আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
হান্টাভাইরাস নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ আছে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘুরতে বের হওয়া একটি জাহাজে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
এক মাস আগে আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা 'এমভি হন্ডিয়াস' নামের জাহাজে থাকা বা এতে ভ্রমণের পর এখন পর্যন্ত তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে। চিকিৎসার জন্য আরও চারজনকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভাইরাসটির সংস্পর্শে আসতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিমানে করে ফিরে গেছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, সাধারণ জনগণের জন্য ঝুঁকি কম। তাহলে আমাদের কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
কীভাবে আলোচনায় এই ভাইরাস?
বিশ্বের দক্ষিণতম শহর আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে এমভি হন্ডিয়াস পহেলা এপ্রিল যাত্রা শুরু করেছিল। ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস পরিচালিত এই বিলাসবহুল ক্রুজটি আর্জেন্টিনা থেকে ব্রিটিশশাসিত দক্ষিণ জর্জিয়া অঞ্চলে যাওয়ার কথা ছিল।
জাহাজটি এমন এক সমুদ্রযাত্রায় ছিল যেখানে যাত্রীদের আটলান্টিকের সবচেয়ে দুর্গম ও অদেখা কিছু ভূখণ্ড অতিক্রম করে জীবনের সেরা এক ভ্রমণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
প্রাথমিকভাবে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু এই জাহাজে ছিলেন বলে জানা গেছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিপিন্স, রাশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ছিলেন এতে।
১১ই এপ্রিল, একজন ডাচ ব্যক্তি জাহাজে মারা যান। তার মৃত্যুর কারণ অজানা ছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ২৪শে এপ্রিল তার স্ত্রীর সাথে সেন্ট হেলেনায় জাহাজ থেকে তার মরদেহ নামানো হয়।
ওই নারীকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কর্তৃপক্ষ জানায় যে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে তিনি মারা গেছেন। এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিশ্চিত করেছে যে ৬৯ বছর বয়সী ওই নারী হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।
এরপর, দোসরা মে জাহাজের যাত্রী একজন জার্মান নাগরিকও মারা যান, ফলে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে তিন হয়।
বুধবার, দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ভাইরাসটির অ্যান্ডিস স্ট্রেইন, যা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ছড়ানোর জন্য পরিচিত, সেটি জাহাজ থেকে দেশে সরিয়ে আনা দুইজন ব্যক্তির শরীরে শনাক্ত করা হয়েছে।
জাহাজটি সেন্ট হেলেনায় নোঙর করার পর সাতজন ব্রিটিশ নাগরিকসহ ৩০ জন যাত্রীও নেমে গিয়েছিলেন। তাদের সকলের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হন্ডিয়াস জাহাজের অপারেটর ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস।
তারা আরও জানিয়েছে যে, দুজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ নেদারল্যান্ডস থেকে আসছেন এবং কেপ ভার্দে থেকে জাহাজটির প্রত্যাশিত যাত্রার পর সম্ভব হলে তারা জাহাজটিতে আরোহণ করবেন।
পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলবর্তী দ্বীপপুঞ্জ কেপ ভার্দের কাছে তিন দিন নোঙর করে থাকার পর এমভি হন্ডিয়াস এখন স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করছে।
হান্টাভাইরাস কী
হান্টাভাইরাস বলতে এমন এক ধরনের ভাইরাসকে বোঝায়, যা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে থাকে। প্রধানত ইঁদুরের শুকনো মল থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণা শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সিডিসি)-এর মতে, সাধারণত ইঁদুরের প্রস্রাব, মল বা লালা থেকে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে সংক্রমণ ঘটে।
যদিও বিরল, তবুও ইঁদুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে।
এই ভাইরাস দুটি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রথমটি হলো হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম বা এইচপিএস। এতে সাধারণত শুরুতে ক্লান্তি, জ্বর ও পেশিতে ব্যথা দেখা যায়। পরে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, কাঁপুনি এবং পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সিডিসি'র মতে, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত উপসর্গ দেখা দিলে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৮ শতাংশ।
দ্বিতীয় রোগটি হলো হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম বা এইচএফআরএস, যা আরও গুরুতর এবং প্রধানত কিডনিকে আক্রান্ত করে।
পরবর্তী উপসর্গের মধ্যে থাকতে পারে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং কিডনি বিকলতা।
বিশ্বে কী পরিমাণ মানুষ হান্টাভাইরাসে সংক্রমিত হয়?
