আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
লাইব্রেরী সহকারী থেকে মাও জেদং যেভাবে চীনের বিপ্লবী নেতায় পরিণত হলেন
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি বাংলা নিউজ, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৯ মিনিট
কম্যুনিস্ট নেতা মাও জেদংকে আধুনিক চীনের অন্যতম রূপকার বলা হয়। অথচ জীবনের শুরুর দিকেও তিনি ছিলেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন সাধারণ লাইব্রেরিয়ান বা গ্রন্থাগার সহকারী।
১৮৯৩ সালের ২৬শে ডিসেম্বর মধ্য চীনের হুনান প্রদেশে যখন জেদং এর জন্ম হয়, তখন দেশটিতে চিং রাজবংশের শাসন চলছিল। কিন্তু সেসময় দেশটিতে বিরাজ করছিল অস্থিরতা ও দুরবস্থা।
এই প্রদেশেরই শাওশান এলাকার এক কৃষক পরিবারে মাও জেদং জন্মগ্রহণ করেন।
অবশেষে ১৯১১ সালে চীনা রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং দেশটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। কিন্তু দুর্বল জাতীয়তাবাদী সরকার এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে দেশটিতে বিভক্তির সৃষ্টি হয়।
সেই প্রেক্ষাপটেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তরুণ লাইব্রেরিয়ান মাও জেদং।
মাও জেদং এবং এই কম্যুনিস্ট পার্টি কীভাবে চীনের ক্ষমতায় এসেছিল সেটিকে কোন কোন ক্ষেত্রে 'ইতিহাসের এক চমৎকার দুর্ঘটনা' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
মাও জেদং এর রাজনৈতিক দর্শন বিশ্বজুড়ে 'মাওবাদ' নামে পরিচিত। তবে শুধু চীনেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা প্রান্তে মাওবাদের ছাপ এখনও স্পষ্ট।
ভারত, নেপাল, ফিলিপাইনসহ একাধিক দেশে মাওবাদী সংগঠন সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
কীভাবে মাও জেদং আধুনিক চীনের নেতা হয়ে উঠেছিলেন?
একইসঙ্গে, পরবর্তীতে কীভাবে দেশটির দুইটি কমিউনিস্ট দলের একটির প্রধান বা নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছান?
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
কীভাবে বিপ্লবের প্রতি ঝুঁকে পড়েন মাও জেদং?
চীনের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা মূলত মাও জেদংকে শ্রেণিহীন ও শোষণহীন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা মার্ক্সবাদের দিকে আগ্রহী করে তোলে।
চীনে তখন চলছিল কিং রাজবংশের খুবই দুর্দশাগ্রস্থ শাসন। জনগণের জীবনযাপন তখন ছিল খুব করুণ। তবে মাও পরিবার অন্যান্যদের চেয়ে স্বচ্ছল ছিল।
বিবিসির একটি আলোচনায় চীনের সেই সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন চীন বিশেষজ্ঞ ইসাবেল হিলটন ও মার্টিন পালমার।
সেই সময় বিয়েতে পারিবারিক সম্মতি থাকতে হবে, এমন নিয়মের প্রতিবাদে তরুণী জাও উঝানের আত্মহত্যার ঘটনায় ১৯১৯ সালের নভেম্বরে মাও জেদং অন্তত দশটি আর্টিকেল লেখেন।
সেসময় চীনের তরুণ-তরুণীরা এমন বিয়ের প্রতিবাদ করছিলেন। পশ্চিমা বিশ্বে তরুণ-তরুণীদের নিজেদের পছন্দে বিয়ের অনুমতি থাকলেও চীনে সেসময় এটি অনুমোদিত ছিল না।
কন্যা সন্তানের মতের বিরুদ্ধে চীনের বাবা-মায়েরা সেসময় যেভাবে তাকে বিয়ে দিতেন, সেটি অনেকে 'ইনডাইরেক্ট রেপ' বা পরোক্ষভাবে ধর্ষণ বলে বর্ণনা করতেন।
১৯২০ সালের শুরুতে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করার সময়েই মূলত মাও জেদং মার্ক্সবাদী সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
কারণ চাইনীজ কম্যুনিস্ট পার্টির দুইজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, একজন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গ্রন্থাগারিক লি দাজাও এবং ডিন চান্দু শীলের সাথে সেখানেই তার পরিচয় হয়।
