আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
হেফাজতের নেতৃত্বে ঐক্য প্রক্রিয়ায় মতবিরোধ, সন্দেহ কেন জামায়াতের
- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বেশ আঁটঘাট বেঁধে কার্যক্রম শুরু করেছিলো ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে সেই ঐক্য এখনো অটুট আছে এবং তারা একটি রাজনৈতিক জোট হিসেবেই কাজ করছে। অন্যদিকে, জামায়াতকে দূরে রেখে কওমী ধারার ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে সম্প্রতি আরেকটি ঐক্য গড়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, যেখানে মূল সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করছে হেফাজতে ইসলাম।
সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১টি দলকে নিয়ে গঠিত হয়েছিলো ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট। নির্বাচনের একেবারে আগমুহূর্তে সেই জোট থেকে বেরিয়ে আসে ইসলামী আন্দোলন। তবে বাকিরা থেকে যায়।
এই ১১ দল যখন লং মার্চসহ সরকারবিরোধী আন্দোলনের নানা তোড়জোড় করছে, তখনই কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে ইসলামী দলগুলোর নতুন আরেকটি জোটের গঠনের চেষ্টার কথা সামনে আসছে।
নতুন সম্ভাব্য এই জোটে ১১ দলীয় ঐক্য থেকেও অন্তত দুটি দল থাকছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীকে রাখা হয়নি।
ফলে নতুন এই ইসলামী ঐক্য আসলে কী কারণে- সেটা নিয়ে রাজনীতিতে চলছে নানা আলোচনা।
আবার ঐক্য প্রক্রিয়ার শুরুতেই দলগুলোর মধ্যে নানা মতপার্থক্যও দেখা যাচ্ছে।
ঐক্য প্রক্রিয়ায় কারা? লক্ষ্য কী?
হেফাজতে ইসলামের ঐক্যপ্রক্রিয়ায় মূলত সাতটি দলকে ডাকা হয়েছে। সাতটি দলই কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক।
দলগুলো হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
হেফাজতে ইসলাম নিজে কোনো রাজনৈতিক দল না হলেও এই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।এছাড়া ওই সাতটি দলের নেতারা সম্পৃক্ত আছেন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে।
"আমরা চাই এই সাতটি ইসলামি দল একসঙ্গে থাকুক। আমরা দেখেছি নির্বাচনের আগে-পরে তারা বিভক্ত হয়েছে, তৃণমূলে কাঁদা-ছোঁড়াছুড়ি হয়েছে। এখন বিভক্তি দূরে ঠেলে এই সাতটি দল মিলে একসঙ্গে বসে একসঙ্গে পরামর্শ করে একসঙ্গে চলুক। আমরা শুধু এটাই চাই। এটাই মূল লক্ষ্য," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীরউল্লাহ।
তবে কয়েকমাস ধরে দলগুলোর ঐক্য চেষ্টায় কয়েক দফায় বৈঠক হলেও ঐক্য চূড়ান্ত হয়নি। এমনকি দলগুলোর ঐক্যের কোন রূপরেখা কিংবা উদ্দেশ্যও নির্দিষ্ট হয়নি।
বরং দলগুলোর কর্মসূচি এবং চাওয়া-পাওয়ায় ভিন্নতা থাকায় ঐক্য গড়ার আগেই নানা প্রশ্ন এবং মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
'ইসলামী দলগুলোর ঐক্যে' জামায়াত কেন নেই?
ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যে সাতটি দল আছে তারা মূলত কওমি ও দেওবন্দ ঘরানার। এর বাইরে কোনো দলকে রাখা হয়নি।
বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল জামায়াতে ইসলামীও এই জোটের উদ্যোগে নেই।
আবার কওমি ঘরানার ছোট ছোট কয়েকটি দলকেও বাদ রাখা হয়েছে।
জানতে চাইলে সাতটি দলের একটি দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালউদ্দীন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, দলবৃদ্ধির বিষয়টি ইতোমধ্যেই ফোরামে তোলা হয়েছে।
"এটা ইতোমধ্যেই আলোচনা হয়েছে যে, আরো কিছু ছোট ছোট দল আছে। তাদেরকেও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না। তবে যা করা হবে, সেটা সাত দলের সম্মতি নিয়েই হতে হবে -আলোচনায় এমন মত এসেছে।"
তবে দলগুলোর বৈঠকে জামায়াতের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কোনো কথা হয়নি বলে জানাচ্ছেন বিভিন্ন দলের নেতারা।
জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীর উল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেন, জামায়াতকে না রাখার পেছনে "আক্বিদাগত ব্যাপার আছে"।
"জামায়াত আমাদের শত্রু না। কিন্তু তাদের আক্বিদা (মতাদর্শ) ভিন্ন। আমরা মনে করি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের যে মতাদর্শ, এই মতাদর্শ থেকে তারা বাইরে। এইজন্য জামায়াতকে নেওয়া হচ্ছে না। তাদের সঙ্গে আমাদের যে দূরত্বটা, সেটা কোনো রাজনৈতিক দূরত্ব নয়, বরং ধর্মীয় ইস্যু।"
ঐক্যের শুরুতেই মতপার্থক্য
হেফাজত চায় সাতটি দলের ঐক্য। কিন্তু সাতটি দলের মধ্যে কোনো দল আছে বিএনপির সঙ্গে, যেমন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। কোনো দল আছে জামায়াতের সঙ্গে, যেমন মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। আবার কোনো দল আছে যারা কোনো জোটেই নেই- যেমন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
হেফাজত চায় সাতটি দল একজোট হলে তারা আর অন্য কোনো জোটে না থাকুক। এ বিষয়ে নানা মতামতও এসেছে, দলগুলো থেকে।
দলগুলোর ঐক্য নিয়ে সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় গত ২৭শে সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায়। সেখানে সাত দলের প্রতিনিধিদের বৈঠকে ঐক্যের খসড়া রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। সাত দলের প্রতিটি থেকে পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
তবে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা যায়নি। বিশেষ করে এই ঐক্যে থাকা দলগুলো অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি-না, সেটা নিয়েই মূল মতপার্থ্যক্য দেখা যায়।
আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে, হেফাজত প্রস্তাবিত এই জোটে যারা থাকবে, তারা অন্য কোনো জোটে থাকলে ইসলামী ঐক্য বাস্তবে কার্যকর হবে না।
"এখানে সাতটা দল এক হওয়ার পরও যদি আবার কেউ জামায়াতের দিকে থাকে, কেউ বিএনপির দিকে থাকে, তাহলে তো ঐক্য হয়ে কোনো লাভ নাই। আর এই ঐক্য ফলপ্রসূ কোনো ফলাফল আনবে না। এতে লক্ষ্য অর্জিত হবে না। এবং এটা কোনো শক্তি হিসেবেও দাঁড়া হতে পারবে না," বলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান।
তিনি বলেন, "আমরা স্পষ্ট বলে দিয়েছি যে, এখানে যারা থাকবে, এই ঐক্যে বা সমঝোতায় যারা থাকবে, তাদের অন্য কোনো বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকতে পারবে না।"
ইসলামী আন্দোলন অতীতে জামায়াতের সঙ্গে এগার দলীয় নির্বাচনি জোটে থাকলেও পরবর্তীকালে নানা বিরোধিতায় জোট থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর দলটি জাতীয় নির্বাচনেও সেভাবে কোনো সুবিধা করতে পারেনি।
নির্বাচনের পর রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় ইসলামী আন্দোলন এখন হেফাজতের ঐক্য গড়ার চেষ্টাকে নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছে। তারা মনে করছে, এই ঐক্য আলাদা একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতে পারে বাংলাদেশে।
ফলে হেফাজতের ঐক্যপ্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলো অন্য কোনো জোটে থাকতে পারবে না এমন শর্তে শক্ত অবস্থান নিয়েছে দলটি।
কিন্তু এমন শর্ত নিয়েই আবার আপত্তি আছে কয়েকটি দলের। তার একটি হচ্ছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
দলটির মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, তারা জোটে গেলেও দলীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো শর্ত মানবেন না।
মি. আহমদ বলেন, "শুধ আমরা না, আরো কিছু দল আছে এখানে। তাদের প্রস্তাব হচ্ছে, আমরা ঐক্য করবো। তবে রাজনৈতিক এবং নির্বাচন কেন্দ্রীক সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা থাকতে হবে।"
"একটা কথা ক্লিয়ার করে এখানে বুঝতে হবে যে, আমাদের ব্যানারটা হবে ইসলাম অথবা দেশের যেকোনো স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ হলে আমরা একসঙ্গে প্রতিবাদ করবো, আন্দোলন করবো। কিন্তু রাজনৈতিক কোনো জোট বা মোর্চা অথবা নির্বাচনকেন্দ্রীক কোনো সমঝোতা -এই বিষয়গুলো আমরা মনে করি প্রত্যেক দলের আলাদা এখতিয়ার থাকা উচিত এবং থাকতে হবে। না হলে দলের স্বাধীনতা থাকে না।"
টার্গেট কি জামায়াত?
