মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম ১০০ দিনের আলোচিত-সমালোচিত পাঁচ সিদ্ধান্ত

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার প্রথম ১০০ দিনে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাকে ঘিরে কখনো আলোচনা হয়েছে কখনো বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
এই তালিকায় তৃণমূল জমানায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে রদবদল করে আনা অন্নপূর্ণা যোজনা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কেন্দ্র সরকারের আয়ুষ্মান ভারত মতো কল্যাণমূলক প্রকল্প আছে।
কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর নীতি, বেআইনি দখলদারির বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান এবং সেখানে বুলডোজারের ব্যবহার, প্রস্তাবিত গুণ্ডাদমন বিল, গরু, মোষ সহ গবাদি পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন নতুন করে বলবৎ করা, ২০২০ সালে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মন্দির-মসজিদসহ ধর্মীয় স্থান থেকে লাউড স্পিকার, মাইক খুলে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে, তেমনি রয়েছে কলকাতার ই-এম বাইপাসে মেট্রো প্রকল্পের কাজের জট ছাড়ানো, আরজি কর কাণ্ডের তদন্ত নিয়ে সক্রিয়তার মতো পদক্ষেপও।
পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১০০দিনে সরকারের পারফর্মেন্সের প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য বলেছেন, "কী করে নিজের নম্বর দেব, তবে এই ক'দিনে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, সাংবিধানিক কর্তব্য, জনকল্যাণ, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। এরপর যোগ, বিয়োগ আপনাদের হাতে। আগামী দিনেও আমাদের সরকার মানুষের জন্য কাজ করবে।"
"২০২৭ সালের নয়ই মে আমার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এক বছর পূর্ণ হবে, ওই দিন আমি আপনাদের সামনে পরীক্ষায় বসব, পরীক্ষায় আপনারা নম্বর দেবেন আমায়। আমি যদি ১০-এর মধ্যে নয় নম্বর না পাই, তবে আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা স্বীকার করে নেব যে, না অমি পারলাম না।"
প্রশাসনিক, নীতিগত বা পরিকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়ে বিজেপি নিজেদের 'সাফল্য' প্রকাশ্যে তুলে ধরলেও বিষয়টাকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ বা নীতির নেপথ্যে আগামী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন দিকে যেতে পারে তারও প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত মিলেছে।
কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক উজ্জ্বল রায় বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "১০০দিন কোনো সরকারের মূল্যায়নের পক্ষে যথেষ্ট নয়। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির প্রতি আস্থা রেখে যারা ভোট দিয়েছিলেন সরকারের তাদের কথা মাথায় রাখলে এই সময়টা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার এটাই আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন দিকে যেতে পারে তার ইঙ্গিত দিতে পারে।"
এই আবহে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে আলোচিত-বিতর্কিত পাঁচ পদক্ষেপ নিয়ে এই প্রতিবেদন।

ছবির উৎস, Suvendu Adhikari/Facebook
'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রাজ্যে ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দু অধিকারীর সরকার 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট'-এর নীতি অনুসরণ করে।
ক্ষমতায় এসেই কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা, ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া এবং তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নীতি সম্পর্কে ঘোষণা করে সরকার। তড়িঘড়ি হোল্ডিং সেন্টারও তৈরি হয়।
একইসঙ্গে সীমান্তের যে অংশে এখনো কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে বেড়া দেওয়ার পক্ষেও জোর দিয়েছে প্রশাসন। এর জন্য জমি হস্তান্তরের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে, যা বিগত সরকারের জমানায় বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ।
জুন মাসে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, "এর মধ্যেই ওপারে পাঠানো শুরু করেছি। কোনও জেল, সাজা নয়। সোজা ডিপোর্ট করে দেব।"
"ইতিমধ্যেই ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে সীমান্তের ওপারে পুশব্যাক করা হয়েছে।"
