বাংলাদেশের 'হিন্দুদের অবস্থা' দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে প্রচারণা চালিয়েছে আরএসএস

    • Author, রাঘবেন্দ্র রাও
    • Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ সবসময়েই উঠে আসে। তবে এবারের ভোটের অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস বাংলাদেশের ‘হিন্দুদের অবস্থা' দেখিয়ে প্রচার চালিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও 'অস্তিত্বের সংকটে' পড়তে পারেন।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির বিরাট সাফল্যের পিছনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের অবদান নিয়ে আলোচনা চলছে।

সংঘ দীর্ঘদিন ধরে বলে থাকে যে তারা নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফলের পরে, আরএসএস পর্দার আড়ালে থেকেও কোনও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

বিজেপির মতাদর্শগত ভিত্তি হিসাবে পরিচিত আরএসএস এই নির্বাচনে আগের থেকেও বেশি সক্রিয়তা দেখিয়েছে বলে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রকাশ্যে মাঠে নামা থেকে বিরত থেকেছিল সংঘ, তবে এবারের নির্বাচনে আরএসএস ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো তৃণমূল স্তরে সমস্ত শক্তি নিয়েই নেমেছিল।

আরএসএসের এক প্রচারক বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, এবারের নির্বাচনে শত শত স্বয়ংসেবক ও কর্মী একটাই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন যে, এই নির্বাচনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সমাজের 'অস্তিত্বের' প্রশ্ন রয়েছে।

সমালোচকরা মনে করেন যে নির্বাচনের সঙ্গে 'অস্তিত্বের' লড়াইয়ের কথা বলে ধর্মীয় মেরূকরণকে তীব্রতর করা হয়েছে।

শাখাগুলোর মাধ্যমে তৃণমূল স্তরে প্রভাব

আরএসএসের প্রাথমিক কেন্দ্রগুলোকে 'শাখা' বলা হয়। এই শাখাসমূহই সংঘের সব থেকে বড়ো শক্তি।

আরএসএসের কর্মীদের স্বয়ংসেবক বলা হয়।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে সংঘের প্রায় সাড়ে চার হাজার শাখা সক্রিয় আছে। দশ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজারের কাছাকাছি।

কলকাতার একটি শাখায় যোগ দেওয়া স্বয়ংসেবকরা বলছেন, কোনও নির্দিষ্ট দলের হয়ে প্রচার করা নয়, সংঘের কাজ হলো জনগণকে তাদের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা তুলে ধরা।

সংঘের 'প্রান্ত ব্যবস্থা প্রমুখ' সীতারাম দাগার কথায়, স্বয়ংসেবকরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে জনগণকে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান তবে তারা কোনও দলের নাম নেন না।

'প্রান্ত ব্যবস্থা প্রমুখ' আরএসএসের একটি পদের নাম, যার দায়িত্ব মূলত সংঘের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ব্যবস্থাপনা করা।

মি. দাগা বলছিলেন, "আমরা যখন কথা বলি, তখন এটাই জানাই যে, দেশের স্বার্থে যারা কাজ করছে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কাজ করছে, যারা হিন্দুত্বের জন্য কাজ করছে, যারা সমাজের সেবা করছে, আপনারা তাকেই নির্বাচিত করুন।

"আমরা এটা বলি না যে আপনারা বিজেপিকে বেছে নিন, তবে সংঘের স্বয়ংসেবকরা যেহেতু বিজেপিতেও রয়েছেন, তাই কিছু কথাবার্তা তো হয়ই। এটা তো সাধারণ মানুষও জানেন, বোঝেন, কিন্তু আমরা নিজের মুখে কখনোই এরকম প্রচার চালাই না," বলছিলেন মি. দাগা।

সমালোচকরা অবশ্য যুক্তি দেন যে শাখাগুলোর মাধ্যমেই সমাজের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তার করা হয়।

সংঘ এটা অস্বীকার করে, তবে এটাও সত্য যে নির্বাচনের সময়ে তৃণমূল স্তরে এই স্বয়ংসেবকদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

বিজেপির জয়ের পিছনে আরএসএসের অবদান কতটা?

