'বাবা' নিয়ে জনপ্রিয় পাঁচটি গানের গল্প

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, অর্চি অতন্দ্রিলা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
'মা'কে নিয়ে যে পরিমাণে গান তৈরি হয়েছে বা যত পরিচিতি পেয়েছে, সে তুলনায় 'বাবা' নিয়ে গান সেভাবে কমই দেখা যায়। তবে আধুনিক সময়ে 'বাবাকে' নিয়ে তৈরি হওয়া বেশ কিছু গানই মানুষের মনে ছাপ ফেলেছে।
জনপ্রিয়তা, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং দীর্ঘ দিন ধরে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেওয়ার মতো বিষয় বিবেচনায় কয়েকটি গান বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।
এসব গান তৈরির পেছনের গল্প বা ইতিহাস সম্পর্কে কী জানা যায়?
'বাবা' - জেমস

ছবির উৎস, Channel i
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে নগর বাউলখ্যাত জেমসের কণ্ঠে গাওয়া 'বাবা' গানটির অবস্থান অনেক এগিয়ে। "বাবা কতদিন, কতদিন দেখিনা তোমায়, কেউ বলেনা তোমার মত কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়" এই গানটিকে বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে বাবাকে নিয়ে সবচেয়ে আবেগঘন আধুনিক গানের একটি হিসেবেও দেখেন অনেকে।
গানটির গীতিকার এবং সুরকার প্রিন্স মাহমুদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফারুক মাহফুজ আনাম বা জেমস নাকি এই গানটি গাইতেই আগ্রহী ছিলেন না। শিল্পী ও সুরকার তানভীর তারেকের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে সেটি উল্লেখ করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারটি তানভীর তারেকের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়।
"রেকর্ডিং-এ জেমস ভাই গানটি শুনে… এই কয়েকদিন আগে মা বললাম, এখন কী বাবা... কেমন কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে প্রিন্স। তখন আমি বললাম জেমস ভাই, এটা গাইতে হবে। জেমস ভাই বলে কী, আরেকটা গান দে আমারে," সে সাক্ষাৎকারে বলছিলেন মি. মাহমুদ।
তখন স্টুডিওতে প্রয়াত শিল্পী হাসান আবেদুর রেজা জুয়েলও ছিলেন এবং প্রিন্স মাহমুদ তাকে বলার পর তখন তিনি গানটি গাইতে রাজি হন। "জুয়েল ভাই তখন 'বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়' এটা গেয়ে ফেলছে, তখন আমি জুয়েল ভাইকে বললাম আপনি বাবা গানটি গান, জেমস ভাইকে এটা দিয়ে দেই" বলছিলেন তিনি।
পরের দিন আবারও স্টুডিওতে আসেন তারা তিনজন। জেমস তখন 'বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়' গানটা শুনে রেকর্ডিং শুরুর ঠিক আগে আবার বাবা গানটা শুনতে চান। "এদিকে জুয়েল ভাই তো বাবা গানটা মোটামুটি বোধহয় তুলে ফেলছে, কিন্তু জুয়েল ভাই এত ভালো মানুষ ছিল… পরে জেমস ভাই এসে বলে ঠিক আছে এটাই গাই।"
নব্বই দশকের শেষদিকে এসে প্রকাশিত সেই গান এখনও বাবা দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বাবাকে হারানোর বেদনা আর স্মৃতিমেশানো সেই গান অনেকের জন্য গভীর আবেগের কারণ হয়।
'আয় খুকু আয়' - হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদার
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাবাকে নিয়ে বাংলা গানের ইতিহাসে বড় সাড়া জাগানো গান 'আয় খুকু আয়'। গানটি প্রকাশের ৫০ বছর হয়েছে।
এর গীতিকার ছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুরকার ছিলেন পণ্ডিত ভি. বালসারা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের কণ্ঠে গানটি জনপ্রিয়তা পায়।
গানটি পরবর্তীতে আরও অনেকেই নতুন করে গেয়েছেন। কিন্তু সত্তরের দশকের সেই গানটিই আবেদন ধরে রেখেছে মানুষের মনে।