তাদের কাছ থেকে মাও মার্ক্সবাদের প্রতি প্রভাবিত হন। মার্ক্সবাদ এবং লেনিনবাদই তার পুরো জীবনকে প্রভাবিত করে।
ওই বছরের শেষের দিকে দেশটি বন্যা, দুর্ভিক্ষ এবং সংঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দুর্ভিক্ষের মুখে দেশটির অনেক নাগরিক চীনের মূল ভূ-খণ্ড ছেড়ে চলে যান।
আর ওইসময় হাজার হাজার মানুষ রোগে ভুগে এবং অনাহারে মারা যায়।
এর ফলে চীনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যাতে, কৃষকরা নিজের সন্তানও বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
হুনানের সচ্ছল কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মাও জেদং, ২৫ বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার পাঠ চুকান।
কিন্তু নিজের শহরে দুর্ভিক্ষের শিকার বিক্ষোভকারীদের হত্যার শৈশবের সেই স্মৃতি তাকে প্রবলভাবে নাড়া দিত।
নিজ দেশের এই কঠিন সময়গুলোই মাও জেদংকে তার জীবন এবং বিপ্লবী ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব তাকে খুব আকর্ষণ করে।
সেসময়ই কম্যুনিজম বা সাম্যবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। এরপরই মাও জেদং প্রাথমিক লড়াই শুরুর ধাপ হিসেবে কৃষকদের সংগঠিত করার কার্যক্রম শুরু করেন।
গ্রন্থাগারিক হিসেবে প্রচুর পড়ার অভ্যাস মাও জেদংকে প্রথমে ইউরোপীয় সমাজতন্ত্র এবং পরবর্তীতে সহিংস বিপ্লবের দিকে ধাবিত করে।
মাও এমন এক সময়ে চাইনিজ কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন যখন চীনে এই দলের গুরুত্ব তেমন একটা ছিল না।
হুনানে এই দলটির শাখার গেরিলা নেতা হিসেবে সেখানে একটি ব্যর্থ কম্যুনিস্ট অভ্যুত্থানে নেতৃত্বও দেন তিনি।
পরবর্তীতে নিজ দেশের দুর্গম গ্রামে স্বাধীন কম্যুনিস্ট ছিটমহল গড়ে তোলেন।
১৯২৩ সালে, কুওমিনতাং (কেএমটি) জাতীয়তাবাদী দল উত্তর চীনের বেশিরভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারীদের পরাজিত করার জন্য মাও জেদং এর দল সিসিপির সাথে জোট বাঁধে।
কিন্তু রুশ বিপ্লবের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় ১৯২৭ সালে কেএমটি নেতা ও প্রধানমন্ত্রী চিয়াং কাই-শেকের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সরকার কম্যুনিস্টদের চিরতরে নির্মূল করতে এক শুদ্ধি অভিযান চালায়।
এই অভিযানে মাও জেদং এর স্ত্রী এবং বোনসহ হাজার হাজার মানুষ নিহত হন।
মাও এবং অন্যান্য কম্যুনিস্ট নেতা-কর্মীরা এই দমন-পীড়নের সময় দক্ষিণ-পূর্ব চীনের দিকে পিছু হটেন।
কেএমটির সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মাও জেদং এবং আরেক শীর্ষস্থানীয় কম্যুনিস্ট নেতা বিদ্রোহের ডাক দেন। যেটি নানচাং বিদ্রোহ নামে পরিচিত। তাদের নেতৃত্বে ১৯২৭ সালের অগাস্টে গড়ে ওঠে রেড আর্মি।
পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালে তৎকালীন সরকার বা কুওমিনতাং (কেএমটি) জাতীয়তাবাদী দল তাদের ওপর আবার দমন-পীড়ন শুরু করলে মাও জেদং "লংমার্চ" শুরু করেন। এতে রেড আর্মির সদস্যরা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
আগের অভিযানের পরে যেসব কম্যুনিস্ট সদস্যরা জীবিত ছিলেন তাদের নিয়ে নিজেদের নতুন আস্তানা বা ঘাঁটি তৈরির উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ছয় হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে মাও জেদং উত্তর-পশ্চিম চীনের উদ্দেশ্যে এই "লংমার্চ" পরিচালনা করেন।
