মাও জেদংকে নিয়ে রসিকতার জন্য ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে

    • Author, কেলি এনজি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

প্রয়াত চীনা নেতা মাও জেদংকে নিয়ে করা মন্তব্যের জেরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে ফরাসি ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বাদ দিয়েছে বেশ কয়েকটি চীনা ব্র্যান্ড।

জানা গেছে, এমবাপ্পে ফরাসি টক শো ‘দ্য ব্রিজ’-এ বলেছেন, যে মিমটি তাকে সবচেয়ে বেশি হাসায়, সেটি হলো একজন চীনা স্বৈরশাসকের মিম।

তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন মাও-এর মতো দেখতে একটি ছবির ওপর তার ছবি বসিয়ে তৈরি একটি মিম ভেসে ওঠে।

"আমি এটা আমার বন্ধুদের সাথে সব সময় ব্যবহার করি," রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড যোগ করেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া যাচাইবিহীন ক্লিপগুলোতে এই মিম দেখানো হচ্ছে।

চীন তার শীর্ষ নেতাদের সমালোচনা বা উপহাসের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে মাও জে দং। তাকে নিয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও, আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট চীনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি গণ্য হন।

তবে, সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পর মাও জে দং সম্পর্কে করা নিজের "বিবেচনাহীন" মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপ্পে।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "আমার মন্তব্যটি বিবেচনাহীন ছিল, এবং এখন আমি বুঝতে পারছি যে এটি চীন এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের অনেক মানুষকে আঘাত করেছে।"

তিনি আরও বলেন, "আমার কথায় যারা কষ্ট পেয়েছেন, তাদের সবার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।"

স্পেনের লা লিগাও ক্ষমা চেয়েছে এবং বলেছে যে, "কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য চীনা ভক্তদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, তার জন্য তারা গভীরভাবে দুঃখিত"।

অনলাইনে দ্রুতই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেখানে কিছু ব্যবহারকারী এমবাপ্পের সমালোচনা করেন। তিনি চীনে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বড় বড় ব্র্যান্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ। সমালোচনা ওঠে, তিনি "চীনা বাজার থেকে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি এমন মন্তব্য করছেন যা চীনা জনগণকে অপমান করে"।

"বিশেষ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের আরও বেশি সম্মান ও সংবেদনশীলতা দেখানো উচিত, কারণ জাতীয় অনুভূতিকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়," ওয়েইবোতে করা আরেকটি মন্তব্যে লেখা ছিল।

মাও জে দং ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের উত্তাল সময়গুলোতে শাসন করেন। তার দ্রুত শিল্পায়নের প্রচেষ্টা, এর ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়।

এরপর আসে সাংস্কৃতিক বিপ্লব; কমিউনিজমের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত সকলের বিরুদ্ধে এক সহিংস শুদ্ধি অভিযান, যার মধ্যে ছিলেন চীনা বুদ্ধিজীবী, ভূস্বামী, শিল্পী এবং প্রায়শই দলের অভ্যন্তরের প্রতিদ্বন্দ্বীরা।

১৯৭৬ সালে তার মৃত্যু চীনের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তার দ্বার উন্মুক্ত করতে শুরু করে। দেশটি মাও-এর শাসন থেকে সরে আসলেও, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাকে এমন এক জাতীয় আদর্শ হিসেবে বরণ করে নিতে থাকে, যার উত্তরাধিকার ছিল প্রশ্নাতীত।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা সিসিটিভি লা লিগার ম্যাচগুলো স্থগিত করছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে চীনা সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পেপার’।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদপত্র দ্য গ্লোবাল টাইমস-এর মতে, সিসিটিভি-র নিউজ অ্যাপগুলোতে ফরাসি স্ট্রাইকার সম্পর্কিত কোনো কন্টেন্ট আর নেই।

তীব্র সমালোচনার মুখে বেশ কয়েকটি চীনা ব্র্যান্ড এমবাপ্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তারা কেন এমন করছে তা স্পষ্টভাবে জানায়নি, তবে এর কারণ হিসেবে আহত অনুভূতির কথা উল্লেখ করেছে।

