডঃ সুধীর কুমার বলেন, "এক মাসের জন্য বাড়ি ছেড়ে থাকা সহজ নয়, তার উপর বাবা-মায়ের চাপ, পড়াশোনার চাপ, কেরিয়ারের চাপ আছে। সিজেপি যদি তাদের অন্যান্য ইস্যুগুলো নিয়ে আর এগোতে নাও পারে, তাহলে সেগুলো বিরোধী দলগুলোর তুলে ধরা উচিত।"
তিনি মনে করেন, আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে সেই বিষয়গুলো উত্থাপন করে, সেদিকেই নজর রাখতে হবে।