আর তুষার ঢাকা বিশাল সব পর্বতমালা, বিস্তৃত জলাভূমি, ধূ ধূ মরুভূমির প্রান্তরের বিপদসংকুল যাত্রাপথে লংমার্চ শেষে, উত্তর-পশ্চিম চীনের এক নির্জন এলাকা ইয়ানআনে পৌঁছে কম্যুনিস্টদের মাত্র ১০ শতাংশ বা আট হাজার জন জীবিত থাকেন।
পরবর্তীতে এই এলাকাতেই মাও জেদং কম্যুনিস্টদের নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলেন। সেসময় এমন পরিস্থিতিতে মনে হয়েছিল চীনের কম্যুনিস্ট আন্দোলন বুঝি শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে।
কিন্তু ঠিক সেসময়ই ১৯৩৭ সালে জাপান চীনে পূর্ণাঙ্গভাবে আগ্রাসন চালায়। শুধুমাত্র একটি এলাকা নয় বরং পুরো চীন দখল করতে চেয়েছিল জাপান।
১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে জাপানি আগ্রাসনের সময় নানজিংয়ে তিন লাখ মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। তার কিছুদিন পরেই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
এ সময় জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইনীজ কম্যুনিস্ট পার্টি (সিসিপি) এবং কুওমিনতাং (কেএমটি) সাময়িকভাবে আবারো জোটবদ্ধ হয়েছিল।
সেই সময় মাও জেদং তাদের নতুন ঘাঁটি ইয়ানআনের বাইরের গুহাগুলোতে বসবাস করতেন এবং পশ্চিমা সাংবাদিকরা সেখানেই তার সাথে দেখা করতে আসতেন।
যারা তার সাথে দেখা করেছিলেন, তাদের মধ্যে দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক লিয়াং শুমিন ছিলেন।
মি. শুমিন মাও জেদংকে বেশ আকর্ষণীয় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, মাও ছিলেন স্বচ্ছন্দ, উষ্ণ হৃদয়ের এবং স্বাভাবিক।
"অত্যন্ত অভদ্র তবে সম্পূর্ণ কৃত্রিমতাহীন", একইসঙ্গে, অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।
দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক মি. শুমিনের নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তারা চীনের তখনকার দুইটি মূল সমস্যার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন।
প্রথমত, গ্রামীণ সমস্যা, দেশের অধিকাংশ মানুষের চরম দারিদ্র্য অবস্থা। দ্বিতীয়ত, জাপানি আগ্রাসন থেকে জাতীয় মুক্তি।
মি. শুমিনকে মাও জেদং বলেছিলেন, "যুদ্ধ সবকিছু বদলে দিয়েছে।"
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রানা মিত্তার বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "এটি এমন একটি সংঘাত যার কারণে যুদ্ধের সময়েই চীনে ১৪ মিলিয়ন বা তারও বেশি বেসামরিক ও সামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল।"
"আট থেকে ১০ কোটি চীনা মানুষ নিজ দেশেই শরণার্থী হয়ে পড়েছিল। তাই চীনের রাজনীতি ও সমাজের দিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ," বলেন অধ্যাপক মিত্তার।
কিন্তু ১৯৪৫ সালে এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে আবার সিসিপি ও কেএমটির মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে যায় এবং গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে আমেরিকার সমর্থনে জাতীয়তাবাদীদের জনবল ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল। অন্যদিকে কমিউনিস্টরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছিল।
তবে কমিউনিস্টরা অস্ত্রের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও ইয়ানআনে ১২ বছর থাকার পর তাদের ভূমি সংস্কার কার্যক্রম গ্রামের সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেছিল। যা কিনা সামাজিক ন্যায়বিচারের সোনালী যুগের প্রতিশ্রুতি সম্বলিত প্রচারণার মাধ্যমে আরও জোরালো হয়েছিল।