এটাই সর্বশেষ সরকারি তথ্য। সেই সময়ে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, "যারা প্রকৃত ভারতবাসী, তাদের চিন্তার কোনও কারণ নেই। সে যে ধর্মের হোক, যে সম্প্রদায়ের হোক।"
সীমান্তে 'পুশ ব্যাক' নামক অলিখিত পদ্ধতির মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া এড়িয়ে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে সীমান্তের অন্যদিকে ঠেলে দেওয়া আগেও চালু ছিল, কিন্তু বিএসএফ বা সরকার কখনই সেটা স্বীকার করত না।
কিন্তু নতুন সরকার স্পষ্ট করে 'পুশ-ব্যাকের' কথা বলতে শুরু করেছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার আসার প্রায় এক বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাংলাদেশি 'অনুপ্রবেশকারী' সন্দেহে অনেককেই এভাবে পাঠানো হয়েছে এবং তাকে ঘিরে কম সমালোচনা হয়নি।
এদের মধ্যে ভারতের নাগরিক ছিলেন বলে যেমন অভিযোগ উঠেছে, চাপের মুখে পড়ে পরে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে তেমনই শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে তাদের পুশব্যাক করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এই আবহে পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের 'ডিডেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট' নীতির ব্যাপক সমালোচনা হয়।

অন্নপূর্ণা যোজনা
বিশেষজ্ঞদের মতে মমতা ব্যানার্জীর সরকারের অন্যতম সফল নির্বাচনী হাতিয়ার ছিল 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্প। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের নারীদের আর্থিক সহায়তার এই প্রকল্প তৃণমূলের জনভিত্তি মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এক সময়ে ৫০০ টাকা থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১০০০ এবং লোকসভা ভোটের আগে আরো ৫০০ টাকা বাড়িয়েছিল তৃণমূল সরকার। বিজেপি তাদের ইশতেহারে তা বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ক্ষমতায় আসার পরই এই প্রকল্পকে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে বিজেপি সরকার। তবে প্রথমেই তারা প্রকল্পের নাম বদল করে রাখে 'অন্নপূর্ণা যোজনা'।
বেশ কিছু নিয়ম বলবৎ করা হয়- সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, মাসিক ১০ হাজার টাকার বেশি আয়, পরিবারের বার্ষিক আয় ১২ লক্ষ টাকার বেশি এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির মালিকানা থাকলে এই সুবিধা মিলবে না।
তৃণমূল জমানায়, এমন নিয়ম ছিল না, নথি নিয়ে কড়াকড়িও ছিল না। তবে অর্থের পরিমাণ বাড়লেও উপভোক্তার সংখ্যা কমেছে।
বিজেপির যুক্তি আগের সরকারের আমলে এই প্রকল্পেও দুর্নীতি হয়েছে। এই আর্থিক সুবিধা যাদের প্রয়োজন নেই তারাও যেমন ভাতা পাচ্ছিলেন, তেমনই পুরুষরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেয়েছেন। শুরু হয় নথি ঝাড়াই বাছাইয়ের কাজ।
রাজ্য সরকার সোমবার জানিয়েছে এই যোজনায় ১ কোটি ৬২ লক্ষ আবেদন যাচাইয়ের পর ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
২০শে অগাস্টের মধ্যে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পৌঁছে যাবে। এর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৪,৩৫০ কোটি টাকা। ১০ই জুলাই পর্যন্ত মোট আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ।
বাকি নথি যাচাইয়ের কাজ চলছে, কাজ শেষ হলে উপভোক্তার সংখ্যা বাড়বে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই উপভোক্তার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
সাংবাদিক উজ্জ্বল রায় বলেছেন, "অন্নপূর্ণা যোজনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি সরকার বেশ ধাক্কা খেয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষ ভেবেছিলেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতোই এই প্রকল্পের টাকাও সকলে পাবেন। প্রচারও খানিকটা সেভাবেই হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই ছবি না মেলায় বিজেপিকে যারা ভোট দিয়েছিলেন তাদের প্রত্যাশা পূর্ণ হয়নি।"
"তবে অনেক স্বচ্ছল পরিবারের নারীরা এই যোজনার আওতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন, কারণ তারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেতেন। এদের অনেকেরই সেই টাকার প্রয়োজন ছিল না। রাজ্যের কোষাগার থেকেই এই অর্থ ওই খাতে বণ্টন হতো। তাই যদি যাচাই-বাছাই পর্বে পুরুষ বা মৃত উপভোক্তা বা প্রয়োজন নেই এমন ব্যক্তিরা বাদ গেলে অর্থনৈতিক দিক থেকে তা রাজ্যের জন্য ভাল।"

