আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশে গরুর মাংস আমদানির দাবি উঠছে কেন
বাংলাদেশের হোটেল-রেস্তোরা ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন গরুর মাংস আমদানির অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানানোর পর এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সবসময়ই গরুর মাংসের দাম আলোচনায় থাকে। দেশটিতে গরুর মাংসের দাম অনেক বেশি- ভোক্তাদের এমন অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন যে, ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ থাকার সুযোগে গরুর মাংসের দাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে এখনকার পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন এক শ্রেণির বিক্রেতা।
তারপরেও দেশে খামারগুলোতে প্রচুর গরু উৎপাদন হওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গরুর মাংস আমদানির প্রস্তাবে আগেও সরকার সায় দেয়নি।
সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলছেন, এখনো এমন কোনও পরিকল্পনা সরকারের নেই এবং এ ধরনের কোনো প্রস্তাবও কেউ তাদের দেয়নি।
অবশ্য কিছু প্রতিষ্ঠান হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি করে থাকে, যা দেশের পাঁচতারকা হোটেল কিংবা কিছু রেস্তোরাঁতে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৬০ হাজারের মতো হোটেল রেস্তোরা আছে এবং এর মধ্যে ঢাকাতেই আছে প্রায় ২৫ হাজার। প্রশ্ন হলো, এসব হোটেল রেস্তোরাঁগুলো গরুর মাংস আমদানির সুযোগ চাইছে কেন?
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
গরুর মাংস আমদানির প্রস্তাব কেন
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি রবিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তাদের গরুর মাংস আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, গরুর মাংসের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে, আবার খামারগুলো থেকে বাজারে আসা গরুর মাংস বেশি দাম দিয়ে কিনলেও তাতে মাংসের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না।
"আমাদের হোটেল রেস্তোরার ব্যবসা নির্ভর করে গরুর মাংসের ওপর। সব দেশে এর দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। এখানে ৮০০-১০০০ টাকা দাম। আবার যে ধরনের মাংস রেস্টুরেন্টে দরকার তেমন মাংসও খুব একটা পাওয়া যায় না। ফলে ব্যবসা ও ভোক্তার তৃপ্তি কোনোটাই হচ্ছে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
মি. হাসান অবশ্য বলছেন, তারা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মাংস আমদানির সুযোগ চাইলেও এখনো সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব তারা দেননি।
বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেন বলছেন, বাজারে গরুর মাংসের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে এবং দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে খুব একটা অসন্তোষ আছে বলেও মনে হচ্ছে না।
"এবারের কুরবানিতেও পর্যাপ্ত সংখ্যক গবাদিপশু বাজারে আসবে। ফলে সরবরাহজনিত কারণে দাম বৃদ্ধির কোনো আশংকা নেই। আর আমরা মনে করি আমদানির প্রয়োজনীয়তাই তো নেই। কারণ কুরবানির চাহিদা পূরণের পরেও দেশে প্রায় ২৫ লাখের বেশি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
যদিও অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে কিছু বড় ব্যবসায়ী গরুর মাংস ব্যবসায় (খামার ও মাংসজাত পণ্য) বিনিয়োগ করেছেন গত এক দশকে। গরু কিংবা মাংস আমদানির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান থাকায় সরাসরি মাংস আমদানির দিকে খুব একটা আগ্রহী নয় বাংলাদেশ সরকার।
ইমরান হাসান বলছেন, "বড় বড় শিল্পগ্রুপ ও শৌখিন উদ্যোক্তা খামার নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বাজারে মাংসের দাম বেড়েছে। সাধারণ কৃষকদের জন্য গরু লালন পালন ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আমদানির সুযোগ পেলে মাংসের দাম কেজি প্রতি ৫শ টাকার মধ্যে থাকবে এবং মানুষ উপকৃত হবে"।
প্রসঙ্গত, বাজারে বর্তমানে গরুর মাংস ৮০০-৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এর আগে ২০১৯ রোজার মাসের জন্য ঢাকা দক্ষিণের সিটি কর্পোরেশন গরুর মাংসের দাম কেজি প্রতি যথাক্রমে ৫২৫ টাকায় বেঁধে দেয়।
দুই হাজার একুশ সালের একই সময়ে গরুর মাংস কেজিপ্রতি দাম ছিল ৫৬০ থেকে ৬০০ টাকা।দুই হাজার বাইশ সালে গরুর মাংস প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবি'র বাজার দর অুনযায়ী, ২০২৩ সালে গরুর মাংসের প্রতি কেজি ৭২০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
মাংস আমদানির আলোচনা কি নতুন কিছু?