গানটি মূলত শ্রাবন্তী মজুমদারের অ্যালবামের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর সুরকার ভি. বালসারার প্রাথমিকভাবে গানটি পছন্দ হয়নি, কারণ এতে কিছু ইংরেজি শব্দ বা আধুনিক ধাঁচের রূপ ছিল সেটার তেমন প্রচলন সেসময় ছিল না; কলকাতার ডিডি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে এভাবে বর্ণনা করেছিলেন মিজ মজুমদার।
তার আগ্রহেই সুরকার বালসারা রাজি হন এবং তিনি চেয়েছিলেন গানটি তার সাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইবেন। তারা একসাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে যান।
"আমার বুক দুরু দুরু করছে যদি হেমন্তদা বলেন আমি করবো না… হেমন্তদা পড়েই বললেন- আমি গাইবো" বলেন মিজ মজুমদার।
তিনি ভি. বালসারাকে অনুরোধ করেন যেন সুরটা খুব 'সিম্পল ও মনোটনাস' হয় যেন সবাই সহজে গাইতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images
এরপর বাধা হয়ে দাঁড়ালো গানটা লম্বা হয়ে যাওয়া।
"গানটা এত বড়, আমাদের তো তখন সাড়ে ছয় মিনিটের বেশি করা যাবে না। তো মি. বালসারা, আমি আর পুলকদা গেলাম হেমন্তদার কাছে। মি. বালসারা গিয়ে বললেন যে হেমন্তদা, যদি শেষের দুটা ভার্স (লাইন) বাদ দিয়ে দেওয়া যায় তাহলে গানটা ঠিকমতো মিউজিকে আসে"।
এভাবে বেশ অনেকগুলো সাক্ষাৎকারেই বর্ণনা করেন মিজ মজুমদার।
তার ভাষায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন "গানের ওই ভার্স যদি বাদ দাও তাহলে আর গানটা দাঁড়ায় না, তুমি তোমার মিউজিক বাদ দিয়ে দাও, ফেলে দাও। এই দুটো ভার্স থাকতেই হবে"।
পরে সেসব রেখেই মিউজিক কম্পোজ করেন মি. বালসারা।
সেসময় গানের রেকর্ডিং এখনকার মতো বারবার করার সুযোগ ছিল না। সবাই মিলে একসাথে এক-দুইবারে যেমন হয়। এইটা তিনবার রেকর্ড করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে গানটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

'বাবার মুখে শুনেছিলাম গান' - এন্ড্রু কিশোর
"আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, সেদিন থেকে গানই জীবন, গানই আমার প্রাণ" গানটি ১৯৮৪ সালের নয়নের আলো চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
গানটির সুরকার ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এবং গেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর।
নয়নের আলো চলচ্চিত্রের শুধু এই গানটিই না, প্রায় সবগুলো গানই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। যেমন আমার বুকের মধ্যেখানে, আমার সারা দেহ খেও গো মাটি, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো, এমন বেশ কিছু গান।
প্রয়াত আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ২০১৪ সালে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই চলচ্চিত্রের গানের কাজ পাওয়া 'হিমালয় পর্বতের চূড়ায় ওঠা'র মতো ছিল।
সেসময় অনেকের মাঝে বসিয়ে কড়া মন্তব্যের মুখে তাকে পড়তে হতো বলছিলেন তিনি।
"ঐ সময় তো সাউন্ডপ্রুফ রুম ছিল না, আমার বাসায় বসে বসে টিউন করতাম, ক্যাসেট রেকর্ডারে গানগুলো ধারণ করতাম। তো কখন মুরগি ডাকলো কখন কুকুর ডাকলো সেটা আমি শুনতে পেতাম না। ওরা ঠিকই গান শুনতে গিয়ে বলতো, এই মুরগী ডাকলো কেন, কুকুর ডাকলো কেন? গান আবার ঠিক করে নিয়ে আসো। এটা করতে করতে আমার জীবন বার হয়ে গেছে, এটা আমার মনে পড়ে" বলেছিলেন তিনি। আগে দেশাত্মবোধক গান করলেও নয়নের আলো'র জন্য গান তৈরিকে নিজ ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলে জানান তিনি।
সুরকার ও সংগীত পরিচালক ইমন সাহা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ক্যারিয়ারের প্রথম দিককার সময়ে মি. বুলবুল তার বাবা সত্য সাহার কাছ থেকে নানা ধরনের পরামর্শ নিতেন।