এই গৃহযুদ্ধে মাও জেদংসহ কমিউনিস্টরা জয়ী হয় এবং ১৯৪৯ সালের পহেলা অক্টোবর মাও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। যেখানে মাও সেতুং সেই বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই তিয়ানানমেন গেটটি এখনো রয়েছে।
অন্যদিকে কেএমটির নেতা চিয়াং কাই-শেক তাইওয়ানে পালিয়ে যান।
চীনা সাম্রাজ্যের পতনের মাত্র ৩৮ বছর পর এবং জাপানি যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধে চীনা জনগণের সমস্ত দুর্ভোগের পর, ওইসময় একটি সম্পূর্ণ নতুন সূচনার সম্ভাবনায় ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।
সাম্যবাদের প্রবর্তন, দুর্ভিক্ষ ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব
তবে কমিউনিস্টরা শেষ পর্যন্ত যত দ্রুত ক্ষমতা দখল করেছিল, তা তাদের কাঁধে অর্পিত বিশাল দায়িত্বকে কেবল আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। মাও জেদং এর রাজনৈতিক দর্শন 'মাওবাদ' নামে পরিচিত। মূলত এটি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদেরই এক নতুন রূপ যা তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও কৃষিভিত্তিক চীনা সমাজের বাস্তবতার ভিত গড়ে তোলে।
চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিশেষজ্ঞ আরনি রেয়া মনে করেন, এ কারণেই মাও এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতারা চীনা সমাজ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।
এর অংশ হিসেবে শিল্প কারখানা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং কৃষকদের সমবায় ভিত্তিক কৃষিকাজে যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি সব ধরনের বিরোধিতাকে কঠোর হাতে দমন করা হয়।
এক পর্যায়ে সাম্যবাদের প্রবর্তন বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।
শুরুতে চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে বড় ধরনের সহায়তা পেলেও পরবর্তীতে দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে।
১৯৫৮ সালে সমাজতন্ত্রের আরও নিজস্ব বা 'চীনা' রূপ চালুর উদ্দেশ্যে মাও 'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' নীতি গ্রহণ করেন।
এর লক্ষ্য ছিল কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়াতে ব্যাপক মানুষকে শ্রমে নিয়োজিত করা। কিন্তু এর উল্টো ফল হিসেবে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং এর সাথে খারাপ ফলন যুক্ত হয়ে তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে তিন কোটিরও বেশি মানুষ মারা যায়।
পরবর্তীতে এই নীতি বাতিল করা হলে মাওয়ের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় ১৯৬৬ সালের ১৬ই মে মাও 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব' শুরুর আদেশ জারি করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল দেশকে 'অশুদ্ধ' উপাদানমুক্ত করা এবং বিপ্লবী চেতনা ফিরিয়ে আনা।
মাও জেদং মনে করেন, "এটা হবে এক নতুন বিপ্লব - এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। যে বিপ্লব ঘটবে মানুষের চিন্তায়। এর লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মনে যে সব পুরোনো ধ্যানধারণা আর অভ্যাস ছিল - সেগুলো সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা। মাও বিশ্বাস করতেন, এগুলো কমিউনিজমের পথে অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।"
এতে তার সহযোগী ছিলেন লক্ষ লক্ষ তরুণ - যাদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল রেড গার্ড নামের এক বাহিনী। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাও জেদংয়ের রেড গার্ডরা চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
সেসময় সাংস্কৃতিক বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন রেড গার্ডের সদস্য সো ইয়ং। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এই বিপ্লবের স্মৃতি বিবিসিকে বলেছিলেন তিনি।
পুরোনো যে কোন কিছুই তাদের দ্বারা আক্রান্ত হলো। এর ফলে চীনের সামাজিক কাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বস্তু ছিলেন ভূস্বামীরা। এরা ছিলেন এক সময়কার ধনী এলিট। যারা তাদের কথা শুনছিল না। তাদের জন্য প্রকাশ্যে অপমান করা হতে লাগলো।
পুরো চীন জুড়ে রেডগার্ডরা এই কর্মসূচি চালু করলো - এর শিকার হলেন স্থানীয় কর্মকর্তারা এমনকি ছাত্ররাও। তাদের প্রকাশ্যে তিরস্কার করা হতো, কখনো কখনো শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হতো।
এই রকম গণ অপমান কর্মসূচির একটা বড় লক্ষ্য ছিল শিক্ষকরা।
সারা চীন জুড়ে ক্লাসরুম আর লেকচার হলে শিক্ষকদের গালাগালি এবং অপমান করতো ছাত্ররা। তাদের পরিয়ে দেয়া হতো গাধার টুপি, বা তাদের ভুল স্বীকারের চিহ্ন।
কাউকে কাউকে কলমের কালি খাইয়ে দেয়া হতো, বা মাথার চুল কামিয়ে দেয়া হতো। কারো কারো গায়ে থুথু ছিটানো হতো। অনেককে আবার মারধরও করা হতো। কিছু ক্ষেত্রে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।
তাদের ভাষায়, শিক্ষকরা ছিল বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী তাই তাদের বিশ্বাস করা যাবে না।
রেড গার্ড এর সদস্য সো বলছিলেন, তার একজন শিক্ষককে যেভাবে অপমান করা হলো, সেখানে তিনি কিছুই করতে পারেননি।
"১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আমি ভাবতে শুরু করলাম যে এটা আমরা কি করছি। আমি উপলব্ধি করলাম যে পরিস্থিতি মাও এর নিয়ন্ত্রণে নেই। সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ন্ত্রণ করার কোন উপায়ও তার হাতে নেই" বলেন তিনি।
১৯৬৪ সালে প্রকাশিত মাও সে–তুংয়ের বিখ্যাত উদ্ধৃতিসংকলন 'লিটল রেড বুক' বইটি চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় হয়ে ওঠে একধরনের 'অবশ্যপাঠ্য'।
মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেছিলেন পার্টির শোধনের জন্য। কিন্তু একটা সময় রেড গার্ডকে নিয়ন্ত্রণ করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়লো। যে কেউ তাদের শিকার হতে পারতো।
ওই সময় চীনে ১৫ লাখ মানুষ মারা যায় এবং দেশের বড় অংশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যায়।
এই বিপ্লবের সময় দলটির প্রেসিডেন্ট শিয়াও বহিষ্কৃত হন এবং অনেকটা একাকী অবস্থায় মারা যান। মাও জেদং এর উত্তরাধিকারী মার্শাল লিম্বাও দেশ থেকে পালিয়ে যান, পরে মঙ্গলিয়াতে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন।
মাও জেদং এর স্ত্রী জ্যানজিং এবং তার সহযোগীরা মিলে গড়েন গ্যাং অব ফোর। যারা সেসময় খানিকটা উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে দলের ভেতরে বামপন্থী এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেন।
অবশেষে ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে বহু শহর প্রায় নৈরাজ্যের মুখে পড়লে মাও জেদং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী নামান।
আপাতত এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিজয় হয়েছে মনে হলেও মাও জেদংয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তবে জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালান।
১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফর করে মাওয়ের সাথে দেখা করেন।
১৯৭৬ সালের নয়ই সেপ্টেম্বর মাও জেদং মারা যান।