দেশের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ বলেছে যে, তারা "চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন যেকোনো কথা বা কাজের তীব্র বিরোধিতা করে এবং এ বিষয়ে তাদের শূন্য-সহনশীলতার নীতি রয়েছে"।

পানীয় প্রস্তুতকারক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ডংপেং একই ধরনের ভাষায় একটি বিবৃতি জারি করেছে, "আমাদের কোম্পানি জাতীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী যেকোনো আচরণের তীব্র বিরোধিতা করে এবং এ বিষয়ে আমাদের শূন্য-সহনশীলতার নীতি রয়েছে"।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার মধ্যে ওয়েইবোর শীর্ষ ১০টি ট্রেন্ডিং টপিকের মধ্যে পাঁচটিই ছিল এমবাপ্পেকে কেন্দ্র করে, এবং ‘একাধিক ব্র্যান্ড এমবাপ্পের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাতিল করেছে’ হ্যাশট্যাগটি তালিকার শীর্ষে ছিল।

কিছু ব্যবহারকারী তার সাথে কাজ করে এমন যেকোনো ব্র্যান্ড বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন, আবার অন্যরা রিয়াল মাদ্রিদ বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন।

"কখনো চীনে আসবেন না," ওয়েইবোর শীর্ষ মন্তব্যগুলোর একটিতে এমনটাই লেখা ছিল।

"তিনি চীনা জনগণের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন," আরেকজন ব্যবহারকারী লিখেছেন।

যেহেতু ব্র্যান্ডগুলো বিতর্কিত ক্লিপটির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তাই সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলছেন যে এমবাপ্পে ঠিক কী বলেছিলেন বা করেছিলেন যা আপত্তিকর ছিল।

এমবাপ্পের 'স্বৈরশাসক' উপাধি

২০২৪ সালের অগাস্টে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে অভিষেক হওয়া এমবাপ্পেকে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল কার্যক্রমের ওপর তার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের কারণে ফুটবল বিশ্বে 'দ্য ডিকটেটর' বা 'স্বৈরশাসক' ডাকনাম দেওয়া হয়।

২০২৪ সালে, তিনি দোকানের একটি স্যান্ডউইচের বিবরণে তার নাম ব্যবহার করার জন্য একজন ফরাসি ইনফ্লুয়েন্সার ও কাবাব দোকানের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কেউ কেউ বলেন, এই ঘটনাটি তার 'স্বৈরাচারী' ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করেছিল।

এই ডাকনামটি এমবাপ্পেকে অনলাইনে অনেক মিমের বিষয়বস্তুতেও পরিণত করেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপের সময় ফরাসি সতীর্থ উসমান দেম্বেলে এমবাপ্পেকে 'মোবুত' বলে ডেকে এই ধারায় যোগ দেন – যা ছিল মোবুতু সেসে সেকোর প্রতি একটি ইঙ্গিত, যিনি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (পূর্বতন জায়ার)-কে তিন দশক ধরে শাসন করেছিলেন।

সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ফুটবলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে এই মিমগুলোর পেছনের হালকা মেজাজকে স্বীকার করলেও বলেন, এগুলো "কখনও কখনও মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ও মানবিক সচেতনতার অভাব প্রকাশ করে"।

"এর একটা দিক আছে যা কিছুটা কম মজার, কারণ আমরা জানি ইতিহাসে এই ধরনের লোকেরা কী ধরনের ক্ষতি করেছে"।

"যারা অন্যকে খুন করে, বা কোটি কোটি মানুষকে দুর্দশাগ্রস্ত করেছে, তাদের সাথে আমার তুলনা... আমার মনে হয় না আমি জীবনে এমনটা করেছি," তিনি বলেছিলেন।

রিপোর্টিংয়ে সহায়তা করেছেন ফ্যান ওয়াং এবং ওসমন্ড চিয়া।