"বাবা বলছে দেখ, যেটাই, করিস না কেন, আমাদের গ্রামীণ অডিএন্সটাকে, মাথায় রাখিস। ফিল্মের অডিএন্স কিন্তু গ্রামের অডিএন্স, ফোক বেজ যদি কিছু করিস তাহলে দেখবি যে জিনিসটা খুব সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। নয়নের আলো ছবির গানগুলি শুনলেই বুঝবেন যে কোথায় জানি, একটা মাটির গন্ধ আছে" বলছিলেন ইমন সাহা।
ব্যক্তিগতভাবে বাবা নিয়ে নয়নের আলো চলচ্চিত্রের গানটি ছোটবেলা থেকেই গুনগুন করে গাইতেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
সরাসরি বাবা নিয়ে না, কিন্তু
এমন বেশ কিছু গান রয়েছে যেগুলো ঠিক বাবাকে নিয়ে গান না, কিন্তু মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। এর মাঝে প্রথমেই থাকবে মান্না দের 'তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে' যেটি মেয়েকে নিয়ে বাবার গান।
গানটি নিয়ে মান্না দে তার আত্মজীবনী 'জীবনের জলসা ঘরে' বইতে উল্লেখ করেছেন, গীতিকার মিল্টু ঘোষের লেখা গানটি সুপর্ণকান্তি ঘোষকে গানটি সুর করতে বলেছিলেন তিনি সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণকান্তিকে তিনি খোকা বলতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই খোকার গানটির কথা সেভাবে পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেটা অবিবাহিত তরুণ খোকার জন্য স্বাভাবিক বলেই বর্ণনা করেন তিনি।
"মেয়েকে বিদায় দেওয়ার নাড়ী-ছেঁড়া অসহ্য যন্ত্রণার সে অভিজ্ঞতা আমার আছে। দু'-দু'বার সেই নাড়ী-ছেঁড়া যন্ত্রণায় কেঁদেছি আমি। তাই আমি জানি ভাষাটা সত্যিই মনের কথা থেকেই হয়েছে" মান্না দে লেখেন।
দুই জন কন্যাসন্তানের পিতা হিসেবে মান্না দে'র মন ছুঁয়েছিল সেই গান।
আরেকটি 'গান বাবা বলে গেল আর কোনোদিন গান করো না' যেটি লিখেছেন আমজাদ হোসেন, সুর করেছেন আলাউদ্দিন আলীর ও গেয়েছেন শামীমা ইয়াসমিন দিবা। বাবার শাসন থেকে শুরু হওয়া এই গানটির মূল থিম অবশ্য 'গান গাওয়া', বাবা নয়। তবে 'জন্ম থেকে জ্বলছি' চলচ্চিত্রের এই গানটি অনেক বেশি পরিচিত।
বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ - তানভীর ইভান
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব পরিচিত হয়ে ওঠা গান 'বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ, বলো তোমার মতো করবে কে শাসন'। পিরান খানের সুরে গাওয়া এই গানটি মূলত 'আপন' নামের একটি নাটকের জন্য গাওয়া হয়েছিল।
এনিয়ে শিল্পী তানভীর ইভান দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন নাটকটির "পরিচালক অমি ভাই পিরানকে ফোন করে বলেন, বাবাকে নিয়ে একটা গান লাগবে। পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আমরা বসে গানটা তৈরি করি। তানজিব সৌরভের লেখা কথায় সুর করেন পিরান। মেহেদীবাগের (চট্টগ্রাম) স্টুডিওতে গানটা তৈরি করি"।
এই গানটির ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া ছাড়াও গানটি শুনে মি. ইভানের বাবা-মা আবেগে কেঁদেছেন, সেটা তার জন্য একটা বড় পাওয়া।
আরও অনেক গানই আছে বাবা নিয়ে যেগুলো মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। যেমন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা সৈয়দ আব্দুল হাদীর গাওয়া 'বাবার কথা মনে পড়ে,' আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে 'বাবা তোমার কথা মনে পড়ে' আসিফ আকবরের 'বাবা নেই', গীতিকবি মিল্টন খন্দকারের 'আমি যাচ্ছি বাবা' (গেয়েছেন ঝিনুক) বা 'বাবা তোমার ছেলে আজ বড় হয়েছে' (গেয়েছেন মনির খান), এমন অনেক গানই রয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে 'জংলি' চলচ্চিত্রে প্রিন্স মাহমুদের পরিচালনায় 'বাবা তোমায় ছাড়া' গানটিও বেশ পরিচিতি পেয়েছে।