এই নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকের একাংশের মতে, মমতা ব্যানার্জীর সরকারের বিরুদ্ধে শাসক-বিরোধী ক্ষোভ তার পরাজয়ের একটি বড়ো কারণ।

কিন্তু একইসঙ্গে এই যুক্তিও সামনে আসছে যে আরএসএসের সমর্থন ছাড়া বিজেপি এত বড়ো জয় হয়তো পেত না।

বিজেপির তরফে জানানো হয়েছে, তাদের দলের প্রতি সংঘের সমর্থনটাই স্বাভাবিক, কারণ দুটি সংগঠনের মতাদর্শগত ভিত্তিই হলো জাতীয়তাবাদ।

দলের মুখপাত্রদের মতে, সংঘের কর্মীরা 'সুশাসন' এবং জাতীয়তাবাদের ইস্যুগুলো নিয়ে তৃণমূল স্তরে কাজ করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, "সংঘ তৃণমূল স্তরে যে কাজ করেছে তা সুশাসনের জন্য এবং জাতীয়তাবাদের পক্ষে। আবার বিজেপিও জাতীয়তাবাদের কথা বলে। বিজেপি একটি জাতীয়তাবাদী দল, তাই সংঘও আমাদের সমর্থন দেয়। তাদের কাজ ছিল তৃণমূল স্তর পর্যন্ত। ওই পর্যায়ে তারা আমাদের হয়ে কথা বলেছে। তারা স্বাভাবিকভাবেই এটা করেছেন।”

'নমনীয়' রণকৌশল এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন যে উচ্চস্বরে স্লোগান দিয়ে বা বড়ো মঞ্চে বক্তৃতা করে নয়, সংঘ তার প্রভাব বিস্তার করে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে। মানুষের সঙ্গে অবিরাম যোগাযোগ, ফোন কল, পারিবারিক দেখা-সাক্ষাৎ - এগুলোই পশ্চিমবঙ্গে সংঘের রণকৌশল ছিল।

আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ প্রচারক বিজয় আঢ্য বলেন, এবারের নির্বাচন ছিল হিন্দু সমাজের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা - বিশেষত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের কথা মানুষকে মনে করিয়ে দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে যে 'ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়'।

বিজয় আঢ্যের কথায়, "সংঘের কর্মীরা ঘরে-ঘরে গিয়ে সংঘের ভূমিকা নিয়ে মানুষকে সচেতন করেছেন আর এবারের নির্বাচন যে হিন্দুদের কাছে অস্তিত্বের প্রশ্ন, সেটাও বলা হয়েছে। সংঘ মানুষকে বলেছে যে বাংলাদেশের হিন্দুদের যে অবস্থা হয়েছে, একই পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গেও হবে।"

"পশ্চিমবঙ্গই বাঙালি হিন্দুদের একমাত্র মাতৃভূমি, তাই এখান থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে দেওয়া উচিত কারণ তাদের নীতিই হলো তোষণ করা, এবং তারা মুসলমান সম্প্রদায়কে তোষণ করে চলে। আমরা মানুষকে বলেছি যে যদি বিজেপির সরকার না গড়া যায়, তাহলে হিন্দুদের আরও একবার পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যেতে হবে," বলছিলেন, মি. আঢ্য।

ধর্মীয় মেরূকরণ

বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে, বিজেপি নেতা ও নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলছেন যে তার দলের জয় আসলে হিন্দুত্বের জয়।

তাহলে এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কি আসলে হিন্দু বনাম মুসলমান ভোটযুদ্ধ হয়েছে? তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে সংঘের কি কোনও ভূমিকা ছিল?

কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ বলেন, এই নির্বাচনে ধর্মীয় মেরূকরণ স্পষ্টতই দেখা গেছে।

মি. মাহমুদ বলেন, "শুভেন্দু অধিকারী যখন ভবানীপুরের ফলাফল নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন এক জায়গায় তিনি বলেছিলেন যে মুসলমান এলাকার ইভিএম খোলা হবে, হিন্দু এলাকার ইভিএম খোলা হবে, হিন্দু এলাকার ভোট এদিকে আসবে, মুসলমান ভোট ওদিকে যাবে। এখন পশ্চিমবঙ্গে যে ধর্মীয় মেরূকরণ দেখা যাচ্ছে, মানসিকতার যে পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিবর্তনে আরএসএসের বড়ো ভূমিকা থেকেছে।"

অধ্যাপক মাহমুদ বলেন, "আরএসএসের কাজ হচ্ছে মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে মৃদুভাবে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করা, যাতে তাদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন করা যায়।

"আরএসএস সর্বত্র এভাবেই কাজ করে। তারা মানুষের জন্যই কাজ করেন, কিন্তু তাদের পরিচালিত স্কুলে আর পাঠ্যক্রমে এক বিশেষ ধরনের মতাদর্শ শেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত এই মতাদর্শটাই বিজেপির রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে সহায়তা করে," বলছিলেন মি. মাহমুদ।

অধ্যাপক মাহমুদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনে বিজেপির জন্য জায়গা তৈরি করার কাজটা করেছে আরএসএস।

তিনি বলেন, "বাকি ভারতের বাকি অংশে একজন বাঙালি মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের ভাবমূর্তিটা কী? সাধারণত, মানুষ মনে করে যে বাঙালিরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলবেন, শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী হবেন। অর্থাৎ, এরকমই একটা ছবি রয়েছে বাঙালিদের সম্বন্ধে। এখন যখন আমরা দেখছি যে এই ধরনের অনেকেই প্রকাশ্যে বিজেপিকে সমর্থন করছেন, তখন স্পষ্টই বোঝা যায় একটা বদল ঘটেছে।"

"এই পরিবর্তনটা ঠিক কী এবং কীভাবে তা ঘটল, তা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে কাজ করে চলেছে," বলছিলেন মি. মাহমুদ।

তিনি বলেন, "যে দলটিকে তৃণমূল কংগ্রেস বহিরাগতদের দল হিসাবে বর্ণনা করেছিল, বাঙালিদের চিন্তাভাবনা বা সংস্কৃতি নিয়ে যাদের কোনো ধারণা নেই এবং যারা পশ্চিমবঙ্গকে বোঝা না, এই ভাষ্যটা ২০২১ সালে কাজ করেছিল; কিন্তু এবার তা যে যে সফল হলো না, তার পিছনে আরএসএসের একটা ভূমিকা আছে।"

এরপর কী?

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সংঘের বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠন তৃণমূল স্তরে বিশেষভাবে সক্রিয় থেকেছে। নারী ও যুব সমাজের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে তারা।

বিবিসি জানতে পেরেছে যে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে এই প্রচারাভিযানে সামনের সারিতে ছিল সংঘের সহযোগী সংগঠন 'সীমান্ত চেতনা মঞ্চ'। এই সংগঠনটি সীমান্ত অঞ্চলে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে জোর দিয়েছিল।

এখন যেহেতু বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে, তখন সংঘের রাজনৈতিক দলের কাছে কী প্রত্যাশা করা যায়?

সংঘের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা স্বীকার করেন যে এখন পশ্চিমবঙ্গে ভয়ের পরিবেশ কমেছে এবং আগামী দিনে আরও অনেক মানুষ প্রকাশ্যেই সংঘের কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন।

একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘের কাজ সরকার গঠন করার ওপরে নির্ভর করে না। বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী পক্ষে, সংঘ তাদের মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল আবারও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যখন মতাদর্শ ও সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল স্তরে একই সঙ্গে কাজ করে, তখন নির্বাচনী রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়ে।

বিজেপি সরকার গঠনের পর পশ্চিমবঙ্গে সংঘের প্রভাব কোন পথে, কতটা বাড়ে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।