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
পুরনো মামলা নিয়ে পদক্ষেপ
কামদুনি গণধর্ষণ-হত্যা, শিক্ষক-সমাজকর্মী বরুণ বিশ্বাস হত্যা, আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক-পড়ুয়াকে ধর্ষণ করে খুন থেকে শুরু করে বিগত সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া একাধিক বিতর্কিত ঘটনার তদন্ত নিয়ে নতুনভাবে সক্রিয় হয়েছে বিজেপির সরকার।
আরজি কর হাসপাতালের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার বিচার চেয়ে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন দেখা গিয়েছিল যার আঁচ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বাইরেও এই আন্দোলনের সমর্থনের ছবি প্রকাশ্যে আসে।
সেই ঘটনার তদন্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার। নিহত চিকিৎসকের মা মেয়ের বিচার চেয়ে ভোটের আগে বিজেপিতে যোগ দেন এবং নির্বাচনে জেতেন।
সম্প্রতি রাজ্য এই ঘটনার তদন্ত নিয়ে সক্রিয় হয় রাজ্য সরকার। তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে পুলিশ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পানিহাটির সাবেক তৃণমূল বিধায়ক নিরমল ঘোষকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
তবে শুধু এই ঘটনা নয়, একইসঙ্গে আগের আমলের রাজনৈতিক হিংসা ও অন্যান্য বিতর্কিত ঘটনাও নতুন করে তদন্তের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি, অতীতে যে ঘটনাগুলোর তদন্তে গাফিলতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে, তা সামনে আনা প্রয়োজন।
তবে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
উজ্জ্বল রায়ের কথায়, "বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম আরজি করের ঘটনার তদন্তে গতি আনা। এটা একদিক থেকে বিজেপির কাছে বাধ্যতামূলক ছিল কারণ এই ঘটনাকে ঘিরেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
তাছাড়া কামদুনি, বরুণ বিশ্বাসের হত্যা মামলা নিয়েও সক্রিয়তা বেড়েছে। বেশিরভাগ মামলায় অভিযুক্তরা তৃণমূলের ছিল। এই মামলাগুলোর বিষয়ে সক্রিয় হলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে কোথাও একটা আশ্বাস জোগাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেটা দেখার।"
"আরেকটা বিষয় হলো রাজনৈতিক হিংসার যে সমস্ত পুরানো মামলা রিওপেন হচ্ছে, সেটা কতটা বিচারের জন্য কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত সেটাও দেখার।"
এই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বিজেপির একাধিক সাম্প্রতিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাদ মাহমুদ।
তার কথায়, "আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে বলতে গেলে একদিকে যেমন আরজি করের ফাইল খোলা হয়েছে তেমনই ডিম ছোড়া, বুলডোজার অ্যাকশান, গুণ্ডা দমন আইন আনা- এই সমস্ত ঘটনাও তো রয়েছে।"
"তাছাড়া তৃণমূল জমানাতেও যে সব ঘটনা (ক্ষমতার অপব্যবহার ইঙ্গিত করে) দেখা গিয়েছিল, এখনো তাই-ই হচ্ছে।"

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
উচ্ছেদ ও বুলডোজার অভিযান
সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো বেআইনি দখলদারি, আইন বহির্ভূতভাবে তৈরি ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান।
তিলজলা এলাকায় এক আবাসিক ভবনে চামড়ার ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি হতো। ওই ভবনে অগ্নিকান্ডের পর বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। ভবনের একাংশ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়, পরে কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে তাতে স্থগিতাদেশ জারি হয়। রাজ্য সরকারের এই নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
এরপর কলকাতা ও হাওড়া-সহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত, রাস্তা এবং সরকারি জমি দখল করে থাকা দোকান, স্টল এবং অন্যান্য নির্মাণ সরানোর কাজ শুরু হয়েছে।
হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। সরকারের যুক্তি, ফুটপাথ পথচারীদের জন্য। সরকারি জমি বা রাস্তা দখল করে ব্যবসা আইন বহির্ভূত। প্রশাসনের যুক্তি, শহরকে দখলমুক্ত করে যানজট কমানো এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য।
কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, এই অভিযানের ফলে বহু হকার ও ছোট ব্যবসায়ী জীবিকা হারাচ্ছেন। পুনর্বাসন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
