ভারতের 'সংখ্যালঘুদের অবস্থা' নিয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ভারতে সংবাদপত্রের 'স্বাধীনতার অবক্ষয়' এবং 'ধর্মীয় ও সংখ্যালঘুদের অধিকার দুর্বল হয়ে' পড়ার ঘিরে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্য সংবাদমধ্যমে উঠে এসেছে। যদিও ভারতের তরফে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

ডাচ সংবাদপত্র 'ডি ফোকসক্র্যান্ট'-এর মতে, শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর আগে ডাচ প্রধানমন্ত্রী বলেন, "ডাচ সরকার ভারতের ঘটনাবলী নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং এই উদ্বেগ সমগ্র ইউরোপ জুড়ে অনুভূত হচ্ছে।"

এর পরেই রবিবার ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেদারল্যান্ডস সফর প্রসঙ্গে একজন ডাচ সাংবাদিক যখন ডাচ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন ভারত জানায় যে এটি ভারত সম্পর্কে সেই দেশের জনগণের সচেতনতার অভাবকেই প্রমাণ করে।

উল্লেখ্য, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার পাঁচ-দেশীয় সফরের অংশ হিসেবে নেদারল্যান্ডস সফর শেষ করে ১৭ই মে রবিবার সুইডেন সফর করেন, যেখানে তাকে সেই দেশের সর্বোচ্চ সম্মান 'রয়্যাল অর্ডার অফ দ্য পোলার স্টার কমান্ডার গ্র্যান্ড ক্রস' প্রদান করা হয়।

ডাচ প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী বলেছিলেন?

ডাচ সংবাদপত্র 'ডি ফোকসক্র্যান্ট'-এর তথ্যমতে, শনিবার প্রধানমন্ত্রী মোদীকে স্বাগত জানানোর আগে ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন বলেন যে, ভারতে ঘটে চলা একাধিক ঘটনায় ডাচ সরকারও উদ্বিগ্ন।

প্রধানমন্ত্রী জেটেন বলেন, "এটি কেবল সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয় নয়, বরং সংখ্যালঘুদের অধিকারেরও বিষয়, যারা সেখানে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়, তবে এটি আরও অনেক ছোট সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।"

তিনি বলেন, "উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারত এখনও সকলের সমান অধিকার সুরক্ষিত করা একটি ইনক্লুসিভ অর্থাৎ সমন্বয়মূলক সমাজ হিসেবে টিকে আছে কি না।"

সংবাদপত্রটির তথ্যমতে, জেটেন বলেন, "এই উদ্বেগগুলো নিয়মিতভাবে ভারত সরকারের কাছে উত্থাপন করা হয়। আমি আরও বিশ্বাস করি যে, ইইউ এবং ভারতের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে..."

তার মতে, এটি ভারতে মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করার মতো বৃহত্তর বিষয় নিয়ে আলোচনা করার একটি সুযোগ করে দিয়েছে।

কী বক্তব্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ডস সফর শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলন না করা নিয়েও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলিমদের অধিকার নিয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ সম্পর্কে একজন ডাচ সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (পশ্চিম) সচিব সিবি জর্জ বলেন, "আমরা মূলত এই ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হই কারণ প্রশ্নকর্তার কাছে তথ্যের অভাব থাকে।"

মি. জর্জ বলেন যে, ভারত ৫,০০০ বছরের পুরোনো সভ্যতার একটি দেশ এবং এখানে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈচিত্র্য রয়েছে।

তিনি বলেন, "ভারত ১৪০ কোটি মানুষের দেশ, যা বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যা। এটি একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, ভাষার বৈচিত্র্য, খাদ্যের বৈচিত্র্য ও ধর্মের বৈচিত্র্য রয়েছে।"

"বিশ্বে এমন আর কোনো দেশ নেই যেখানে চারটি ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম এবং শিখধর্মের উৎপত্তি ভারতেই এবং আজও ভারতেই এগুলো সমৃদ্ধি লাভ করছে।"

