আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'দেশের একজন নাগরিকের কাছে এর চেয়ে অপমানজনক' আর কিছু হতে পারে না'
- Author, ময়ূরী সোম
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
"হঠাৎ করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া এবং ভোট দিতে না পারা… একজন দেশের নাগরিকের কাছে এর চেয়ে বেশি অপমানজনক আর কিছু হতে পারে বলে আমি মনে করি না। ভোট দেওয়া একজন নাগরিকের সবচেয়ে পবিত্র অধিকার," বিবিসিকে বলছিলেন কলকাতার জনপ্রিয় এক দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক রাজাগোপাল রামদাস।
"আমার মনে হচ্ছে যেন আমাকে নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা রয়েছে, আমি নাগরিক কি না। নিজেকে একজন হাফ সিটিজেন মনে হচ্ছে," বলছিলেন মি. রামদাস।
কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা, 'দ্য টেলিগ্রাফ'এর প্রাক্তন সম্পাদক তিনি। তিন দশকেরও বেশি সময় কলকাতায় বাস করছেন কেরালায় জন্ম নেওয়া এই সাংবাদিক। কয়েক মাস আগে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় তার নাম বাদ পড়েছিল।
এখন সেই যুক্তি দেখিয়েই তার ভারতীয় পাসপোর্ট নবায়ন আটকিয়ে রাখা হয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন রাজাগোপাল রামদাস।
এর ফলে তার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মেয়ের বিয়েতেও তিনি হাজির হতে পারেন নি, যদিও তার আগের পাসপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের দশ বছরের ভিসা রয়েছে।
তার বিষয়টি সামনে আসার পরে গত কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে।
ভারতের পত্রিকা সম্পাদকদের সংগঠন 'এডিটার্স গিল্ড' যেমন বিবৃতি দিয়েছে, তেমনই তার জন্মস্থান যে কেরালায়, সেরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চিঠি লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে।
এখন রাজাগোপাল রামদাসের সময় কাটে নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণের সন্ধানে।
'ভোটার তালিকায় আবার নাম না উঠলে পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব হবে না'
এসআইআরে নাম বাদ পড়ায় তিনি মেনেই নিয়েছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারবেন না।
যদিও রাজাগোপাল রামদাস বলেন, জীবনের দীর্ঘ একটি সময় তিনি ভোট দেননি।
"আমি বিশ্বাস করতাম একজন সাংবাদিকের ভোট দেওয়া উচিত না। কারণ তাহলে তারা একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সমর্থন করতে বাধ্য," বলছিলেন মি. রামদাস।
তার কথায়, "অনেক বছর পর আমি বুঝলাম আমার এটা ভুল হয়েছে। সাংবাদিকদেরও পক্ষ নেওয়া উচিত। ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ায় আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। দুঃখ পেয়েছিলাম।"
সেই 'দুঃখ' অতিক্রম করে তিনি মেনে নিয়েছিলেন যে এই নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারবেন না। কিন্তু জুন মাসে তিনি দ্বিতীয়বার ধাক্কা খান।
সেই সময় তিনি পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন।
কয়েকদিন আগে, জুন মাসে, পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের তরফে তাকে জানানো হয়, তার 'সন্দেহজনক' ভোটাধিকারের কারণ দেখিয়ে কলকাতা পুলিশ তার নামে একটি 'এডভার্স' রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সেই কারণে এই মুহূর্তে তাকে নতুন পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
"জুন মাসে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, কলকাতা পুলিশ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে আমার নামে একটি 'এডভার্স' রিপোর্ট পাঠিয়েছে। তাতেও আমি খুব অবাক হয়েছিলাম," বলছিলেন মি. রামদাস।
তিনি বলেন, "পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ আমার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করেনি। করেছে কলকাতা পুলিশ। তারা আমার পুলিশি ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে 'নো অবজেকশান' দিতে নারাজ।… পুলিশ আমাকে জানিয়েছে যতক্ষণ আমার নাম ভোটার তালিকায় আবার যুক্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ আমার ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া তারা ক্লিয়ার করতে পারবেন না।''
"আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে কোন সরকারি আদেশ, কোন আইন বা কোন মেমোর অধীনে আপনারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, কারণ পাসপোর্ট পোর্টালে বলা নেই যে ভোটার আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক," বলছিলেন মি. রামদাস।
তিনি বলেন, কলকাতা পুলিশ তার সঙ্গে আপাতত সহযোগিতা করলেও, তারা তার প্রশ্নগুলিকে এড়িয়ে যাচ্ছিল।
রাজাগোপাল রামদাসকে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ আবারও দেখা করতে বলেছে আগামী ১৭ই জুলাই।