"কলকাতায় রাস্তার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বেশি, ফুটপাথ দখল হওয়ার কারণে হাঁটতে অসুবিধা হয়। রেল বা মেট্রোরেলের জায়গায় বেআইনি দখলদারিও দেখা যায়। ফুটপাথ ব্যবহার করতে রাস্তায় চওড়া করার সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ যেমন প্রয়োজনীয় বলেছেন তেমনই হকার উচ্ছেদের ফলে তাদের জীবিকা এখন সংকটে," বলেছেন উজ্জ্বল রায়।
"প্রান্তিক এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে যারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন, তারা এই সিদ্ধান্তের ফলে ধাক্কা খেয়েছেন।"
অন্যদিকে পুনর্বাসনের জন্য নীতি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
ড. মাহমুদের কথায়, "সরকারের তরফে ঘোষণা করা কিছু ইন্ডিসাট্রিয়াল বিনিয়োগের ঘোষণা ছাড়া রাজ্যের অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য কোনো বড় পলিসির কথা শুনিনি। আমরা মন্ত্রীদের হকারদের সরে যেতে বলতে শুনছি, তাদের পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতির বিষয়ে কিছু চোখে পড়েনি।"

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
নাম পরিবর্তন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে সামনে রেখে বিজেপির কর্মসূচি
সম্প্রতি কলকাতার 'সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ'-এর নাম পাল্টে গোপাল মুখার্জী রোড করার ঘোষণা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।
বিজেপির প্রাথমিক যুক্তি ছিল রাস্তার নাম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের শেষ প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন।
'দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস' নামে পরিচিত ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার সময়ে মি. সোহরাওয়ার্দীই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দাঙ্গা থামাতে না পারার জন্য ইতিহাসবিদদের একাংশ তাকে দোষারোপ করেন।
বাস্তবে কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলের ওই রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে। অধ্যাপক, কূটনৈতিক, শিল্প সমালোচক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান উপাচার্য ছিলেন তিনি। রাস্তার নাম বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
বিজেপি সরকার ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে বাংলার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়নি। তার বিশাল মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনাও হয়েছে।
অন্যদিকে, সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য অনন্ত মহারাজ-সহ একাধিক বিজেপি নেতাদের মন্তব্যের জেরেও জল ঘোলা হয়েছে।
শেষপর্যন্ত রাজ্য সরকারের দেওয়া বঙ্গবিভূষণ ফেরত নেওয়া এবং যারা সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করবে তার বিরুদ্ধে করা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন শুভেন্দু অধিকারী।
বীরভূমের রামপুরহাটে তার নামে এক রাস্তার নাম বদলে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নামে করা হয়। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পরই তড়িঘড়ি পুরানো নামই ফিরিয়ে আনা হয়।
কিন্তু তাতে 'ড্যামেজ কন্ট্রোল' কী হয়েছে?
উজ্জ্বল রায় বলেছেন, "সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে বাঙালির যে আবেগ রয়েছে সেখানে যে আঘাত লেগেছে তা বুঝতে একটু দেরি করে ফেলেছে বিজেপি।"
অন্যদিকে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে বিজেপি আসলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা বিকল্প ব্যাখ্যা সামনে আনতে চাইছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর পিছনে নিছক নাম পরিবর্তনের রাজনীতি নেই বলেই তাদের মত।
"রাস্তার নাম বদল বা গেরুয়া রঙে রাঙানোটা হলো বাহ্যিক বিষয়, আসল হলো এই সরকার বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করছে। তাছাড়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তারা যে পলিটিকাল ন্যারেটিভ তৈরি করছে, সেটা শুধুমাত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে সামনে রেখে নয়, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংসের মতো ঘটনাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েও তারা নিজেদের ন্যারেটিভ তৈরি করছে," বলেছেন ড. মাহমুদ।
সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার চেয়ে বৃহত্তর চিত্রের দিকে নজর দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।