তিনি বলেন, "ভারতে ২,৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইহুদি ধর্মের অস্তিত্ব রয়েছে। এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে সহাবস্থান করে আসছে। ভারত সম্ভবত সেই অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম, যেখানে ইহুদি সম্প্রদায়কে কখনও নিপীড়নের শিকার হতে হয়নি।"

"যিশু খ্রিস্টের পুনরুত্থানের পরপরই ভারতে খ্রিস্টধর্মের আগমন ঘটে এবং এখানে তা সমৃদ্ধি লাভ করেছে। হজরত মুহাম্মদের সময়ে ভারতে ইসলামের আগমন ঘটে এবং এখানেই এর বিকাশ হয়।"

সিবি জর্জ ভারতকে একটি "প্রাণবন্ত গণতন্ত্র" হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, "আমরা সম্প্রতি যে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি, যেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৯০ শতাংশ। এটাই ভারতের সৌন্দর্য।"

মি. জর্জ বলেন যে, ভারত গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে আপোস না করেই অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। "আমরা বিশ্বের জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ, কিন্তু বিশ্বের সমস্যার এক-ষষ্ঠাংশ নই। এটাই ভারতের সৌন্দর্য, যা নিয়ে আমরা গর্বিত। একারণেই এখানকার প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সমৃদ্ধি লাভ করে।"

"যখন আমরা স্বাধীনতা লাভ করি, তখন ভারতে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল ১১ শতাংশ। এখন তা ২০ শতাংশেরও বেশি। কোন দেশে সংখ্যালঘু জনসংখ্যার এমন বৃদ্ধি দেখা গেছে? ভারত ছাড়া আর কোথাও আপনি এমনটা দেখতে পাবেন না।"

ওই প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি শেষ করেন এই বলে যে, "এটাই ভারতের সৌন্দর্য। তাই আমি আপনাদের ভারত সম্পর্কে আরও জানার জন্য অনুরোধ করব, যাতে আপনারা ভারত এবং এর অগ্রগতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।"

ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ঠিক কী অবস্থায় আছে?

মানবাধিকার সংস্থাগুলো মোদী সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন এবং আন্দোলনকর্মী ও সাংবাদিকদের দমন করার অভিযোগ করেছে।

সংস্থাটি বিগত কয়েক বছর ধরে তাদের প্রতিবেদনে ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

রিপোর্টার্স সঁ ফ্রঁতিয়ের বা আরএসএফ, যা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস নামেও পরিচিত, সেই প্যারিস-ভিত্তিক অলাভজনক সংস্থাটির তরফে প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা র‍্যাঙ্কিংয়ে ভারত ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।

এই র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারত ১৫৭তম স্থানে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে ভারতের র‍্যাঙ্ক ছিল ১৫১তম।

২০২৬ সালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিক থেকে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং নেপাল ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে, চীনের র‍্যাঙ্ক ১৭৮তম।

২০২০ সালে ভারতের র‍্যাঙ্ক ছিল ১৪২তম।

নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ড ভ্রমণ কি ফলপ্রসূ হলো?

ভারত ও নেদারল্যান্ডস, উভয় দেশই প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই সফরকে 'ঐতিহাসিক' বলে বর্ণনা করেছে। মি. মোদীর এই সফরের দৌলতে দুই দেশের মধ্যে একাধিক বোঝাপড়া সম্পন্ন হয়েছে।

ভারতের টাটা ইলেকট্রনিক্স বিশ্বের অন্যতম প্রধান চিপ উৎপাদনকারী সংস্থা এএসএমএল-এর সঙ্গে গুজরাটে একটি চিপ উৎপাদন কারখানা তৈরির জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

এছাড়াও, লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় ভারত সরকারকে ডাচ ঔপনিবেশিক আমলে ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির মধ্যে রয়েছে চোল রাজবংশের তাম্রশাসন বা তামার পাতের উপর লেখা রাজকীয় লিপি, যা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে অনুমতি ছাড়াই নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।