এটা স্পষ্ট যে, ঐক্য গড়ার আগেই মূলত রাজনৈতিক কারণে দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। যেখানে না থেকেও জামায়াত একটা বড় ইস্যু।
দলগুলো অন্তত প্রকাশ্যে বলছে, তারা ঐক্য চায়, বিভক্তি বন্ধ হোক এটা চায়। কিন্তু নতুন জোটের রাজনীতি নিয়ে নানা মত আছে।
এমনকি বিভিন্ন দলের ভেতরে কথা বলে বোঝা যাচ্ছে, তাদের কারো কারো মধ্যে খোদ এই ঐক্য প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কী আছে, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে।
কেউ কেউ এমনটাও মনে করেন, ঐক্য প্রক্রিয়ায় নেপথ্যে সরকার ভূমিকা রাখছে এবং সরকার চায় জামায়াতে ইসলামীর বাইরে ইসলামপন্থি দলগুলোর আলাদা একটা জোট গড়ে উঠুক।
বিশেষ করে অন্য কোনো জোটে থাকলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার যে শর্ত, সেটা জামায়াতকে লক্ষ্য করে দেয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতটি দলের একটি অন্যতম দলের শীর্ষ একজন নেতা।
কিন্তু জামায়াত একে কীভাবে দেখছে?
জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের অবশ্য নতুন ঐক্যের উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, "ইসলামী দলগুলোর ব্যাপারে আমাদের কোনো কথা নেই। যদিও আমাদের ব্যাপারে অনেকেই কথা বলেন। যেমন আক্বিদার বিষয়ে কথা বলেছেন। এগুলো নিয়ে আমাদের কোনো দুঃশ্চিন্তা নেই। কারণ আমাদের আক্বিদা খুবই ক্লিয়ার। আমরা জনগণের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছি, কাজ করছি। ইসলামী দলগুলোর যদি প্ল্যাটফর্ম হয়েও যায়, এটাকে আমরা ওয়েলকাম জানাবো।"
জামায়াত স্বাগত জানানোর কথা বলছে। যদিও ভেতরে ভেতরে হেফাজতের ইসলামি ঐক্য শেষপর্যন্ত জামায়াতবিরোধী জোটে রূপ নেয় কি না, সেটা নিয়ে উদ্বেগ আছে দলটির ভেতরে।
বিশেষকরে একদিকে ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া অন্যদিকে একইসময়ে হেফাজত এবং হেফাজত প্রভাবিত আলেমদের কারো কারো জামায়াতের আক্বিদা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সন্দেহ বেড়েছে। দলটির নেতারা এনিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য-বিবৃতি না দিলেও দলটির কর্মী-সমর্থকদের অনেকেই মনে করেন, এসবের মাধ্যমে জামায়াতকে 'টার্গেট' করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব নিয়ে কওমি ঘরানার সমর্থকদের সঙ্গে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের পাল্টা-পাল্টি স্ট্যাটাস ও মন্তব্যও সামনে এসেছে।
এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে হেফাজতসহ ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সঙ্গে সরকারের কারো কারো যোগাযোগ।
সম্প্রতি হেফাজতের আমিরসহ এরকম একাধিক বৈঠকে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনকেও। যদিও তিনি বলছেন, এসব সাক্ষাত জোটের বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।
"যারা ইসলামের প্রচারে-প্রসারে কাজ করছে, তাদের সঙ্গে বিএনপির আত্মিক বন্ধন রয়েছে। সেই বন্ধনে যাতে ন্যুনতম ভাটা না পড়ে, সেজন্যই নিয়মিত তাদের সঙ্গে দলের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হয়। এখন হেফাজতের নেতৃত্বে যে সাত দলীয় জোট, সেটার সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের কোন সম্পর্ক নাই। সেটা আসলে কীভাবে হচ্ছে, সেটা বিএনপির কোনো বিষয় নয়। পেছন থেকে বিএনপি কোনো কলকাঠি নাড়াচ্ছে না," বলেন রাশেদ খাঁন।