মি. রামদাস বলেন, "একশোরও বেশি দিন আগে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমি আমার বায়োমেট্রিক তথ্য জমা দিই। তখন অফিসাররা আমার সব নথিপত্র যাচাই করেন। যখন পুলিশ আমাকে থানায় ডাকলো, তখন তারাও আমাকে আরো নথিপত্র নিয়ে আসতে বললো। আমি সব তাদের দেখিয়েছি। এছাড়া আমার কাছে আর নতুন কোন নথি নেই।"
"বর্তমানে আমি চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছি। আমার পাসপোর্ট রিনিউয়ালের আবেদন অফিসিয়ালি খারিজ হয়নি। ঝুলে রয়েছে। সেই কারণে আমি জানি না আমি বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে পারব কি না," তিনি বলছিলেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে খর্ব হতে পারে অন্যান্য নাগরিক অধিকার?
রাজাগোপাল রামদাসের জন্ম ভারতের কেরালায়।
কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ভিডি সথিশন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে এ বিষয়ে একটি চিঠি লেখেন।
চিঠিতে লেখা, "আমি বুঝতে পারছি এডভার্স রিপোর্টটি এসআইআরে ভোটার তালিকা থেকে তার নাম বাদ যাওয়ার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু তার ভোটাধিকারের বিষয়টি যথাযথ আইনি ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে, আমি জানতে পেরেছি পুলিশের এই রিপোর্টের কারণে তার পাসপোর্ট রিনিউ হতে দেরি হচ্ছে।"
"মি. রাজাগোপাল একজন বিখ্যাত সাংবাদিক, যিনি গত তিন দশক ধরে কলকাতায় বসবাস করছেন। সাংবাদিকতায় তার তিন দশকেরও বেশি সময়ের এক গৌরবোজ্জ্বল কর্মজীবন রয়েছে... আমি আপনাকে বিনীত অনুরোধ করছি বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখার জন্য," লিখেছেন মি. সথিশন।
উল্লেখযোগ্য, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানায়, পাসপোর্ট কেবল একটি ভ্রমণ নথি, ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট এসআইআরের একটি মামলায় পর্যবেক্ষণ করেছিল যে, নির্বাচন কমিশন ভোটার হিসেবে কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা যাচাই করার ক্ষমতার বাইরে গিয়ে তার নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।
রাজাগোপাল রামদাসকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ভারতের একাধিক সাংবাদিক সংগঠনও। প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার একটি বিবৃতি অনুযায়ী আরেকজন বর্ষীয়ান সাংবাদিক সম্রাট চৌধুরীর পাসপোর্টও সম্প্রতি "সরকারি হেফাজতে" নিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার কারণ স্পষ্ট নয়।
পশ্চিমবঙ্গে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের সময় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার'-এর সুবিধা পাবেন না।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার বিজেপি সরকারের একটি নারীকেন্দ্রিক 'ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার' প্রকল্প।
মিজ. পাল স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, "বাদ পড়া যেসব ভোটারের আবেদন বিচারাধীন রয়েছে এবং যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন, তারা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সুবিধা পাবেন।"
মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের আশঙ্কা, যে যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় বানান ভুলের মতো ছোটখাটো ত্রুটির কারণেও লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন, পুনরায় সেই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই রাজ্যের একাংশ মানুষকে সরকারি প্রকল্প ও সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সদস্য সাগরিকা ঘোষ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আর্জি জানিয়ে ২৩টি বিরোধী দল যৌথভাবে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়েছে।
মি. রাজাগোপালের অভিযোগের জবাবে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত কমিশনার ধ্রুবজ্যোতি দে ভারতের 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' সংবাদপত্রকে সোমবার জানিয়েছেন, "মি. রাজাগোপালের ঠিকানায় বসবাস করে এমন অনেক ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়ে একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমি এই সংক্রান্ত ফাইলের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছি। যাচাইকরণের জন্য ভোটার আইডি কার্ড চাওয়া হতে পারে। সেটা না থাকলে প্রশ্ন উঠতে পারে।"
তিনি আরো বলেন, "তবে পাসপোর্টের জন্য স্থানীয় তদন্তের ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র বা চূড়ান্ত নথি নয়। আমি আশা করছি আজই বিষয়টি সুরাহা করা সম্ভব হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আরেকটি রিপোর্ট পাঠানো হবে।"
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে কী হয়েছিল?