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের একটি প্রতিবেদনের মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক এক লাখ ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে হান্টাভাইরাসের গুরুতর সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়, যার বড় অংশই ইউরোপ ও এশিয়ায়। আর এসব সংক্রমণের অর্ধেকেরও বেশি সাধারণত চীনে ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে হান্টাভাইরাস নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে।
তবে হান্টাভাইরাসের একটি প্রধান ধরন সিউল ভাইরাস বহন করে নরওয়ে ইঁদুর, যা ব্রাউন র্যাট নামেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী এই ইঁদুর দেখা যায়।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
এর চিকিৎসা কীভাবে করা হয়?
হান্টাভাইরাস সংক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।
উপসর্গ অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসার পরামর্শ দেয় সিডিসি, যার মধ্যে থাকতে পারে অক্সিজেন থেরাপি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং এমনকি ডায়ালাইসিস।
গুরুতর উপসর্গ থাকা রোগীদের আইসিইউতে ভর্তি করতে হতে পারে। মারাত্মক ক্ষেত্রে কারও কারও ইন্টিউবেশন বা কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস প্রয়োজন হতে পারে।
ভাইরাসে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সিডিসি বাড়ি বা কর্মস্থলে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেয়।
সংস্থাটি আরও বলেছে, যেসব জায়গা দিয়ে ইঁদুর ঘরে ঢুকতে পারে, যেমন বেসমেন্ট বা চিলেকোঠার প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে হবে।
ইঁদুরের মল পরিষ্কার করার সময় দূষিত বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢোকা এড়াতে মাস্ক বা সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহারেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হান্টাভাইরাস সংক্রমণের আর কোন ঘটনা ঘটেছে?
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়া হান্টাভাইরাসের সঙ্গে যুক্ত শ্বাসজনিত রোগে মারা যান। চিকিৎসা তদন্তকারীদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে সাধারণ ধরন এইচপিএস-এ আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়।
যে বাড়িতে তাকে পাওয়া যায়, সেখানে বাইরের অন্যান্য ঘরে ইঁদুরের বাসা ও কিছু মৃত ইঁদুর পাওয়া যায়।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে আরাকাওয়া ইন্টারনেটে ফ্লু ও কোভিডের উপসর্গ সম্পর্কে তথ্য খুঁজেছিলেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
'মহামারির সূচনা নয়'
এমভি হন্ডিয়াসে হান্টাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা কোনো 'মহামারির সূচনা নয়' বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
সংস্থাটির সংক্রামক রোগের মহামারি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কেরখোভে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ছয় বছর আগে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আর এটি এক নয়, কারণ হান্টাভাইরাস ছড়ায় "ঘনিষ্ঠ, অন্তরঙ্গ সংস্পর্শের" মাধ্যমে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ডাচ জাহাজ এমভি হন্ডিয়াস থেকে সম্প্রতি নেমে যাওয়া কয়েক ডজন মানুষকে শনাক্ত করতে তৎপরতা চালাচ্ছে।
সাধারণত হান্টাভাইরাস ইঁদুরজাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ালেও সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাবে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত হয়েছে বলে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক ও সহজে ছড়িয়ে পড়া রোগের বিপরীতে, এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী হান্টাভাইরাসের অ্যান্ডিস স্ট্রেইনটি ততটা সংক্রামক নয়।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ সম্ভব হলেও বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের ঝুঁকি কম রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবারের ব্রিফিংয়ে ভ্যান কেরখোভে বলেন, "এটি কোভিড নয়, এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়—এটি একেবারেই ভিন্নভাবে ছড়ায়"।
তিনি জানান, এমভি হন্ডিয়াসে "সবার জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক" করার অনুরোধ জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও বলেন, সন্দেহভাজন রোগীদের সংস্পর্শে থাকা বা তাদের দেখভাল করছেন এমন ব্যক্তিদের "উচ্চ মাত্রার ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম" ব্যবহার করা উচিত।
একই ব্রিফিংয়ে ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস ঘেব্রেইয়েসুস বলেন, তার সংস্থা "সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কম বলে মূল্যায়ন করেছে"।
তিনি বলেন, নিশ্চিত হওয়া প্রথম দুই আক্রান্ত ব্যক্তি "আর্জেন্টিনা, চিলি এবং উরুগুয়ে সফর করেছিলেন। তারা পাখি দেখতে বেরিয়েছিলেন এবং এমন সব স্থানে তারা গিয়েছিলেন, যেখানে ভাইরাস বহনকারী হিসেবে পরিচিত ইঁদুরের প্রজাতি উপস্থিত ছিল"।
ডা. টেড্রোস জানান, যাদের উপসর্গ রয়েছে এবং যারা যাত্রীদের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন—এমন আরও কিছু মানুষের খবর ডব্লিউএইচওর জানা আছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই রোগের ইনকিউবেশন সময়—যা ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে—বিবেচনায় নিয়ে আরও সংক্রমণের ঘটনা সামনে আসতে পারে।