বাংলাদেশে ২০২২ সালের এপ্রিলে জারি হওয়া আমদানি নীতি আদেশে প্রথমবারের মতো গরু, ছাগল ও মুরগির মাংস ও মানুষের খাওয়ার উপযোগী অন্যান্য পশুর মাংস আমদানির ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতির বিধান আসে। এরপর থেকে বিশেষ কারণ ছাড়া মাংস আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়না বলেই জানিয়েছে অধিদপ্তর।
ওদিকে ২০১২ সালের পর থেকে ভারত বাংলাদেশে গরু রফতানির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে এবং পরে এক পর্যায়ে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে বাংলাদেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দিক থেকে গরুর মাংস আমদানির প্রস্তাব এসেছে। আবার গরুর উৎপাদন বেশি হয় এমন কয়েকটি দেশও বাংলাদেশে গরুর মাংস রফতানির প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় এসেছিল।
সরকারের দিক থেকে কখনো কখনো আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত গরু বা গরুর মাংস আমদানির পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।
গরুর মাংস আমদানির একটি প্রস্তাব ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল ২০১৮ সালে। তখন বাংলাদেশেরই কিছু ব্যবসায়ী ভারত থেকে গরুর মাংস আমদানির জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, ভারত প্রতি বছর ৭০টির মত দেশে প্রক্রিয়াজাত মাংস রপ্তানি করে থাকে।
বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সমিতি এফবিসিসিআইয়ের তখনকার সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ওই সময়ে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, "বাজারে গরুর মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে গরুর মাংস আমদানি একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে"।
কিন্তু পরে আর সেই আলোচনা বেশিদূর এগোয়নি, বরং তখন প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয় প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
তখন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল যে বছরে বাংলাদেশের মাংসের চাহিদা ৭০ লাখ টন, যার পুরোটাই এখন দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। "ফলে মাংস আমদানি করলে করলে এই খাত সঙ্কটে পড়বে।"
তবে এরপর গরুর মাংস নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কয়েক মাস আগে। ওই সময় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমবারের মতো ঢাকা সফরে এসেছিলেন।
তার ওই সফরের সময়ে ব্রাজিলের দিক থেকে বাংলাদেশে গরুর মাংস রফতানিতে আগ্রহ প্রকাশ করা হলে এর বিপরীতে বাংলাদেশ জীবন্ত গরু আমদানি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
বাংলাদেশে মাংসজাত পণ্য হিসেবে গরুর মাংস রফতানির প্রস্তাব দিয়ে ব্রাজিলের দিক থেকে তখন বলা হয়েছিল যে তারা কেজি প্রতি পাঁচশ টাকারও কম দামে গরুর মাংস সরবরাহ করতে পারবে।
ব্রাজিল গরুর দুধ ও মাংস উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। মূলত কৃষি ও পশু খাতে নজিরবিহীন সাফল্যের কারণেই ব্রাজিলকে অনেকে এখন বিশ্বের 'ফুড বাস্কেট' হিসেবে অভিহিত করেন। ব্রাজিল চীনসহ বিশ্বের শতাধিক দেশে গরুর মাংস রফতানি করে।
ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই সফর শেষে এ নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ওই বছরই সরকার পরিবর্তনের পর মাংস আমদানির ইস্যুটিই আর কেউ তোলেনি।
যদিও সাধারণ মানুষের জন্য গরুর মাংসের দাম কিছুটা কমিয়ে আনার জন্য অনেকেই মনে করেন যে, গরুর মাংসের আমদানির সুযোগ কিছুটা হলেও থাকা উচিত। তবে সরকার দেশে পশু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন কিছু করতে রাজি নয়।