গত বছরের অক্টোবরে ভারতের নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গ-সহ নয়টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘোষণা করেছিল। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসআইআরের উদ্দেশ্য ছিল, 'কোনো অযোগ্য ভোটার যেন ভোটার তালিকায় না থাকেন, এবং কোনো যোগ্য ভোটার যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন' তা নিশ্চিত করা।
এসআইআরে 'যৌক্তিক অসঙ্গতির' কারণে প্রায় ৬০ লাখ ভোটার অতিরিক্ত যাচাইয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাদের ভোটাধিকার যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের।
নির্বাচনের ঠিক আগে ২৭ লাখেরও বেশি 'বিবেচনাধীন' ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
মি. রামদাস তাদের মধ্যে একজন।
তিনি বলেন, ভোটার হিসেবে তার ভোটাধিকারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি আপিলেট ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। কিন্তু সেটিও এখনো বিবেচনাধীন।
এসআইআরের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের ভোটাধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগ ও আবেদনের শুনানির জন্য একাধিক আপিলেট ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছিল। সেই ট্রাইবুনালের নেতৃত্বে আছেন প্রাক্তন বিচারকরা।
রাজাগোপাল রামদাস বলেন, "একজন প্রাক্তন সাংবাদিক হিসেবে আমি ভাবতাম, সাধারণ মানুষের সমস্যার মুখোমুখি আমাকে কোনোদিন হতে হবে না। আমি বুঝেছি এই বিষয়ে আমার মিথ্যে অহংকার ছিল। ভোট না করতে পারার থেকে বেশি অপমানজনক কিছু হতে পারে না।"
'দিন কেটে যায় নাগরিকত্বের প্রমাণ খুঁজতে খুঁজতে'
এখন রাজাগোপাল রামদাসের সময় কাটে নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণের সন্ধানে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি তিনি তার জন্মসনদটি খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু সেখানে তার মায়ের পদবীতে একটি অসঙ্গতি রয়েছে।
"আমার মায়ের নাম আসলে রাধা দেবী। কিন্তু আমার জন্মসনদে লেখা আছে রাধা বাই… শুধু 'বাই' থেকে 'দেবী' পরিবর্তন করার জন্য আমাকে আমার মায়ের ম্যাট্রিকুলেশনের সনদ খুঁজে বের করতে হবে।"
তিনি জানান, নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের চেষ্টায় তিনি অবশেষে তার মৃত মায়ের স্কুলের বন্ধুদের সন্ধান পেয়েছেন। তাদের সূত্র ধরে তিনি তার মায়ের স্কুলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।
একইভাবে, তিনি তার বাবার প্রবীণ বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার বাবার পুরোনো ছবি জোগাড় করারও চেষ্টা করেছেন এই আশায়, যে অন্তত তার পিতা-মাতার, এবং নিজের, অস্তিত্ব ও নাগরিকত্ব তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন।