সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের কারণে আরবের কিছু দেশে কেন জেল বা নির্বাসন হতে পারে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, বিবিসি নিউজ আরবি
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, উপসাগরীয় দেশগুলোয় এমন অনেক ব্যক্তিকে আটক, বিচারের আওতায় আনা এবং বহিষ্কার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত কনটেন্ট পোস্ট করার অভিযোগ রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা যেমন জারি করেছে, আবার বিচারিক আপিলের সুযোগ সীমিতও করেছে। একইসঙ্গে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ করেছে, যার মধ্যে ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব বাতিল করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাহরাইন ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করার পর দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, "শত্রুভাবাপন্ন ইরানি কর্মকাণ্ডকে প্রশংসা বা সমর্থন করা, অথবা বাইরের পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার কারণে এসব ব্যক্তির বাহরাইনি নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে"।
নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ও কর্মীদের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে।
এসব পদক্ষেপকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
বাহরাইন ও কুয়েতে আটক ব্যক্তিরা বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ মানুষ।
এই দেশগুলো বলছে, অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়া, ভুয়া খবর ছড়ানো, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দুর্বল করার মতো অন্যান্য কর্মকাণ্ড।
সংঘাতের শুরুর দিকেই কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ তাদের ভূখণ্ডে ইরানি হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত ভিডিও বা তথ্য ধারণ ও প্রকাশ করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল।
বাহরাইন ও কুয়েতে আটক ব্যক্তিদের পরিবার বলছে, তারা আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছামতো বা স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, যার মধ্যে ন্যায্য বিচারের সুযোগ না দেওয়া বা দোষী সাব্যস্তদের নাগরিকত্ব বাতিলও থাকতে পারে।
কুয়েতে নতুন নাগরিকত্ব আইন এবং বাহরাইনে সাম্প্রতিক এক রাজকীয় ডিক্রি জারির পর এমনটা ঘটেছে।
একজন কুয়েতি কর্মী, যিনি পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন, কর্তৃপক্ষ অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ চালু করে।
তার মতে, এর মধ্যে কিছু সড়কে নিরাপত্তা চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা মোবাইল ফোন তল্লাশি করে বার্তা, ছবি ও ভয়েস নোট পরীক্ষা করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
কুয়েতে সাংবাদিক শিহাব-এলদিনকে খালাস
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সোশাল মিডিয়ার অপব্যবহারের অভিযোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে আটকে রাখা ও তদন্তের পর কুয়েতের নিরাপত্তা আদালত ২৩শে এপ্রিল ১৩৫ জনের বিরুদ্ধে রায় দেয়।
সামাজিক মাধ্যম-সম্পর্কিত মামলায় ১৭ জন আসামিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
একজন ফেরারি আসামিকে মোট ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালত ১০৯ জনকে শাস্তি না দিয়ে নির্দিষ্ট পোস্ট মুছে ফেলতে নির্দেশ দেয়, আর নয়জনকে খালাস দেয়।
সবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং ভুয়া খবর ছড়ানো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খালাসপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন আহমেদ শিহাব-এলদিন, যিনি মার্চের শুরুর দিকে কুয়েতে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আটক হয়েছিলেন।
তিনি একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, যিনি একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
তার বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এক বিবৃতিতে তার বোন লারা ও লুমার আন্তর্জাতিক আইনি উপদেষ্টা কাউইলফিওন গ্যালাঘার বলেন, "৫২ দিন আটক থাকার পর আহমেদকে সব অভিযোগ থেকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে—এতে আমরা স্বস্তি পেয়েছি।"
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
নাগরিকত্ব বাতিলের আশঙ্কা
মার্চ মাসে কুয়েত একটি ডিক্রি জারি করে, যাতে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে বা "ইচ্ছাকৃতভাবে তার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন করে" এমন উপাদান প্রকাশের জন্য তিন থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার কুয়েতি দিনার (১৬ হাজার ২৫০ থেকে ৩২ হাজার ৫০০ ডলার) জরিমানার বিধান রাখা হয়।
সরকার আরও ঘোষণা দেয় যে জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ের জন্য বিশেষ আদালত গঠন করা হচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মাহমুদ শালাবি বলেন, এসব পদক্ষেপ ব্যাপক আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করেছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
বিবিসি নিউজ একজন কুয়েতি নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেছে, যার এক আত্মীয় যুদ্ধের শুরুতে আটক হয়েছিলেন।
তিনি জানান, সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে গ্রেফতার করা হচ্ছে, এর মধ্যে পোস্টে লাইক দেওয়া বা প্রতিক্রিয়া জানানোও অন্তর্ভুক্ত, এমনকি খামেনির মৃত্যুর জন্য শোকপ্রকাশ করাও।
নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়া এই ব্যক্তি বলেন, বেশিরভাগ আটক ব্যক্তি শিয়া সম্প্রদায়ের, যা তার মতে- অনেককে সোশাল মিডিয়ায় মত প্রকাশে দ্বিধায় ফেলছে।

ছবির উৎস, Getty Images
একই ব্যক্তি জানান, আটক কিছু ব্যক্তিকে কুয়েতের কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে, যাদের মধ্যে গর্ভবতী নারীরাও রয়েছেন।
তিনি জানান, বিমান চলাচল বন্ধ থাকার সময় আটক বিদেশি ব্যক্তিদের বহিষ্কারের আগে ডিপোর্টেশন কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আইনজীবীরা আশঙ্কা করছেন দোষী সাব্যস্ত হলে কিছু আটক ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল হতে পারে।
কুয়েতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, ধর্ম অবমাননা বা দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষতি হলে নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করা যেতে পারে।
১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ কুয়েতের সঙ্গে যুদ্ধে থাকা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন এমন কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করেন, তবে তার নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে।
বিবিসি নিউজ এই আটক এবং তাদের পরিস্থিতি নিয়ে কুয়েতি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে বারবার যোগাযোগ করেছে, কিন্তু কোনো জবাব পায়নি।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Kuwait PM's office / Anadolu via Getty Images
বাহরাইনে ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল
কুয়েতে গ্রেফতারের সময়ই বাহরাইনেও একই ধরনের আটকের ঘটনা ঘটে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, দুই দেশেই অনেককে মত প্রকাশের অধিকার চর্চার জন্য বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে, যার মধ্যে 'ভুয়া খবর' ছড়ানো বা সোশাল মিডিয়ার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের গবেষক মাহমুদ শালাবি বিবিসি নিউজকে বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে 'গুরুতর উদ্বেগ' রয়েছে।
তিনি বলেন, "বাহরাইনে কিছু আটক ব্যক্তিকে আইনজীবীর সহায়তা নিতে দেওয়া হয়নি," এবং কুয়েতে সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তনের ফলে "বিচারিক আপিলের একটি স্তর কার্যত বাতিল হয়েছে"।

ছবির উৎস, Getty Images
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ২৭শে এপ্রিল জানায়, "শত্রুভাবাপন্ন ইরানি কর্মকাণ্ডকে প্রশংসা বা সমর্থন করা, অথবা বাহ্যিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের" অভিযোগে ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের সবাই অ-বাহরাইনি বংশোদ্ভূত।
মন্ত্রণালয় জানায়, বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল খলিফার নির্দেশনার ভিত্তিতে এবং জাতীয়তা আইনের ১০ নম্বর ধারার আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ ধারায় "রাজ্যের স্বার্থের ক্ষতি" বা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের দায়িত্বের বিরোধী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের অনুমতি রয়েছে।
এক্স-এর এক পোস্টে বাহরাইন ইনস্টিটিউট ফর রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রাসির অ্যাডভোকেসি পরিচালক সাইয়েদ আহমেদ আলওয়াদায় এই পদক্ষেপকে "দমন-পীড়নের একটি বিপজ্জনক যুগের সূচনা, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকবে" বলে উল্লেখ করেন।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
বাহরাইন বলছে 'অপরাধের কারণে গ্রেফতার'
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এই সংঘাত শুরুর পর বাহরাইনে দমন-পীড়ন বেড়েছে, যার মধ্যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ, যুদ্ধবিরোধী মত প্রকাশ বা অনলাইনে ফুটেজ শেয়ারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রেফতার রয়েছে।
একজন বাহরাইনি কর্মী বিবিসি নিউজকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৩০৪ জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
তিনি বলেন, কিছু লোককে বহিষ্কার করা হয়েছে, অন্যরা আদালতের মুখোমুখি হয়েছেন।
বিবিসি নিউজ এই সংখ্যা নিশ্চিত করতে বাহরাইনের কাছে জানতে চাইলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ওই কর্মীর মতে, এসব মামলার সঙ্গে সোশাল মিডিয়া ব্যবহার এবং জাতীয় নিরাপত্তাজনিত অভিযোগ জড়িত- যেমন বিদেশি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য বা অবস্থান পাঠানো, এবং ভুয়া খবর প্রচার।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
বাহরাইনের কর্তৃপক্ষ বিবিসি নিউজকে জানিয়েছে, গ্রেফতারগুলো শুধুই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে একজন সরকারি মুখপাত্র বলেন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং তার ভাষায় "স্পষ্ট ইরানি আগ্রাসন" মোকাবিলার অংশ হিসেবে কিছু ব্যক্তিকে বাহরাইনের আইন অনুযায়ী আটক করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ইরানের মতো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ, মুখপাত্রের ভাষায় "সন্ত্রাসী সংগঠন" যেমন ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইনে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো - যা "ইরানি আগ্রাসন ও তার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে সমর্থন" হিসেবে বিবেচিত।
এই ঘটনাগুলো এমন সময় ঘটেছে যখন ওই অঞ্চলের আরও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল করার অভিযোগে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে গ্রেফতারের ঘোষণা দিয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বলছে, এগুলোর সঙ্গে ইরানের রেভলুশনারি গার্ডের সম্পর্ক রয়েছে, আবার কিছু লেবাননের হেজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে।








