ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া কীভাবে দেওয়া হবে?

২০২৬ সালের ৩ জুন তোলা এই ছবিতে বেনাপোলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যবর্তী বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের টহল দিতে দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Munir UZ ZAMAN / AFP via Getty Images

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের দিক থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। তবে সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ ও আন্তঃসীমান্ত বিভিন্ন অপরাধ দমনের লক্ষ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বুধবার সংসদ অধিবেশনে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ভারত সীমান্তের স্পর্শকাতর স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম বিবেচনাধীন রয়েছে।

কিন্তু সীমান্তে এই কাঁটাতারের বেড়া কীভাবে দেওয়া হবে, কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম কি মানতে হবে- কিংবা প্রতিবেশী দেশের সাথে কি আলোচনা করতে হবে?

আন্তর্জাতিক আইনে কী আছে?

আন্তর্জাতিকভাবে সীমান্তে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে সার্বজনীন কোনো আইন নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে যেকোনো সার্বভৌম দেশের নিজ সীমান্তে স্থাপনা নির্মাণের স্বাধীনতা রয়েছে।

এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমেও সীমান্তে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা করা হয়।

যেমন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, শুন্যরেখা থেকে দেড়শ গজের মধ্যে কোনো পক্ষই প্রতিরক্ষা সামর্থ্য থাকা স্থাপনা গড়তে পারবে না।

এছাড়া উন্নয়নমূলক স্থাপনা তৈরি করতে হলেও অপর পক্ষের কাছ থেকে সম্মতি নিতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কিন্তু নিরাপত্তার স্বার্থে নিজ সীমান্তে বেড়া দেয়া রাষ্ট্রের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে বলে জানান অধ্যাপক সাহাব এনাম খান। সেক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের দিক থেকে কোনো ধরনের বাধা দেওয়ার সুযোগ থাকে না বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই শিক্ষক।

তবে যুদ্ধকালীন অবস্থার মতো মানবিক সংকটের সময় শারীরিক স্থাপনা নির্মাণ না করার 'নর্ম এন্ড প্র্যাকটিস' রয়েছে।

জুম শটে বিজিবি সদস্যের লোগো, পেছনে ব্লার হয়ে থাকা অন্য সদস্যদের হাতে রাইফেল
ছবির ক্যাপশান, ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, শূন্যরেখা থেকে দেড়শ গজের মধ্যে কোনো পক্ষই প্রতিরক্ষা সামর্থ্য থাকা স্থাপনা গড়তে পারবে না

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতের দিক থেকে ইতোমধ্যেই কাঁটাতারের বেড়া থাকায় বাংলাদেশের এই উদ্যোগেও কোনো নিয়ম ভাঙ্গা হচ্ছে না বলে মনে করছেন অধ্যাপক খান।

কিন্তু ভারত থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশ-ইনের ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি হয়েছে। যার কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক এবং নৈতিক বলেই মনে করছেন তিনি।

"এতে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করা না হলেও তা আন্তর্জাতিক চর্চার বিপরীতমুখী অবস্থান। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে থেকেই করা সম্ভব", বলেন অধ্যাপক সাহাব এনাম খান।

অন্যদিকে কাঁটাতারের বেড়াকে 'আস্থার অভাব' হিসেবেই দেখছেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ।

"যেকোনো দেশ বা দুই দেশই যদি কাঁটাতার বা এই ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তবে তাতে পরিষ্কারভাবেই পরস্পরের প্রতি আস্থার অভাবের দিকটি প্রকাশ পেয়ে যায়", বলেন তিনি।

দরকার প্রযুক্তিগত সমাধান

গত ২৬শে এপ্রিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দ্বিতীয় পর্যায়ের সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি - একনেক, যার মোট অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ৩৬ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকা।

এর আগে প্রথম পর্যায়ে তিন হাজার ৮৬০ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়।

সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে এলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

একইভাবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে হলেও আগে থেকেই বেশ কিছু কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ এবং বেড়া নির্মাণ পর্যন্ত বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে।

যদিও ভারত সীমান্তের 'স্পর্শকাতর স্থানে'র ক্ষেত্রেই কেবল বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনাধীন রয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সংসদে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Bangladesh Nationalist Party-BNP

ছবির ক্যাপশান, সংসদে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (ফাইল ছবি)
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মন্ত্রী বলেছেন, দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে এবং সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।

তবে কাঁটাতারের বেড়ার মতো কাঠামোগত স্থাপনার চেয়ে নজরদারির ক্ষেত্রে ড্রোন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা – এআইয়ের মতো প্রযুক্তিগত সমাধানের দিকটিতেই গুরুত্ব দিচ্ছেন পর্যেবক্ষকরা।

"বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কাঁটাতারের বেড়া যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তারচেয়ে বেশি জরুরি নজরদারির সক্ষমতা বাড়ানো। যাতে তা মানবাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, একইসাথে অবৈধ যাতায়াতকে রুখে দেওয়া", বলছিলেন অধ্যাপক সাহাব এনাম খান।

তার মতে, এতে করে একদিকে যেমন চোরাচালানসহ অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাবে, একইসাথে মানবিক সংকটকে কেন্দ্র করে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকভাবে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হয়, সেটিকেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে।

অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে দুর্গম ও স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকায় বিওপি বা বর্ডার আউট পোস্ট এবং টিওবি বা টেম্পোরারি অপারেটিং বেস নির্মাণের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরপশ্চিম সীমান্তের অতি সংবেদনশীল এলাকায় ইতোমধ্যে 'স্মার্ট বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম' স্থাপনের কথা জানিয়েছেন।

ভারত অংশে কাঁটাতারের বেড়া কীভাবে কাজ করে?

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

তিনি জানান, এর মধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে ৫৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত কাঁটাতার দেওয়া বাকি রয়েছে।

ভারত আর বাংলাদেশের সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে ভারতের অভ্যন্তরে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় বিএসএফ তাদের কার্যক্রম যেমন - তল্লাশি, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে রেইড ইত্যাদি চালাতে পারত।

৯ই মে, ২০২৫ তারিখে ভারতের শিলিগুড়ির উপকণ্ঠে ফুলবাড়ি বিওপি-তে (সীমান্ত চৌকি) ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা পাহারায় রয়েছেন।

ছবির উৎস, DIPTENDU DUTTA/Middle East Images/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানান, বাংলাদেশের সাথে ১ হাজার ৬৫৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া হয়েছে

তবে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশে সেই পরিধি বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করা হয়।

এর আগে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও পাঞ্জাবে ওই পরিধি থাকলেও গুজরাত আর রাজস্থানে তা যথাক্রমে ছিল ৮০ ও ৫০ কিলোমিটার।

২০২১ সালের নির্দেশ অনুযায়ী, সব সীমান্তেই ৫০ কিলোমিটারের পরিধি করা হয়।

১৯৭৪ সালের চুক্তি মেনে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে দেড়শো গজ পর্যন্ত কোনো নির্মান কাজ চালানো যায় না। তবে শূন্য রেখা ও কাঁটাতারের বেড়ার মাঝের যে অংশ, সেই ভারতীয় ভূখন্ডের জমির মালিকরা নিজেদের খেতে চাষাবাদ করতে পারেন।

এর জন্য কাঁটাতারের বেড়ায় লোহার গেট আছে। সকালে ওই গেট খোলা হয়, বিএসএফ সদস্যদের রেজিস্টারে নাম লিখিয়ে, পরিচয়পত্র দেখিয়ে চাষের খেতে ঢুকতে পারেন কৃষকরা।

আবার সন্ধ্যায় গেট বন্ধ হওয়ার আগে ফিরে আসতে হয় তাদের। ফেরার সময়ে তাদের তল্লাশি করা হয়।

কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে কোন ফসল চাষ করা যাবে, তা নিয়ে বিএসএফ কিছু গাইডলাইন ঠিক করে দেয়। যেমন, পাট চাষের ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি থাকে কারণ পাট গাছ অনেক লম্বা হওয়ায় বিএসএফ সদস্যদের নজরদারিতে তা বাধা সৃষ্টি করে।

তবে এ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

বেড়ার বাইরে কিছু এলাকায় বসতি আছে। তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। সকালে তারা পরিচয়পত্র দেখিয়ে, রেজিস্টারে নাম লিখিয়ে বেড়ার বাইরে আসতে পারে, আবার সন্ধ্যায় তাদের ফিরে যেতে হয়।

সমস্যা হয় কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে যেসব বাড়ি-ঘর আছে, সেইসব পরিবারে রাতে কোনো মেডিক্যাল এমারজেন্সি হলে।

আগে তো মোটেই গেট খোলা হতো না। তবে এমারজেন্সির ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রহরীদের অনুরোধ করলে এবং কোম্পানি কমান্ডার স্তরের অনাপত্তিপত্র থাকলে গেট খোলার কয়েকটি ঘটনা শোনা গেছে।